অকাজের থেকে কাজের মানুষ হওয়া

Parentingমনিজা রহমান: ঢাকা ছাড়ার আগের দিন দুপুরে আমার এক সহৃদয় বান্ধবী একখানা বই নিয়ে হাজির। সিদ্দিকা কবীরের ‘রান্না, খাদ্য, পুষ্টি’। ওর মনে গভীর শংকা, ভিনদেশে গিয়ে রান্নাবান্না না জানার কারণে আমি হয়ত অভুক্ত দিনাতিপাত করব। বইটা আমারও ছিল। অধিকাংশ বাঙ্গালীর ঘরেই থাকে। তবে ও উপহার না দিলে হাজার মাইল পথ পাড়ি দিয়ে বইটা টেনে আনা হত না।

নিউইয়র্কে আসার পরে বইটা উল্টে দেখার সুযোগ হয়নি। বই ছাড়াই রান্না করি। রান্নার আগে কোটাকুটি। তারপর হাড়ি-পাতিল মাজা। চুলা পরিস্কার। কিচেনের ফ্লোর মোছা। ময়লা নিয়ে গারবেজে ফেলা।

রবীন্দ্রনাথের লিপিকায় কেজো মানুষের স্বর্গে অকাজের লোকটির মতো দশা আমার। জীবনের দুই-তৃতীয়াংশ সময় ঘুরে ফিরে কাটিয়ে দেবার পরে এই আমি প্রথম খুব কাজের লোক হলাম।

প্রতিদিন সকালে ছেলেকে স্কুলে দিয়ে আসার পথে বাজার  করি। তারপর ‘উপায় নেই গোলাম হোসেন’- এই সংলাপ আউড়ে ঝাঁপিয়ে পড়ি ঘরের কাজে। কান খাড়া করে শুনি আমার স্বামীর সঙ্গে তাঁর মায়ের ফোনালাপ। সম্ভবত ওপাশ থেকে আমার শ্বাশুড়ি বলছেন, ‘খাওয়া-দাওয়া করিস কিভাবে ?’ আমার স্বামী এপাশ থেকে উত্তর দেন, ‘কেন মনিজা রান্না করে ! আর কে করবে ?’ আমার দেবর ফেসবুকে মেসেজ পাঠায়, ‘ভাবী আপনি তো বাংলাদেশে খুব ব্যস্ত থাকতেন। ওখানে গিয়ে কিভাবে সময় কাটান ?’

আমি ওকে বলতে চাই ‘দেখে যা, যা অনির্বাণ.. কি সুখে কেঁদেছে প্রাণ ?’ দেবরকে দেখানো না হলেও স্কাইপিতে আমার মা আর বোনকে কিচেন ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখাই। ওরা স্বস্তি অনুভব করে। এখানে সব কিছু তৈরি থাকে। আদা-রসুনের পেস্ট পাওয়া যায়। চার চুলার ওভেনে  রান্না করি। গরম নেই বলে সারাদিন কিচেনে থেকেও ঘেমে যাই না। এভাবে মধ্যবয়সে এসে আমি রান্নার পাঠ নেই বিদেশ বিভুঁইয়ে। আর মনে মনে ভাবি কাজের লোক শব্দটির মর্মার্থ।

সামান্য কয়টা টাকার বিনিময়ে কত কথা শুনিয়েছি গৃহকর্মে সহায়তাকারীদের। কখনও মানুষ ভাবিনি। পান থেকে চুন খসলে রুঢ় হয়েছি। আমার অনেক দুর্ভাগ্যের মধ্যে একটা সৌভাগ্য ছিল যে, ঢাকার বাসায় আমার সব সময়ই এমন সহায়তাকারী থাকতো। মানে তারা সহজে আমাকে ছেড়ে চলে যেত না। রান্নার জন্য একজন। ছেলেদের রাখার জন্য একজন। বাইরে থেকে আরেকজন এসে ঘর পরিস্কার আর কাপড় ধুয়ে দিয়ে যেত। এখানে আমাকে তিনজনের কাজ একা করতে হয়। সেই সঙ্গে ছেলেকে স্কুল থেকে আনা-নেয়া, হোমওয়ার্কে সাহায্য….. দম নেবারও ফুরসত নাই।

