সোভিয়েত নারীর দেশে-৮

সুপ্রীতি ধর:

আমার কাঁচুমাচু মুখ দেখে টিচার সের্গেইয়ের সেকী হাসি! উনি তখন বললেন, একাত্তরে আমাদের দেশ যখন লড়ছে, তখন সোভিয়েত ইউনিয়নও তার সাধ্যমতো পাশে দাঁড়িয়েছে। অত:পর দেশটি স্বাধীন হওয়ার পর তারা ঘটনাটিকে স্মরণীয় করে রাখতেই ইরেভানের একটি এলাকার নামকরণ করেন ‘বাংলাদেশ’ হিসেবে।

আর সেই ‘বাংলাদেশ’ এর বাসিন্দা তিনি নিজেও। আমারই মতোন, ঠাট্টাচ্ছলে বলেন সের্গেই। জানান, ইরেভানে ‘কঙ্গো’ বলেও একটি এলাকা আছে। ইতিহাস সেই একই। অনেকদিন পর ‘বাংলাদেশ’ এ আসতে পেরে আমার মন ভরে যায়, সের্গেইকে আরও বেশি আপন শিক্ষক বলে মনে হয়।

স্মৃতিকথা লিখতে গিয়ে নিশ্চয়ই আমি ইতিহাস লিখবো না, অন্তত এই বোরিং কাজটা আমি করবো না। তবে আরমেনিয়া, ইরেভান, এই জায়গাগুলোর ঐতিহাসিক মূল্য এতোবেশি যে, কিছু না কিছু ইতিহাস উঠে আসবেই। বিশেষ করে, খ্রিস্টপূর্ব থেকেই এই অঞ্চল বার বার বাইরের শাসকদের রোষের শিকার হয়েছে। এখানকার মাটি উর্বর, সুফলা। প্রকৃতিও যেন ঢেলে সাজিয়েছে এই অঞ্চলকে। ভৌগোলিক কারণেই যেন মানুষগুলোও প্রাণবন্ত।

ইরেভানে আসার পর থেকে এখানকার মানুষ, এখানকার জীবনযাত্রার সাথে যতোই মিশছি, ততই আশ্চর্য হচ্ছি। না ইউরোপ, না এশিয়া। কখনও কখনও লোকজনকে একেবারে ঘরের কাছের আপনজন মনে হয়, কখনও মনে হয়, না, এরা ভিন সংস্কৃতির মানুষ। আমাদের সাথে ম্যালাই ফারাক তাদের। তবে খাবার-দাবার খুব বেশি অন্যরকম না, খাওয়া যায় অনায়াসে।

আমরা থাকি আভান এলাকায়। হোস্টেল থেকে বেরিয়ে কিছুদূর টিলা বেয়ে ওপরে উঠে গেলেই আঙুরের ঝাড় প্রায় প্রতিটি বাসায়। আসতে-যেতে স্বভাববশতই হাত চলে যায় গাছের দিকে। দু’একদিন আঙুর ছিঁড়ে খেয়েও ফেলেছি। পরে অন্যদের বারণ শুনে অনেক কষ্টে সেই লোভ সংবরণ করেছি। তবে মানুষজনের আতিথেয়তা বাঁধাই করে রাখার মতোন স্মৃতি। গাছের দিকে আমার শ্যেন-করুণ দৃষ্টি দেখে কতদিন বাড়ির বাবুশকা’রা (দাদি) আমার হাতে আঙুরের থোকা ধরিয়ে দিয়েছে, সেই গল্পের শেষ নেই। তখনই শোনা হয়ে যায়, এখানকার আঙুর পচানো ‘ওয়াইন’ পৃথিবী খ্যাত।

এমন কোন সপ্তাহান্তের ছুটির দিন যায়নি, যখন কারও না কারও বাসায় যাইনি। সপ্তাহজুড়ে রাস্তাঘাটে হয়তো কোনো ট্যাক্সিতে চড়েছি, বা বাসে চড়েছি, বা দোকানের কোনো খালা-দাদিমার সাথে পরিচয় হয়েছে, ছুটির দিনে তাদের বাড়িতেই আমাদের নিমন্ত্রণ বাঁধা ছিল।

কখনও কখনও সেইসব বাসায় গিয়ে মেলাতে পারিনি তাদের পেশাগত কর্মকে, আবার কখনও তাদের দৈন্যদশাও স্পর্শ করে গেছে খুব সহজেই। কিন্তু উভয়েরই আন্তরিকতা ছিল আকাশছোঁয়া। এই ভালবাসার কাছে হার মেনে যায় আমার আঠারো বছরের ফেলে আসা জীবনের টানাপোড়েন। এক মা আর বাসার ছোট্ট বাচ্চাগুলোকে ছাড়া আর কাউকে তেমন আর অনুভব করতাম না। জীবনটা কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে যায় আমার আরমেনিয়ান জনগণের ভালাবাসার ঘেরাটোপে।

শুধু কি বাসায় নিমন্ত্রণ! নিজেদের গাড়িতে করে শহরের বাইরের সৌন্দর্য তো ওরাই দেখিয়েছে আমাকে। পরিচয় করিয়ে দিয়েছে তাদের ঐতিহ্যপূর্ণ ইতিহাসের সাথে। শুনিয়েছে কেমন করে তাদের প্রিয় জন্মভূমিকে ছারখার করে দিয়েছে তুরস্কের বীরবিক্রম কামাল পাশা। ছোটবেলা থেকে বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের কল্যাণে যে কামাল পাশার নেতৃত্বে নিজেরাও বলীয়ান হয়েছি, সেই কামাল পাশাই এখানে চরম শত্রু, এখানে তার নাম উচ্চারণ করাই যেন অন্যায়, অনেকটা আমাদের কাছে পাকিস্তানের মতোন।

