এভারেস্ট জয়ী ছন্দার খোঁজ মেলেনি

Chhonda Gayenউইমেন চ্যাপ্টার:  তাইকোয়ান্দো থেকে এভারেস্ট, কোনটাতেই পিছিয়ে পড়ার পাত্রী ছিলেন না পশ্চিমবঙ্গের ছন্দা গায়েন। অদম্য এই মেয়েটি হিমালয়ের কাঞ্চনজঙ্ঘায় গিয়ে তুষারঝড়ে পড়ে তিনদিন আগে নিখোঁজ হয়ে গেছেন। সাথে ছিলেন দুজন শেরপা। তিনজনের খোঁজ এখনও মেলেনি। ছন্দার মা দুদিন বুক বেঁধেছিলেন, তিনদিনের দিন আর সেই ক্ষুদ্র আশাটুকুও করতে পারছেন না তিনি। তারপরও বার বার দরজার দিতে তাকান, মনে মনে ভাবেন, এই বুঝি মেয়ে এলো, এমন ডানপিটে মেয়ে, কোনদিন কারও বারণ শোনেনি। পাহাড়ের নেশা ওকে আজ কোন পারে নিয়ে গেল কে জানে!

২০১৩ সালে পশ্চিমবঙ্গের দ্বিতীয় নারী হিসেবে এভারেস্ট জয় করেন ছন্দা। এবছর তিনি মাউন্ট কাঞ্চজঙ্ঘা মিশনে গিয়েছিলেন। সফলভাবে তার শিখরেও উঠেছিলেন তিনি। নেমে আসার পথেই তুষারঝড়ে আক্রান্ত হয়ে হারিয়ে যান।

তায়কোয়ান্দোতে বহুবার তাঁর কিকের জোরে মাঠের বাইরে চলে গিয়েছেন প্রতিপক্ষ। সব আশঙ্কা উড়িয়ে জীবনযুদ্ধে সেভাবেই প্রকৃতিকে হারিয়ে আবার ফিরে আসবেন ছন্দা গায়েন, গত দুদিন ধরে এমন আশাই করছিলেন, ছন্দার তাইকোয়ান্দো ক্লাসের বিভিন্ন ছাত্রছাত্রী ও কোচ ইন্দ্রনীল গুপ্ত।

আনন্দবাজার পত্রিকা লিখেছে, ছন্দা গায়েনকে তুখোড় পর্বত অভিযাত্রী হিসেবেই চেনে গোটা ভারত। কিন্তু মার্শাল আর্টের অন্যতম বিভাগ তাইকোয়ান্দোতে জাতীয় চ্যাম্পিয়ন হিসেবে ছন্দাকে অনেকেই চেনে না। যদিও খুব ছোট থেকেই এই স্বল্প পরিচিত খেলায় নিয়মিত অনুশীলন করতেন ছন্দা। তাইকোয়ান্দোর বিভিন্ন স্তরের জাতীয় প্রতিযোগিতায় অনেক পদকও পেয়েছেন তিনি।

ছন্দার কোচ ইন্দ্রনীলবাবু জানান, আশির দশকের শেষ দিকে তাঁরা হাওড়ার বিধুভূষণ বালিকা বিদ্যালয়ে তাইকোয়ান্দো শেখানোর ক্যাম্প করছিলেন। ছন্দা তখন ওই স্কুলে পঞ্চম শ্রেণির ছাত্রী। অন্য ছাত্রীদের সঙ্গেই ওই ক্যাম্পে যোগ দিয়েছিল সে। পরে বাছাই ছাত্রীদের নিয়ে পরবর্তী ক্যাম্পে সুযোগ পেয়েছিল ছন্দা।তারপরে তাঁকে আর ফিরে তাকাতে হয়নি।

প্রায় ৩০টি জাতীয় স্তরের তাইকোয়ান্দো প্রতিযোগিতায় যোগ দিয়ে অর্ধেকের বেশি প্রতিযোগিতা থেকেই সোনা নিয়ে এসেছিল এই ডানপিঠে মেয়েটি। পেয়েছিল ব্ল্যাক বেল্ট। এরপরে বাড়িতে তাইকোয়ান্দো শেখাতে শুরু করে ছন্দা। গত বছরের ডিসেম্বরে হাওড়া ময়দানের কাছে একটি ক্লাবের মাঠে শেষ বার তাইকোয়ান্দো খেলতে মাঠে নেমেছিল ছন্দা।

ইন্দ্রনীলবাবু বলেন, “এভারেস্ট জয়ের পরে ওঁর সময় পাওয়া খুব মুশকিল হয়ে গিয়েছিল। তাই ওঁর অনেক ছাত্রছাত্রীকেই শেখানোর ভার আমার উপর দিয়েছিলন ছন্দা।”