আগের দিনের বাসি ভাত আর সামান্য একটু তরকারী দিলে ঘর পরিস্কারের বুয়া বাথরুমও ধুয়ে দিয়ে যেত। এখন আমাকে প্রতিদিন বাথরুমের মেঝে মুছতে হয়। অনেকদিন রাত বারোটার  সময়ও ভিজিয়ে রাখা কাপড় ধুয়ে নেড়ে দিতে হয়। বাচ্চারা বিকালে ঘুমালে ওদের জন্য রাখা ছেলেটাকে বলতাম, আমার জামাগুলি ইস্ত্রি করে রাখবি। নয়ত পাশের লন্ড্রিতে দিয়ে আসবি। মাত্র ৫ টাকায় ড্রেস ইস্ত্রি করে দিত লন্ড্রিওয়ালা। আর এখানে ছেলের স্কুলের শার্ট-প্যান্ট ইস্ত্রি করতে গিয়ে পিঠ ব্যাথা হয়ে যায়। বিছানায় চিত হয়ে খুব শুয়ে থাকতে ইচ্ছা করলেও কাজ সেই সুযোগ দেয় না। ইস্‌ সোনার দেশ ছেড়ে এই কোথায় এলাম!

আমার ছোট ছেলে সৃজনকে খাওয়ানো অনেকটা সিংহকে পোষ মানানোর মতোই কঠিন কাজ। এই মতামত আমার বড় ছেলে মননের। কারণ ও প্রতিদিন দেখে কত ধরনের কৌশলের আশ্রয় নিয়ে আমি সৃজনকে খাওয়াই। রীতিমত দুইজনের গেম চলে। ও আমার কৌশল ধরে ফেললে আবার নতুন গেম সৃষ্টি করতে হয়। দেশে ওর দেখাশুনার দায়িত্বে থাকা ছেলেটাই খাওয়াতো। এখানে আসার পরে অনেকবারই মনে হয়েছে, কেউ যদি একবেলা সৃজনকে খাওয়াতো, তবে আমার সারা দিনের কাজের সমান হত।

তবে কি দেশে থাকতে আমি রান্না-বান্না করতাম না ? আসলে বিয়ের পর  থেকেই আমাকে প্রেগনেন্সি সংক্রান্ত নানা জটিলতায় ভুগতে হয়েছে। ডাক্তারের নির্দেশে বিশ্রামেই থাকতে হয়েছে বেশীরভাগ সময়। তাই গৃহকর্মীর রান্নাই ভরসা। দীর্ঘক্ষণ অফিসে থাকার পরে আর শক্তিও থাকতো না কিচেনে সময় দেবার। কখনও-সখনও নিজে রান্না করলেও কিচেনের বাকি কাজ তো করতে হত না। ওরাই সব গুছিয়ে দিত, আমি শুধু রান্না করতাম। তারজন্যে তো কেউ থাকতোই। শ্বশুরবাড়ি বা বাপের বাড়ি থেকে কেউ বেড়াতে এসে গৃহকর্মীর হাতের রান্না খেতে চাইতো না। উপায়ন্তর না দেখে তারা নিজেরাই রেঁধে খাওয়াতো আমাকে।

বলতে গেলে কাজের লোকের কাছেই বড় হয়েছে আমার দুই ছেলে। মননের জন্মের চার মাস পরে পেয়েছিলাম একটা মেয়েকে। ও অনেকদিন ছিল। সৃজনের ক্ষেত্রেও একই ঘটনা ঘটল। শেষ দিকে ওদের দেখাশুনার জন্য একটা ছেলে ছিল। ছেলেরা জ্বরে পড়লে, ডায়রিয়া হলে আমি ঠিকই অফিসে চলে যেতাম। কাজের লোকের ভরসাতে রেখে যেতাম ওদের। বাসায় ফিরে দেখতাম, ছেলেকে কোলে নিয়ে হাঁটছে একজন। আরেকজন স্যালাইন পানি মুখে তুলে দিচ্ছে। অথচ ওই বুয়ার শিশু সন্তানরা গ্রামের বাড়িতে মায়ের পথ চেয়ে থাকতো। মাঝেমধ্যে বুয়া বাড়ী যাবার জন্য ছুটি চাইলে রাগারাগি করতাম।