ইতিহাসের সবচেয়ে বড় নারকীয় গণহত্যার ঘটনাটি ঘটে এখানে এই আরমেনিয়ায় ১৯১৫ সাল থেকে ১৯২৩ সাল পর্যন্ত। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় এবং এর পরে। তুরস্কের মুসলমানরা ক্রিশ্চান নিধনের মহোৎসবে মেতে উঠেছিল তণ। নাৎসী বাহিনীর হাতে ৬০ লাখ ইহুদির মৃত্যু, কম্বোডিয়ায় খেমাররুজদের হাতে ১৭ লাখ দেশী ভাইবোনের মৃত্যু, এমনকি রুয়ান্ডার হুটুসদের হাতে আট লাখ জাতিগত টুটসিদের মৃত্যুর আগেই ঘটে গিয়েছিল আরমেনিয়া তথা বিশ্ব ইতিহাসের এই নৃশংস, পাশবিক হত্যাকাণ্ড। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে তুর্কিদের শাসন এশিয়া থেকে সংখ্যালঘুদের নি:শেষই করেছে কেবল। সেসময় গ্রিসের খ্রিস্টান জনগোষ্ঠীও শিকার হয়েছিল এই রোষানলের।

আরমেনিয়ানরা জাতিগতভাবে শান্তিপূর্ণ হলেও তুরস্কের নামে তারা ততোটাই ভিতরে ভিতরে জ্বলেপুড়ে খাক হয়ে যায়।

আরারাত পাহাড় দেখিয়ে বলে, ‘দেখো এই যে পাহাড়টা দেখতে পাচ্ছো, এটা আমাদের ছিল। কিন্তু এখন তুরস্ক সেটা দখল করে নিয়েছে। পাহাড়ের ওপর থেকে বয়ে যাওয়া নীল পানির নদীকে দেখিয়ে বলে, ওই নদীটা আগে আমাদের দেশে বইতো, এখন তা অন্যদেশে। আর এই যে আমাদের মেয়েদের দেখছো, ঘন কালো চুলের সুন্দরী মেয়েরা, এরাই তখন কামালের কু-নজরে পড়েছিল। ধরে নিয়ে গেছিল অল্প বয়সী মেয়েদের, জোর করে বিয়ে করেছে তাদের, সেই গর্ভে জন্ম নিয়েছে আজকের সুন্দরী তুর্কি মেয়েরা। আর বয়সী নারী, গর্ভবতী নারীদের পেট ফুঁড়ে হত্যা করেছিল যাতে কোন ভবিষ্যত প্রজন্ম আর তৈরি না হয় তাদের থেকে’।

armenian-survivors
১৯১৫ থেকে ১৯২৩ সাল পর্যন্ত গণহত্যায় নিহতদের ছবির একাংশ

এসব ইতিহাস শুনে শুনে কামাল পাশা সম্পর্কে আমার সব ভাল ধারণা উবে যায়।

ক্লাসের ফাঁকে ফাঁকে আমাদের ঘুরতে নিয়ে যাওয়া হয়। বেশিরভাগই ঐতিহাসিক স্থানে। একদিন আমরা গিয়েছিলাম পাহাড়ে। দূর থেকে তুরস্কের সর্বোচ্চ পর্বত আরারাতকে দেখা যায়। ১৯১৫ সালের গণহত্যার আগে পর্যন্ত এই আরারাত ছিল আরমেনিয়ার অংশ। সবচেয়ে গর্ব করার মতোন, বিশেষ করে বাইবেলে যে পাহাড়ের নাম আছে, সেই পাহাড়কে হারিয়ে আরমেনিয়ানরা অনেকটাই অসহায় আজ। এই পাহাড় হচ্ছে গোটা দেশের সুদৃশ্য চিত্রাবলি, গান, চলচ্চিত্রের অন্যতম এক সিম্বল।

অনেকেই বলেন, তারা আরারাতের নাম শোনেননি, কিন্তু শুনেছেন নুহের নৌকার সেই গল্প। কথিত আছে, এই নৌকা এসে ঠেকেছিল এই পাহাড়েই। উইকিপিডিয়া ঘেঁটে নিচের লাইনগুলো তুলে দিলাম এখানে—-

 “But God remembered Noah and all the beasts and all the livestock that were with him in the ark. And God made a wind blow over the earth, and the waters subsided. The fountains of the deep and the windows of the heavens were closed, the rain from the heavens was restrained, and the waters receded from the earth continually. At the end of 150 days the waters had abated, and in the seventh month, on the seventeenth day of the month, the ark came to rest on the mountains of Ararat. And the waters continued to abate until the tenth month; in the tenth month, on the first day of the month, the tops of the mountains were seen”.

আরমেনিয়ার পদে পদে ইতিহাস দেখে-পড়ে সদ্য স্বাধীন একটা দেশ থেকে যাওয়া এই আমার মধ্যে এক অন্যরকম পরিবর্তন আমি উপলব্ধি করি। ওদের নৃতাত্ত্বিক ইতিহাসের সাথে প্রাচীন ভারতেরও মিল পাওয়া যায়। ওদের রূপকথার সাথে আমাদের রূপকথার মিল পাই। এমন কত যে মিল খুঁজে ফিরি শুধুমাত্র দেশ থেকে হাজার হাজার মাইল দূরের থাকাটাকে আনন্দময় করে তুলতে। প্রতিনিয়ত সেই চেষ্টা আমাকে দেশটাকে চিনতে-বুঝতে সাহায্য করে। (চলবে)

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.