আমরা যারা একলা থাকি-২২

imp 1উইমেন চ্যাপ্টার: দিন কয়েক আগে আমরা কয়জন বন্ধু সহকর্মী একসাথে হয়েছিলাম। আলাপ করছিলাম কাজের কথা, অকাজের কথা, পরিবারের কথা, নিজের কথা।

এক প্রাক্তন সহকর্মী বড়ভাই দোকা ছিলেন, এখন অনেকদিন হল একলা হয়েছেন। একলা নারীর সামাজিক নানা সমস্যার কথা আলাপ করছিলাম। শুনে হাসলেন খানিক বন্ধুসম সহকর্মী। জানালেন সেই সব কথা যা একলা থাকা পুরুষ হিসেবে তাঁকে প্রতিনিয়ত ফেস করতে হয়।

বললেন,’ তোমরা নারীদের সমস্যার কথা বলছো সেটা অস্বীকার করার কোন কারণ নাই। তবে এখনো বাংলাদেশের সামাজিক ব্যবস্থায় একজন একলা থাকা পুরুষও কম সমস্যার সম্মুখীন হয় না।’

নিজের জীবন থেকে জানালেন তিনি, প্রথম এবং প্রধান সমস্যা একলা পুরুষের একটি ভাল বাড়ি নিজের থাকার জন্য ভাড়া পাওয়া। বাড়ির মালিক প্রথমেই জানতে চান, পরিবারে কে কে আছেন। একলা পুরুষ জানার সাথে সাথে তাঁদের চেহারা বদলে যায়। কেউ কেউ স্পষ্ট বলেন, না দিব না ভাড়া। কেউ কেউ বলেন, কোন সামাজিক সমস্যা হলে চলবে না। এই সামাজিক সমস্যা বলতে তারা ওই বাসায় কোন নারীর আগমনকেই বুঝাতে চান। যেন একজন একাকী পুরুষের ( নারীরও) জীবনে যেকোনো নারী বা পুরুষের আগমন/উপস্থিতি শুধু একটি মাত্র সম্পর্কের কারণেই হতে পারে। অবশ্য গুলশান বারিধারায় তবু অতটা সমস্যা নয়।

সহকর্মীটির বিদেশী পাসপোর্ট থাকায় বাড়িভাড়া পাওয়া আরেকটু সহজ হলো। আমার মতন ‘ম্যাঙ্গো পিপল’ (আম জনতা) র তো আর বিদেশী পাসপোর্ট থাকে না। কাজেই সকল একলা পুরুষকে বেশীরভাগ ক্ষেত্রে ‘মেস’ বলে একটি সিস্টেম তৈরি করে আরও অনেক অচেনা, অর্ধচেনা, মন মানসিকতার মিলবিহীন কিছু মানুষের সাথে শুধুমাত্র বাধ্য হয়ে থাকতে হয়। যা অনেকক্ষেত্রে বিভিন্ন সামাজিক সমস্যা তৈরি করে। তো বাড়ি ভাড়ার সমাধান তো হল।

সহকর্মীর কন্যাটি থাকে বিদেশে। মাঝে মাঝে আসে বাবার কাছে বেড়াতে। সহকর্মীর মাও এসে থাকেন কখনো সখনো। বাসার দায়িত্ব বাসার গৃহকর্মীর কছে। বাসায় কাজে এলেন দু একজন সহকর্মী।

এসেই প্রথম প্রশ্ন,’একলা থাকেন? আর কে থাকে আপানার সাথে’? একটু পরেই বাড়ির কাজে সহায়তাকারী নারীটির আগমনে তাদের সিদ্ধান্ত, ‘ ও আচ্ছা, তাহলেই এই আপনাকে দেখে শুনে রাখে!’ যেন মধ্যবয়স্ক পুরুষকে দেখেশুনে রাখার জন্য তার জীবনে কোন না কোনভাবে নারীর উপস্থিতি আবশ্যকীয়।

কেউ কেউ আরেক ধাপ এগিয়ে গিয়ে কিছুটা ইঙ্গিত করেন গৃহকর্মীটি কতক্ষণ থাকে ইত্যাদি। আরেক সহকর্মী ছোটভাই জানালো, বেশ কিছুদিন ধরে তার মা অসুস্থ থাকার কারণে তার স্ত্রী মায়ের কাছে থাকছেন। প্রতিবেশী ভাবীদের (বাংলাদেশে এই সম্বোধনটি একটি অতি জনপ্রিয় এবং যথেচ্ছ ব্যবহৃত, যেন সকল নারীকেই শেষ পর্যন্ত বৈবাহিক পরিচয়ের সম্বোধনে ডাকাটা আবশ্যকীয়) চিন্তার অন্ত নাই কিভাবে একলা এই পুরুষটি থাকছেন। কেউ কেউ নাকি টেপা হাসিতে জিজ্ঞ্যেস করেও বসেন,’আপনার দিন কাটে কিভাবে? কষ্ট হয় না?”