জন এফ কেনেডি এয়ারপোর্ট থেকে বের হয়ে যেদিন নিউইয়র্কে পা রেখেছিলাম, সেই দিনটার কথা খুব মন আছে। ঠান্ডা কনকনে হাওয়া গায়ে কাঁপন ধরিয়ে দিয়েছিল। তড়িঘড়ি করে গাড়িতে উঠে বসেছি। যেতে যেতে দেখেছি- শুষ্ষ্স্হীক পাতাহীন নির্জীব সব বৃক্ষরাজি। চারদিকে কোন প্রাণের স্পন্দন নেই। এ কোন বিরান ভূমিতে এলাম আমরা। পথের দুই পাশে তুষার জমে আছে। রাস্তার মাঝখানে গর্ত হয়ে গেছে বরফ খোড়ার কারণে। মনে পড়ল রৌদ্রকরোজ্জ্বল ঢাকাকে। মনের গভীরে বিষন্নতার বরফ জমল। হঠাৎ চোখে পড়ল রাসেল ক্রোর নতুন মুভির পোস্টার। নোয়াহ। মনের সুড়ঙ্গে কোথায় যেন সামান্য আলো জ্বলে উঠল। ঠিক  করে রাখলাম, সিনেমাটা আমাকে দেখতেই হবে।

কিন্তু সিনেমা দেখবো কিভাবে। আমার ছোট ছেলেকে নিয়ে মুভি থিয়েটারে যাওয়া সম্ভব নয় ! যদি একদিন আমার স্বামী সন্তানদের নিয়ে বাসায় থাকে, তবেই আমি মুভি দেখতে যেতে পারবো। কিন্তু সেই একদিন আর আসে না। আমার স্বামীর প্রতিদিনই কেন জানি অনেক কাজ পড়ে যায় !  অথচ কত শত দিন বন্ধুদের নিয়ে সিনেমা দেখতে গেছি। মঞ্চ নাটক দেখেছি। ভাবতে হয়নি কিছুই। বাসায় হেলপিং হ্যান্ড আছে না ! ওরাই তো বাচ্চাদের দেখে রাখবে।

কত ঘুরেছি। পিছুটানবিহীন। কত সংগঠন করেছি। কণ্ঠশীলন, বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্র, কোয়ান্টাম ফাউন্ডেশন, বাংলাদেশ অলিম্পিক এসোসিয়েশনের মিডিয়া কমিটির দায়িত্ব, বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের উইমেন ক্রিকেট উইংয়ের কাজ। কোথাও কথা দিতে সমস্যা হত না। জানতাম ব্যবস্থা তো আছেই। তাছাড়া মায়ের বাসা আছে না। মা-বোনরা দেখে রাখবে !

দীর্ঘশ্বাস ফেলি আর শুনি আমার সব সময়ের প্রিয় একটি গান……..

গোছানোর কথা ছিল, এমনই সময়

সব অগোছাল কথা, জমা নীরবতায়

জানি যত ভুলে যাবে , যা ছিল বেদনা

যতই ভোল না, যতই বোঝ না

জানি হঠাৎ ফেরারী কোন স্মৃতি কাঁদাবে…..

