সোভিয়েত নারীর দেশে-৭

সুপ্রীতি ধর:

এভাবেই চলে যাচ্ছিল দিন। হোস্টেলে আমার রুমমেট আছে, নাসিরের নেই। মেশার সহজাত অবস্থান থেকে আরও অনেক দেশি বন্ধু জুটিয়ে নিলাম। ইয়েমেন আর পাকিস্তানের মেয়েরা খুব সাবলীল ছিল, তাই সময় লাগলো না ওদের সাথে মিশে যেতে। দিব্যি উর্দু-বাংলা-ইংরেজি মিলিয়ে একটা ককটেল ভাষা বানিয়ে ফেললাম।

ক্লাসের বেশিরভাগই লাতিন আমেরিকান। ওদের সাথেও আমার বন্ধুত্ব জমে গেছে ভাষার প্রতিকূলতা সত্ত্বেও। যদিও ওদের ফ্রি মেশামেশিকে আমি কিছুটা বাঁকা চোখেই দেখছি। তারপরও আমি বেশ আনন্দেই আছি নতুন বন্ধু-বান্ধব নিয়ে। আর মিশতে না পেরে নাসির ততটাই কেঁদে-কেটে দিন পার করতে লাগলো।

এরই মাঝে মাহবুব ভাই আমাদেরকে রান্নার সরঞ্জামাদি কিনে দিল। সেই ছোট্টবেলায় রূপকথার গল্প পড়ে আর বাংলা সিনেমার বদৌলতে আলাদা সংসার করার সেকী তীব্র বাসনা মনে পুষতাম। কবে যে আমার আলাদা ঘটিবাটি হবে, মনে হতো জীবনটা বুঝি পিকনিকের আদলে, মিছামিছি খেলনা বাসন-কোসনে রান্না করে খাওয়া আর কী! আঠার বছর বয়সে এসে হাঁড়ি-পাতিল নিয়ে দিব্যি সংসার শুরু করলাম বিদেশ-বিভুঁইয়ে।

রান্নার কথা মনে পড়লে এখনও এতো বছর পর এসেও হাসি পায়। দেশে থাকতে মাঝে-সাঝে রান্না করেছি আমি, তবে বেশিরভাগই মায়ের তত্ত্বাবধানে, এটা-ওটা ফোঁড়ন দিয়ে সেই রান্না। যাওয়ার সময় মা-ও আমার সব ধুয়ে-রোদে শুকিয়ে পোটলা বেঁধে দিয়েছে। কালজিরা, মেথি, মৌরি কোনকিছুই বাদ দেয়নি। এসব ফোঁড়ন দিয়ে রান্নার জন্য তরিতরকারিও মোটামুটি সবই পাওয়া যায় আরমেনিয়াতে, ইউরেশিয়া বলে কথা! কিন্তু এগুলো কিনে এনে, চাকু দিয়ে কেটে রান্না করা চাট্টিখানি কথা না। বিদেশে এসেও যদি চূলার পাড়ে কাটিয়ে দিতে হয় দিনমান, তাহলে আর কীইবা অর্থ থাকে এ জীবনের! সারাজীবন বাসায় ঝগড়া করে এসেছি, রান্নাবান্না আমার জন্য নয়। আর সেই আমিই কিনা রান্না করছি?

ভাবতে বসলাম, সহজে রান্নার উপায় কী? আলুর তরকারিতে ডিম ফেটে দেয়া অথবা বেশি করে টমেটো, ক্যাপসিকাম দিয়ে ডিম ভেজে খাওয়াটাই আমার কাছে জীবনধারণের অন্যতম উপায় বলে বোধ হলো। সাথে মশল্লা তো আছেই। ফলে নতুন নতুন রান্না আবিষ্কার করে এক্সপেরিমেন্ট শুরু করলাম, যেন সময়ও বাঁচে, আর আমরাও বাঁচি।

আমরা রান্না করে মাঝে মাঝে খাওয়াই নাসিরকে। নাসির নিজেও ততদিনে হাত পাকাতে শুরু করে দিয়েছে। সে আবার মাংস রান্না করে, সুতরাং আমি প্রায়ই তার অতিথি হওয়া শুরু করি।

