আর বীরাঙ্গনা নয়, মুক্তিযোদ্ধা

সালেহা ইয়াসমীন লাইলী: বীর প্রতীক আবদুল হাই সরকার যেদিন মুক্তিযুদ্ধের গল্পের ফাঁকে বললেন,তার এলাকায় বেশ কিছু বীরাঙ্গনা আছেন, যারা সংসার-সমাজ থেকে নিষ্পেষিত হয়ে নিঃস্ব জীবন-যাপন করছেন। যারা স্বীকার করেন,তারা মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি বাহিনীর দ্বারা ধর্ষিত হয়েছেন। এই সত্য একদিন তাদের ঘর কেড়েছে, কেড়ে নিয়েছে সংসার। সমাজ তাদের জীবনমৃত করে বাঁচিয়ে রেখেছে। তবুও তারা আবারও সত্য বলতে পিছপা নন।

আবদুল হাই এর সহযোগিতায় ১৬ জনের একটা তালিকা নিয়ে তাঁর দেয়া ঠিকানা মোতাবেক বাড়ি বাড়ি গিয়ে কথা বললাম। তাঁরা প্রত্যেকেই চোখ মুছতে মুছতে বললেন নিজের জীবনের ঘটে যাওয়া দুর্ঘটনার কথা। পরিবার-পরিজন থেকে বিতারিত হওয়ার কথা। সমাজের রক্তচক্ষুর শাসনে তিলে তিলে ক্ষয়ে যাওয়ার কথা।

সেসময় ঈদকে সামনে রেখে দুস্থ এই নারীদের সামান্য সহায়তা দিয়ে সম্মানিত করতে নিজেদের মাঝে কিছু চাঁদা তুলে তাঁদের প্রত্যেককে একটি করে ঈদের শাড়ি ও সামান্য ঈদ সামগ্রী দেয়ার জন্য কুড়িগ্রাম প্রেসক্লাবে ডাকা হলো।

এই উপহারটুকু তুলে দেয়ার জন্য জেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার সিরাজুল ইসলাম টুকুকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। আগে থেকে কমান্ডারকে বিস্তারিত জানানোর প্রয়োজন মনে করা হয়নি। ভাবা হয়েছিল,তিনি হয়তো জানতে পেরে খুশিই হবেন।কিন্তু মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার প্রেসক্লাবে ঢুকেই এই নারীদের আরেকবার অপমানিত করলেন। চরম অপমান।

তিনি বললেন, কোথা থেকে তোমরা যাকে-তাকে ধরে এনেছো বীরাঙ্গনার নামে। এরা কেউ বীরাঙ্গনা নয়। আমি যাকে বীরাঙ্গনা বলে সনাক্ত করবো, সেই প্রকৃত বীরাঙ্গনা। তারপর তিনি সেই মাতৃতুল্য(মায়ের বয়সী)নারীদের যেভাবে গালিদিলেন,তা আমাকে স্তব্ধ করে দিয়েছিল অনেকটা সময়। এর মধ্যে লজ্জায়-ঘৃণায় অপমানিত নারীরা মাথা নিচু করে আঁচলে মুখ ঢেকে উপহার গ্রহণকরা শেষ প্রায়।

প্রেসক্লাব সাধারণ সম্পাদক আহসান হাবীব নীলু একটা প্যাকেট কমান্ডারের হাতে দিয়ে একজন বীরাঙ্গনা নারীর হাতে দিতে বললেন। তিনি প্যাকেটটি ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে বললেন, ‘খবরদার! তোমরা আমাকে এমন কাজে জড়াবে না। এরপরেও যদি আমার সম্মতি না নিয়ে তোমরা এমন কোন কাজ কর, আমি তোমাদের ছেড়ে দেব না। মুক্তিযুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন করেছি, কারো স্বেচ্ছাচারিতা সহ্য করার জন্য নয়।’

সামনে প্যাকেট নিতে দাঁড়িয়ে থাকা নারীটির দিকে তাকিয়ে আবারো গালি দিতে থাকলেন। বয়স, অবহেলা ও দারিদ্র্যেরভারেন্যুব্জনারীটি মুখে আঁচল গুঁজে ফুপিয়ে কাঁদতে লাগলেন। আমি এবার যেন সম্বিতফিরে পেলাম। দৌড়ে গিয়ে তার পাশে দাঁড়িয়ে কমান্ডারের উদ্দেশ্যে বললাম, ‘আপনি এভাবে বলতে পারেন না। আমরা আপনাকে সম্মান দিতে এখানে ডেকেছি, তার অর্থ এই নয় যে,আপনি যা খুশি বলবেন।’ এবার তিনি আমাকেও ধমকালেন। একটা ব্যাপার লক্ষ্য করলাম, কমান্ডারের কথায় আমি ছাড়া প্রেসক্লাবে উপস্থিত সাংবাদিক ও সুধীকেউ মুখ খুলল না। তবুও আমি সেই নারীদের পাশে থাকার প্রাণান্তর চেষ্টা করলাম। চোখের জল মোছার বা সান্ত্বনা দেয়ার হিম্মত করলাম না।