তার বাড়ীর নারী গৃহকর্মীটির কাছে নানা কথা জানতে চায়! শুনলাম একলা থাকা পুরুষ সহকর্মীর বোন নাকি গাড়ীর ড্রাইভারের কাছে জানতে চান, ভাইয়ের কাছে কে এসেছিল, কতক্ষণ ছিল ইত্যাদি।

বলাই বাহুল্য কৌতূহলের মূল বিষয় কোন নারী এসেছিল ইত্যাদি। পঞ্চাশ উত্তীর্ণ ভাইয়ের একলা জীবনের যাবতীয় সাত্ত্বিকতা রক্ষার দায়িত্ব বোন নিয়ে নিয়েছেন। এখানেই শেষ নয়। সহকর্মী দেশের বাইরে যাবেন বেড়াতে। সাথে নারী আর কেউ যাচ্ছে কিনা সেই বিষয়ে ইনফরমেশন সংগ্রহের চেষ্টা শার্লক হোমসকেও ছাড়িয়ে যাবে!

কিছুদিন আগেই এক সহকর্মীর বউয়ের বাচ্চা হলো। বাচ্চার ভাল দেখভালের জন্য বউকে তার মায়ের কাছে পাঠানো হলো। এটাও সমস্যা ছিল না। সমস্যা হলো অফিসে। অন্য সব পুরুষ সহকর্মিরাই তাকে পরতে-পরতে ঠাট্টা-মশকরা করে, ‘আরে মিয়া, বউ নাই, তাই বলে শুকিয়ে গেলে চলবে? চালিয়ে যান’। স্পষ্টই বোঝা যায়, এই ইঙ্গিত মোটেও সুখকর কিছু নয়। তো সেই সহকর্মি কতক্ষণ ফোনে কথা বললো, এ নিয়েও অন্যদের উৎসাহের শেষ নেই।

শেষ করবো একটি আপাত হাসির, কিন্তু বেশ ভেবে দেখবার মতন একটি ঘটনা দিয়ে। আমারই সহকর্মী ছেলেটি, এখনো তিরিশ হয় নাই। বিয়ে করে নাই। একলা থাকে একটি মেস বাড়ীতে। অফিসের কাছেই, নিকেতনে। একদিন কোন কারণে সকাল ৮টায় গিয়েছি অফিসে, অফিস শুরু হওয়ার প্রায় ঘণ্টা আগে। করিডোর পার হয়ে নিজের রুমে ঢুকতে গিয়ে মনে হল করিডোরের একপাশে ছেলেদের বাথরুমে জলের শব্দ, যেন কেউ স্নান করছে। অবাক হলাম। অফিস সহকারী জানালো ফাইন্যান্স অফিসার ছেলেটি স্নান করছে। জানলাম বেশ কিছুদিন থেকেই সে এটা করছে।

অফিস বাথরুম স্নানের জায়গা নয়। ইমারজেন্সি কিছু হলে এক কথা, যেমন আমার গায়ে একবার পাখি পায়খানা করে দেয়াতে আমাকে অফিসের মধ্যেই শাওয়ার নিতে হয়েছিল। কিন্তু নিয়মিত কেউ এটা করলে ডিসিপ্লিনারি অ্যাকশনের আওতায় পড়ে যেতে পারে। কিছু না বলে ঢুকে গেলাম নিজের রুমে। বিকেলে ছেলেটিকে ডাকলাম। রুমে ঢুকলো সে কাচুমাচু হয়ে। বললাম কি ব্যাপার বলতো? তোমার বাসায় কি জলের সমস্যা?

যা সে বলল তাতে আমার আর মুখ দিয়ে কথা বের হলো না। যে মেসে সে থাকে সেই মেসের মালিকও থাকেন ওই বাড়িতেই। তো তারা থাকে তিনতলায়। তাদের ফ্ল্যাটটি এখনো তৈরি শেষ হয় নাই। বাথরুমগুলোতে দরজা লাগে নাই!!!! সে এতদিন একা একটা রুমে থাকাতে কোন সমস্যা হচ্ছিলো না, কিন্তু এই সপ্তাহ থেকে তার একজন রুমমেট এসেছে। বাড়িওয়ালার কাছে বাথরুমের দরজার অনুরোধ নিয়ে গেছিল তারা।

বাড়িওয়ালা বলেছেন, একলা ছেলেদের আবার এত প্রাইভেসির কি আছে! স্ত্রী থাকলে তাও না হয় হতো! উনি বাথরুমের দরজা আপাতত লাগাতে পারবেন না! তাই সে সবাই অফিসে আসার আগেই এসে তার সকালের স্নান ইত্যাদি সেরে নেয়। তবে সে আর রুমমেট নিজেরাই উদ্যোগ নিয়েছে দরজা একটা লাগিয়ে ফেলার, ততদিন যেন আমি একটু পারমিশন দেই। বলার কিছু ছিল না!

আসলে আমাদের সমাজে, একলা থাকা নারী কি পুরুষ আসলেই বেশকিছু সামাজিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়, যা কিনা একটু যৌক্তিকভাবে চিন্তা করলেই আর কোন সমস্যা হওয়ার কথা নয়।

বেড়ালের গলার কাছে ঘণ্টাটা এত বছরে যদিও আনা গেছে, কিন্তু বাঁধাটা এখনো হয়ে উঠছে না।

 

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.