রোজ নামচা-১৭

ami maaউইমেন চ্যাপ্টার: ‘কতদিন ঘুমাই না আমি’- দীর্ঘনি:শ্বাস ফেলে কথাটা বললো মারিয়েলা।

ডোমিনিকান রিপাবলিক থেকে যুক্তরাষ্ট্রে ভাগ্যের সন্ধানে আসা মারিয়েলা সিঙ্গেল মাদার। ‘কেন ঘুমায় না সে?’ ‘কারণ আমি বেঁচে থাকার জন্য দুটি ভিন্ন ভিন্ন হোটেলে কাজ করি রাত-দিন। তিনটা শিফটের কাজ শেষ করে মাত্র এসে বসেছি বেঞ্চিতে। একটু জিরিয়ে নেবো ট্রেন আসা পর্যন্ত’। কাজটা কি ধরনের? ‘গত রাতে আমি আমার রুম সার্ভিস কাজে যাই ১১টায়, ভোর ছয়টা পর্যন্ত কাজ করি। স্নান করতে বাসায় ফিরি কিছুক্ষণের জন্য, আটটার মধ্যে আমাকে আরেক হোটেলের ফ্রন্ট ডেস্কের কাজে পৌঁছাতে হয়েছে। বিকেল সাড়ে তিনটা পর্যন্ত সেখানকার কাজ। এরপর আবার প্রথম হোটেলে ফিরে আসি প্রায় দৌড়ে। আরেকটা শিফট সেখানে শুরু হয় বিকেল চারটায়। এই তো’।

‘কিন্তু কি করে সম্ভব মারিয়েলা?’ ‘সম্ভব, কারণ আমি সিঙ্গেল মাদার। খুব ছোটবেলায় আমি এখানে আসি। আর সেজন্য আমি খুশি। কিছুই ছিল না, প্রায় শূন্য হাতে আমি আমার জীবন শুরু করেছিলাম। দুটি বাচ্চাকে আমি বড় করেছি। দুটি চাকরি করেছি, যাতে ওরা পড়াশোনা করতে পারে, কলেজে যেতে পারে। আমি আমার বাচ্চাদের সবসময় বলি, দেখো, আমি কত পরিশ্রম করেছি। এমনকি আমার ঘুমের সময় পর্যন্ত ছিল না। আমি নিজের সময়কে নিয়ন্ত্রণ করতে পারিনি। আর এজন্যই তোমাদের পড়াশোনা করতে হবে। আমি যা করতে পারিনি, তা যেন তোমরা করতে পারো, সেজন্যই আমার এই কষ্ট। তোমাদের যেন কোন অভাব ছুঁতে না পারে’।

কোথায় কোন সুদূরের মেয়ে মারিয়েলা। কিন্তু ওর গল্পটা তো বিশ্বব্যাপী সব মারিয়েলারই গল্প। বাংলাদেশের সাহেরাদের গল্প যেমন এটি, তেমনি মনিকারও।

মনিকা ওর কথা শোনে একটু কটাক্ষ করেই যেন বললো, ‘তোমরা শোনো মারিয়েলার গল্প। আমার গল্প কি শোনো? শুনতে চেয়েছো কখনও? মারিয়েলা একটা আধুনিক রাষ্ট্রে থেকে কষ্ট করে বাচ্চাদের বড় করেছে, যেখানে ওর আর ওর বাচ্চাদের নিরাপত্তা দিয়েছে রাষ্ট্র। কিন্তু আমার? আমার বা বাচ্চাদের নিরাপত্তা, শিক্ষা কি দিয়েছে রাষ্ট্র? থাকার জায়গা নিশ্চিত করেছে রাষ্ট্র? করেনি। ভোর সাড়ে ছয়টায় যখন মিরপুর-২ নম্বরের বাসা থেকে বেরিয়ে আসতাম, বাচ্চারা ঘুমিয়ে থাকতো। সকাল সাড়ে ১০টা পর্যন্ত বিবিসি বাংলা সার্ভিসে কাজ করতাম, তারপর বেরিয়ে রাজা বাজার হয়ে পূর্ণিমা সিনেমা হলের সামনে নেমে আন্ডারপাস ক্রস করে আসতাম প্রথম আলোতে। বিকেল পাঁচটা পর্যন্ত কাজ করে ফার্মগেট হয়ে আবার ছুটতাম বিবিসিতে অসম্পূর্ণ কাজ সম্পূর্ণ করতে। রাত সাড়ে নয়টা-১০টা নাগাদ বের হতাম ইন্দিরা রোডের অফিস থেকে। তারপর বাসে করে মিরপুর, সেখান থেকে রিকশায় বাসায় পৌঁছাতে বেজে যেত সাড়ে ১১টা। বাচ্চারা তখন আবার ঘুমিয়ে। স্নান সেরে-খেয়ে-দেয়ে ঘুমাতে ঘুমাতে রাত দুইটা। আবার পরদিনের জার্নি। বাচ্চারা স্কুলে যেতো বুয়ার হাত ধরে। আসতোও তারই সাথে। বুয়া আমার ছেলেটাকে কোলে করে বাজারে গিয়ে কোন দোকানে বসিয়ে রেখে বাজার করে নিয়ে আসতো। পরে শুনেছি বাজারের গন্ধে ছেলে আমার প্রায়ই বমি করে দিতো।

এতো গেল কাজের কথা। শুধুমাত্র একটা চাকরির টাকায় বাসা ভাড়া দিয়ে খরচ চালানো সম্ভব হতো না বলে আরও অনেক কাজ করতে হতো। বিবিসির কাজ ছাড়াও আজ ইউনিসেফ, কাল ইউএনডিপি, পরশু কেয়ার-এর মতো সংস্থাগুলোর টুকিটাকি কাজ করতাম। সপ্তাহান্তে ছুটি কি জিনিস দেখা হয়নি বহুদিন। ডে অফের আগের দিন অফিস করে এসে রাতের বাসে চলে যেতাম ঢাকার বাইরে। ভোরে পৌঁছে সারাদিন বিবিসির জন্য কাজ করে আবার রাতের বাস ধরে ঢাকায় ফেরা। পরদিন সকালে আবার যথারীতি আগের রুটিন। টানা চার বছর ডে অফ নিতে পারিনি। মাঝে মাঝে খুব দম বন্ধ হয়ে আসতো, কিন্তু বাচ্চাদের মুখের দিকে তাকিয়ে সব সহ্য করে গেছি।

এভাবেই তো পাড়ি দিয়ে দিলাম একটা জীবন। আজ বাচ্চারা বড় হয়েছে, নিজেরটা বোঝার কথা। তারপরও যখন ওরা বুঝতে চায় না, তখন নিজেকে সবচেয়ে বেশি অসহায় আর দুর্ভাগা মা মনে হয়।

বিশ্বের সব সিঙ্গেল মাদারদের গল্প প্রায় একই। ধনী-দরিদ্র বলে কোন কথা নেই। তবে আমাদের দেশে সামাজিক ভ্রুকুটিও এসে যোগ হয় এই নিরন্তর লড়াইয়ে। তখন যুদ্ধটা হয় ত্রিমুখী-চতুর্মুখী। তবে যারা এই লড়াই ঠেলে সামনে এগিয়ে যায়, জীবনে সফলতা তাদেরই প্রাপ্য হয়। (চলবে)

 

 

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.