সপ্তাহে পাঁচদিন ক্লাস করি, নতুন একটা ভাষা শিখছি। একেবারে অ, আ, ক, খ থেকে। দারুণ সেই দিনগুলি। এই ভাষাতেও ম তে মামা (মা) ডাকটাই শিখি, শুধু প তে পাপা। শব্দ দুটো শিখেই হোস্টেল পরিস্কার করতে আসা মাঝবয়সী নারীকে ‘মামা (মা’), আর হোস্টেলের গেটকিপার যিনি, তাকে আমরা পাপা (বাবা) ডাকতে শুরু করি। এই দুজন দেখি, হোস্টেলের সব দেশি ছেলেমেয়েদের মা-বাবা। আর তারাও সেটা এনজয় করেন, একটা অভিভাবক ভাব নিয়ে, স্নেহ নিয়ে কথা বলেন। আমরা নির্ভরতা পাই। এই দুজনের নাম কখনও আমরা জানার চেষ্টাও করিনি।

দেশ ছেড়ে এতোদূরে এসে মা-বাবা ডাকার মহিমা খুঁজে পাই। আর আমি যেহেতু কখনও নিজের বাবাকে ডাকতে পারিনি, আমার মধ্যে তখন অন্যরকম একটা অনুভূতি হয়। চোখ ভরে আসে জলে। আর সেই ভিনদেশি পাপা সস্নেহে কুশল কামনা করেন প্রতিক্ষণ। কোথায়, কখন যাই সব তার নখদর্পণে থাকে, বিদেশি ছেলেদের ব্যাপারে সতর্ক করে দেন আমাকে আর জ্যোতিকে।

সিরিয়ার গোলান উপত্যকার দুই ক্লাসমেট গাসসান আর ওয়াদিয়া আমাদের দুজনকে খুব ফলো করতো শুরু থেকেই। ক্লাসের পর প্রায়ই তারা আমাদের রুমে আসতে চাইতো। কিন্তু এই পাপা সেখানে বিশাল পাহাড়ের মতো দাঁড়িয়ে থাকতেন, কিছুতেই তারা সেই সুযোগ করে উঠতে পারতো না। যেদিন প্রথম বরফ পড়লো ইরেভানে, গাসসান জ্যাকেট দেয়ার কথা বলে রুমে আসতে চাইলো। পাপাও এলেন সাথে। যদিও ছেলেমেয়েদের হোস্টেলে যে কেউই আসতে পারতো অন্য হোস্টেলগুলো থেকে। কিন্তু এই দুজনের ব্যাপারে পাপার এলার্জি ছিল, তা আমরা বুঝতে পারতাম। আর তাই আমি যখন সেই জ্যাকেট ফিরিয়ে দিলাম গাসসানকে লাগবে না বলে, পাপা সেদিন খুব খুশি হলেন আমার ওপর। বললেন, তোমরা ‘ভারতীয়দের’ সংস্কৃতিই আলাদা। এখানে বলে রাখি, বাংলাদেশ আলাদা দেশ হলেও তারা সংস্কৃতিকে এক হিসেবেই দেখতেন তখন পর্যন্ত। এখনকার খবর জানি না।

ক্লাস চলছে, ক্লাস করছি। আমাদের যিনি টিচার, তার নাম এখন আর মনে নেই পুরোটা। তবে সের্গেই ডাকতাম আমরা। বয়সে তরুণ, অসাধারণ একজন মানুষ। আর ইতিহাস সম্পর্কে তাঁর এতো জ্ঞান যে আমাদের খোশ-গল্প করতেই সময় কেটে যায়। উনি বাংলাদেশ সম্পর্কেও অনেক জ্ঞান রাখতেন, গর্ব বোধ করতেন আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধ নিয়ে। আমি তাঁর কাছ থেকেই সম্ভবত দেশ সম্পর্কে অনেক নতুন তথ্য পাই। উনি একদিন বললেন, আমার জন্য তাঁর একটা সারপ্রাইজ অপেক্ষা করে আছে, সময় হলেই দেখাবেন। আমার তো আর তর সয় না। কী সেই সারপ্রাইজ! উনি মুচকি হাসেন।