এক যুগ ধরে তিলে তিলে সাজানো সংসার ছেড়ে আবার নতুন করে সব কিছু শুরু করতে হচ্ছে এখানে। মানুষ থেমে থাকে না। খুঁজে নেয় ভালোবাসার জায়গা। আমিও সেভাবে খুঁজে নেই। নিউইয়র্কে আসার দেড় মাসের মাথায় শেষ পর্যন্ত আমার ‘নোয়াহ’ দেখার সুযোগ হয়। ফ্ল্যাশিং থেকে একা একাই চলে যাই এস্টোরিয়ায়। জীবনে প্রথম একাকী সাবওয়ে ভ্রমণ। পুরো পৃথিবী ডুবে যাবার পরে অবিশ্বাসীরা পাহাড় চূড়ায় গিয়ে জীবন বাঁচানোর চেষ্টা করে। তবু শেষ রক্ষা হয় না। পুরো পৃথিবী ডুবে যায় ভয়ংকর এক বন্যায়। শুধু ভেসে থাকে নোয়াহ’র আর্ক। মুগ্ধ বিস্ময়ে দেখি আর শিহরিত হই।

Monija Rahman
মনিজা রহমান

জ্যামাইকাতে কবি শহীদ কাদরির বাসায় যাই। ওখানে সাহিত্য আড্ডা হয়। বুদ্ধদেব বসুর ‘দুই খানা হাত’ কিংবা রবীন্দ্রনাথের ‘আমার সকল দু:খের প্রদীপ’ শুনতে শুনতে মনে হয় – দু:খ আছে বলেই প্রাপ্তির আনন্দ এত মধুর। কোয়ান্টাম ফাউন্ডেশন ইউএসএ’র কোয়ান্টায়নে গিয়ে মাত্র দুই ঘন্টা মৌন থেকে চলে আসি। বাসায় যে ছোট ছেলের জন্য অকুপেশনাল থেরাপিস্ট আসবে। আমার সন্তানের মধ্যে জাগিয়ে তুলবে অপার সম্ভাবনা। আমাকে তো থাকতেই হবে। কথা বলতে হবে খুঁটিনাটি, বিস্তারিত। আমাকে মৌন থাকলে চলবে না।

আমাকে মন খারাপ করে থাকলেও চলবে না। মাঝ রাস্তায় গিয়ে ভাবলে চলবে না, সেই স্টেশনের কথা। যেখানে আমার যাবার কথা ছিল। আমার দেরী দেখে সবাই চলে গেছে। আর আমি মাঝরাস্তায় একা পড়ে আছি। বিভ্রান্ত, বিচলিত, দিশেহারা। যে বিভ্রান্তি আমার সারা জীবনে কাটে না।

মাঝরাস্তা থেকে বাসায় ফিরে আমি আবার টমেটো দিয়ে মুরগির ঝোল রাঁধি। পেঁয়াজ চাক চাক করে কাটি। ছেলের কুচি কুচি করে কাটা কাগজ টোকাই আর ভাবি ফেলে আসা জীবনের আরাম আয়েশের কথা। গৃহকর্মীদের কাছে খুব ক্ষমা চাইতে ইচ্ছা করে। ইচ্ছে করে একদিন অনেক টাকা হলে ওদের গ্রামের বাড়িতে ঘর বানিয়ে দিয়ে আসবো।

মনে কত ভাবের বুদবুদ সৃষ্টি হয়। কাজের চাপে মিলিয়ে যায় এক সময়। লিখে রাখা হয় না কিছুই। এত অবসর কোথায় ? মাঝেমাঝে মনে হয় লিখি……..

এই সাদাকালো জীবন আর ভালো  লাগে না

কেউ উপহার দিল না  রঙীন শার্ট

বলল না এই রঙে আপনাকে মানাবে ভালো

ভিড়ের মধ্য আড়চোখে তাকালো না কেউ

মুখ টিপে হাসলো না

চোখে পড়তে চোখ

লেখালেখি না হলেও গান শোনা হয় প্রচুর। মনকে ব্যস্ত রাখতে ইউটিউবে গান শুনি। বহুদিনের ফেলে আসা সব গান…

যখন সময় থমকে দাঁড়ায়

নিরাশার পাখী দু’হাত বাড়ায়

খুঁজে নিয়ে মন নির্জন কোন

কি আর করে তখন

স্বপ্ন

স্বপ্ন

স্বপ্ন

স্বপ্ন…দেখে মন।।।।।।

 

মনিজা রহমান: সাংবাদিক, লেখক।

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.