পত্রিকাটি আরও লিখেছে, এবছর কাঞ্চনজঙ্ঘা অভিযানের আগে স্পনসর পেতে কালঘাম ছুটে গিয়েছিল ছন্দা গায়েনের। প্রথমে এগিয়ে আসেননি কেউই। সেই ছন্দারই বাড়িতে এখন নেতা-মন্ত্রীদের যাতায়াতের বিরাম নেই। বিরাম নেই সহায়তার প্রতিশ্রুতিরও।

তবে এই অবস্থায় কারও কোনও আশ্বাসই আর ভরসা জোগাতে পারছে না ছন্দার পরিবারকে। দুর্ঘটনার ৪৮ ঘণ্টা পরে মেয়ে কেমন আছে, জনে জনে প্রশ্ন করে চলেছেন ছন্দার মা জয়া গায়েন। জবাব মিলছে না। বুধবার পর্যন্তও মন শক্ত করে কথা বলছিলেন। বৃহস্পতিবার যত সময় গড়িয়েছে, ততই মানসিক ভাবে ভেঙে পড়েছেন তিনি। সন্ধ্যায় জয়াদেবী বললেন, “রাজ্য বা কেন্দ্র— কেউই মেয়ের খবর দিচ্ছে না। এটাই সব থেকে বড় আফসোস।’’

কাঞ্চনজঙ্ঘার পশ্চিম শৃঙ্গ জয় করতে গিয়ে মঙ্গলবার তুষারধসের কবলে পড়েন এভারেস্টজয়ী বাঙালি মেয়ে ছন্দা এবং দুই শেরপা— মিংমা পেমবা শেরপা ও দাওয়া ওয়াংচুক। তারপর থেকে আর খোঁজ নেই তাঁদের। খবর পেয়েই ছন্দাদের বাড়িতে শুরু হয় মন্ত্রী-বিরোধী দলের নেতানেত্রীদের আনাগোণা।

এসব দেখেশুনে ছন্দাদের প্রতিবেশী সঞ্জয় রায় বলেন, “আমরা রাজনীতি চাই না। মেয়েকে ফেরত চাই।”

অনেকেই বলেছেন, প্রতিকূল আবহাওয়ার জন্য হেলিকপ্টারও কাজ করতে পারছে না।

Chhonda Gayen 2
তায়কোয়ান্দো এক্সপার্ট ছন্দা

এ ভাবে সময় নষ্ট হওয়ায় উদ্ধারের সম্ভাবনা ক্রমশ কমছে বলে মনে করেন রাজ্যের অভিযাত্রীদের একাংশ। তাঁদের বক্তব্য, শুক্রবার উদ্ধারকাজ শুরু হলেও ঘটনাস্থলে পৌঁছতে আরও দিন তিনেক লাগবে। তা ছাড়া আবহাওয়া প্রতিকূল থাকলে শেরপাদের পৌঁছানোও প্রায় অসম্ভব।

সময়টা বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে মন্তব্য করেন আট বারের এভারেস্টজয়ী পাসাং শেরপাও। তিনি বলেন, “দুর্ঘটনার পরে অনেকটা সময় কেটে গিয়েছে। ওদের ফিরে পাওয়াটা ক্রমশই কঠিন হয়ে পড়ছে।” কেন কঠিন হয়ে পড়ছে, তা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি জানান, বেসক্যাম্পথেকে দুর্ঘটনাস্থল অন্তত তিন দিনের পথ। খাবার-পানীয়ের রসদ নিয়ে সেখানে গিয়ে খোঁজখবর শুরু করা কার্যত অসম্ভব। একই সুর মিংমা শেরপার গলায়। ছন্দার অভিযানের ব্যবস্থাপক আরোহণ সংস্থার কর্ণধার মিংমা ফোনে বললেন, “কপ্টার তৈরি আছে। আবহাওয়া একটু সাফ হলেই…।”

পর্বতারোহণে অভিজ্ঞতা রয়েছে হিমালয়ান নেচার অ্যান্ড অ্যাডভেঞ্চার ফাউন্ডেশন (ন্যাফ)-এর প্রোগ্রাম কো-অর্ডিনেটর অনিমেষ বসুর। তিনি বলেন, এই ধরনের দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে একটা ঘণ্টাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সময়। শুধু সময়ের কারণে শেষ হয়ে যায় সব মিরাকল -এর সম্ভাবনা। তাঁর কথায়, “খবর পাওয়া মাত্রই শিলিগুড়ি থেকে কয়েকজন আরোহী কাঠমান্ডু চলে গেলে কাজটা অনেক এগিয়ে থাকত।”

উদ্ধারকাজ কীভাবে হতে পারে, তা নিয়ে নানা মতের মধ্যেই মেয়ের পথ চেয়ে বসে আছেন জয়াদেবী।

 

 

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.