আমার জীবন, আমার লড়াই

Simple life-Piash
ছবি: পিয়াস রহমান

লুতফুননাহার লতা: পাঁচ বছরের একটি শিশুকে নিয়ে আমার জন্ম জন্মান্তরের মাটি ছেড়ে , আমার সকল আপন জনের মায়ামাখা মুখগুলো পিছনে ফেলে , বাংলাদেশ টেলিভিশনের তিন নাম্বার স্টুডিওর জ্বলজ্বলে চারটি ক্যামেরার চোখ ফাঁকি দিয়ে দেশান্তরী হয়েছিলাম ! অজানা দেশ ,অজানা সংস্কৃতি ,নতুন ভাষা ,জীবনের অনিশ্চিত দিনরাত্রির পারাবার ! বুকের ভেতর সর্বগ্রাসী হাহাকার , ভয় ভাবনা তখন নিঃশেষ করে দিচ্ছিল ,তখনো বুঝিনি জীবনের আরো বড় আরো কঠিন বিপর্যয় আমার জন্যে অপেক্ষমান ! আমার যুদ্ধ কেবল দেশান্তরী হয়েই শেষ হয়নি ! আমার আরো যুদ্ধ বাকী! আমার যুদ্ধ অনিঃশেষ !

২০০১ যখন আমেরিকার টুইন টাওয়ার ধসে গেল সেই সময়ে কী সাংঘাতিকভাবে আমার আর সিদ্ধার্থের জীবনেও নেমে এলো নিষ্ঠুর নিয়তির নির্মম খেলা! কী বিস্ময়কর সিম্বলিকভাবে টুইন টাওয়ারের মত ভুলুন্ঠিত হলো আমার এতো দিনের মাথা উঁচু করা গৌরব ! আমার পারিবারিক বিপর্যয় !

আমি তখন হাঁটতে হাঁটতে মাটিতে বসে পড়ি ! মাঝ রাস্তায় গাড়ী থামিয়ে বসে থাকি ! গাড়ী নিয়ে বেরুলেই রোড এক্সিডেন্ট করি, প্যানিক অ্যাটাক হয়ে রাস্তায় গড়াগড়ি দিয়ে অজ্ঞান হয়ে ৯১১ ইমার্জেন্সি এ্যাম্বুলেন্সে ডাউন টাউন নিউইয়র্ক হাসপাতালে চলে গেলে আমার আট বছরের সিদ্ধার্থ হারিয়ে যায় !

এই এতো বড় দেশ এতো বড় শহরে আমার কেউ থাকে না পাশে এসে দাঁড়াবার যেদিন আমার ডাক্তার আমাকে স্তব্ধ করে দিয়ে বলে ‘ তোমার সি এ ১২৫ এলিভেটেড, তোমার ক্যান্সার!’
না ক্যান্সার হয়নি আমার , দুই ঘন্টার জায়গায় আট ঘন্টা অপারেশনের পর সকল রকম বায়োপসি করে দেখা গেল ওটা ক্যান্সার নয় ! অপারেশনের দিন সিদ্ধার্থকে বন্ধু জলির বাসায় পাঠিয়ে একাই গেলাম হাসপাতালে , হাতের মুঠোয় ডাক্তার ইয়েহুদা বারজভিকে লেখা চিরকুট, তাতে লেখা ;

‘তুমি ছাড়া আমার অপারেশানের ব্যাপারে আর কেউ নেউ সঠিক সিদ্ধান্ত দেবার, আমি আশা করব , তুমি সঠিক সিদ্ধান্ত নেবে ! আমার জন্যে অপারেশান থিয়েটারের দরজায় দাঁড়িয়ে থাকবার কেউ নেই!, যদি মরে যাই নিচের ফোন নাম্বারে আমার মাকে একটি খবর দেবে ! ‘

ক’দিন পরে আমার জন্যে জাউ ভাত রান্না করে নিয়ে দেখতে গিয়েছিল আমার বন্ধু ছোট ভাই আযম আর জাকারিয়া । দিন সাতেকের মাথায় হাসপাতালে আমাকে দেখতে এসে আমার চারিদিকে এতো মেশিন পত্র দেখে নাকের ভেতর , গলার ভেতর নল ফল ঢোকান দেখে সিদ্ধার্থ হাউমাউ করে কান্না জুড়ে দিল ” ওরে আম্মুরে , তোমার কি হইছে রে !’

হাসপাতাল থেকে ঘরে ফিরে সিদ্ধার্থকে নিয়ে মাস খানেকে একা একা বিছানায় পড়ে থেকে সুস্থ হয়ে আবার নতুন করে চাকরী খোঁজা , নতুন করে বাঁচবার আশায় বুকে পাথর বেঁধে এগিয়ে যাওয়া ! আমি মা ! পৃথিবীর কেউ আমাকে দাবিয়ে রাখতে পারবে না ! আমার সন্তানের জন্যে বেঁচে আমাকে থাকতেই হবে , জগতের তাবত যুদ্ধে আমাকে জয়ী হতেই হবে !

আমার এ গল্প কেবল আমার একার নয় ! এ হল সারা বিশ্বে আমার মত অগনিত মেয়ের সংগ্রামের গল্প ! তবে মনের জোরের টিপস দিতে পারি সহজে ! সে হল আমার রবীন্দ্রনাথ ! তিনি আছেন সাথে সাথে, আমার আমৃত্যু দুঃখের তপস্যায় ।

শেয়ার করুন:
  • 4
  •  
  •  
  •  
  •  
    4
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.