‘কুড়িগ্রাম মুক্ত দিবসে’বীরাঙ্গনা নারীদের অবস্থা নিয়ে রিপোর্ট করতে যখন তাঁদের বাড়ি গেলাম। বাড়ি বলতে রেলেরপরিত্যক্ত ভাঙ্গা বাড়ি,  রাস্তার পাশের ঝুপড়ি ঘুরে ঘুরে তাঁদের কথা রেকর্ড করলাম। বীর প্রতীক আবদুল হাই সরকারের বক্তব্য দিয়ে নিউজ করলাম। ৬ ডিসেম্বর কুড়িগ্রাম মুক্ত দিবসে যখন টেলিভিশনে নিউজটি দেখাচ্ছিল কাকতলীয়ভাবে তখন টেলিভিশনের সামনে অনেক মুক্তিযোদ্ধার সাথে কমান্ডারও ছিলেন। তিনি আবারো আমাকে রিপোর্টের জন্য ধিক্কার দিলেন। আমি নাকি কুড়িগ্রামের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বদলে দিতে চাচ্ছি।

সেদিন আমি তাঁর কাছে জানতে চাইলাম, ‘মুক্তিযুদ্ধে কি কুড়িগ্রামে কোন নারী ধর্ষিত হয়নি? যদি আপনার উত্তর ‘হ্যাঁ’হয়,তো আমি আপনার কাছে তাঁদের নাম ও ঠিকানা চাই। আপনি দিতে পারবেন?’ তিনি বললেন, ‘অবশ্যই হয়েছে। তবে এরা নয়। আমি একটা তালিকা করার চেষ্টা করছি। হলেই দেব।’ ‘এটা একটা ভাল কাজ হবে। আমি সেই তালিকার অপেক্ষায় থাকলাম।’ কিন্তু আজো তার কোন তালিকা হয়নি।

গত শীতে ঢাকার কয়েকজন স্বেচ্ছাসেবী নারী-পুরুষের উদ্যোগে যখন জেলার শীতার্ত দুস্থ নারীদের সাথে এই বীরাঙ্গনা নারীদের কম্বল বিতরণকরা হয় তখন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তামোস্তাফিজার রহমান এ উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে নিজেও অংশগ্রহণেউৎসাহ বোধ করেন। পরে বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় ছবিসহ খবরটি প্রকাশিত হওয়ায় মুক্তিযুদ্ধের গবেষকরা কুড়িগ্রামে এসে এই নারীদের সাথে কথা বলে তাঁদের তালিকাভুক্ত করে রিপোর্ট প্রকাশ করেন।

স্বাধীনতার ৪৩ বছর পর হলেও জনতা ব্যাংকের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. আবুল বারাকাতের উদ্যোগে ২২ মে জনতা ব্যাংক নারী মুক্তিযোদ্ধা সহায়তা প্রকল্প কুড়িগ্রাম সদর উপজেলা পরিষদ হলরুমে এই ১৬ জন নারীকে (যাদের দুজন ইতিমধ্যে মারা গেছেন) জন প্রতি ৫০ হাজার টাকা করে অনুদানের চেক হস্তান্তর করেন। এসময় তিনি পাকবাহিনী ও তাঁদের এদেশীয় দোসরদের হাতে সম্ভ্রম হারানো দু’লক্ষ নারীর মধ্যে কুড়িগ্রামের ১৬ জন বীর নারী মুক্তিযোদ্ধা যাঁরা দেশের স্বাধীনতার জন্য নিজেকে বিসর্জন দিয়েছেন, দীর্ঘ সময় ধরেসমাজ- সংসারের কটুক্তি, অবহেলা আর গঞ্জনা সহ্য করে অনাহার-অর্ধাহারে জীবন যাপন করেছেন, তাদের কথা বিশেষভাবে স্মরণ করেন, তাঁদের প্রতি সম্মান জানান। তিনি বলেন, জীবনের মৌলিক চাহিদার কোনটাই পূরনের সাধ বাসাধ্য তাঁদের নেই। তবুও আজ তাঁদের পাশে দাঁড়াতে পেরে নিজেকে ধন্য মনে করছেন।

১৪ জন বীরাঙ্গনা মুক্তিযোদ্ধা নারী উপস্থিত হয়ে চেক গ্রহণকরেন। তাঁদের সাথে উপস্থিত ছিলেনতাঁদের ছেড়ে যাওয়া বা তাড়িয়ে দেয়া পরিবারের সদস্যরাও। যে দুই জন মারা গেছেন তাঁদের স্বজনরা এই চেক নিয়েছেন।

চেক হাতে পেয়েআবিরন(৬০), খুকি বেওয়া(৬২), তরুবালা (৬১), দুলো বেওয়া(৬০) সহ সবার চোখ ছলছল করছিল। খুশিতে, তবে চেক পাওয়ার খুশিতে। তাঁরা বললেন, এখানে সবাই আমাদের মুক্তিযোদ্ধা বলেছে। অনেক সম্মান দিয়ে কথা বলেছে।

বীর প্রতীক আবদুলহাইকৃতজ্ঞতা জানাচ্ছিলেন বার বার। তিনি বললেন,  মুক্তিযোদ্ধাদের মতো যদি এই নারীদের শুরু থেকেই রাষ্ট্রিয়ভাবে স্বীকৃতি দেয়া হতো, তাঁদের যদি আলাদা নাম দেয়া না হতো, তাহলে হয়তো তাদের এতোটা নিগৃহীত হতে হতো না। পরিবার থেকেও বিতারিত হতে হতো না। মুক্তিযোদ্ধাদের মতো তাঁরাও সর্বত্র সম্মানিত হতো।

 

লেখক ও সাংবাদিক

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.