এদিকে ফোনেটিক ক্লাসটাও বেশ মজা লাগছে। কত গান শিখছি আমরা, কত কবিতা পড়ছি। রুশ ভাষা, যার কিছু শব্দ আর বাক্য ছাড়া কোনকিছুই জানতাম না মাত্র ক মাস আগেও, এখন আমি ছোটদের বই পড়তে পারি অনায়াসেই। সেগেই আমার পারফরমেন্সে বেজায় খুশি, আমার উচ্চারণ নাকি রুশদের মতোনই।

দিন যায়, প্রকৃতিতে পরিবর্তন আসে, শীত তখন দোরগোড়ায়। আমাদের শীতের কাপড় কিনতে নিয়ে যাওয়া হয় বড় একটা সুপারমার্কেটে। কিন্তু শিশুদের বিভাগে। আমাদের সাইজ সব এখানকার শিশুদের মতোই। অসুবিধাটা হলো শিশুদের জন্য ফ্যাশনেবল তেমন কিছু নেই। অগত্যা শীত নিবারণ করতে তাই বেছে নেওয়া। হাঁটুঅব্দি জুতা আর কৃত্রিম ফারকোট কিনে রুমে ফিরি।

স্তালোভায়ার (ক্যান্টিন) খাবারও পছন্দ করে ফেলেছি (রান্নার ভয়ে আরও), এমনকি আরমেনিয়ান কফির সুনামও তখন মজ্জায় মজ্জায় উপলব্ধি করছি। ক্লাসে বসেই স্তালোভায়া থেকে কফির গন্ধ পাই, সের্গেইয়ের কাছ থেকে ছুটি নিয়ে দৌড়ে এসে এক কাপ কফিও খেয়ে যাই। বাদামের মতোন কফি বিচি হাতের মেশিনে গুড়ো করে গরম বালুতে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে সেই কফি বানানো হয়। আহ, এখনও মনে হলে কেমন যেন নেশার মতোন লাগে। তখন বুঝতে পারি, মানুষ কেন সিগারেট খায়, কেন তা নেশা হয়। আমার হয়েছিল কফির নেশা। এখানে আরও ঘি ঢালে আমার সিরিয়ার বান্ধবী নাহলা।

আরব দেশ সম্পর্কে কীরকম একটা ধারণাই না ছিল আমার এতোদিন! এই নাহলাকে দেখে তার আমূল পাল্টে যায়। মিনি স্কার্ট পরা, মুখে সবসময় সিগারেট, উদ্ভট এক সাজে ওকে দেখে আমি রীতিমতোন ভড়কে যাই। কিন্তু কৌতূহল আমার পিছু ছাড়ে না। ওকে আরও জানতে, আরও বুঝতে ওর সাথে মেশা শুরু করি। ওর কাছ থেকেই কিছু কিছু আরবী শব্দ শিখি, ওর রান্না শিখি।

যাই হোক, এমন সময়ই একটা ঘটনা ঘটলো। আমি এইদেশে পড়তে এসেছিলাম অর্থনীতি। মস্কো থেকে আমাদের কাগজপত্র এলো, দেখা গেলো ‘কোড’ বদলে গেছে আমার। অর্থনীতি হয়ে গেছে সাংবাদিকতা। সেকী মন খারাপ আমার। কাঁদতে কাঁদতে বাসায় মায়ের কাছে চিঠি লিখি। দাদার কাছে হাওয়াইতে চিঠি লিখি। আমার কেন জানি তখন ওই দেশটাকে অসহ্য ঠেকা শুরু করে, স্বপ্ন পূরণ হবে না ভেবেই হয়তো। কিছুতেই আর থাকবো না, একেবারে পণ করে ফেলেছি যেন। দাদাও মোটামুটি সায় দিয়ে ফেলেছে আমেরিকা থেকে, যেন আমি ফিরে যাই, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার ভর্তিটা কিভাবে অক্ষত রাখা যায়, সেই কথাও প্রায় পাকাপাকি।

এমন সময় টিচার সের্গেই রক্ষাকর্তার ভূমিকায় নামলেন। তিনি সব শুনলেন, পরিবারের ইতিহাস শুনলেন। আমার পড়ার আগ্রহের কথা জানলেন। অত:পর বললেন, ‘তুমি থেকে যাও, যেও না। এই জীবন তুমি আর পাবে না। জীবনের বড় মানে হচ্ছে জীবনটাকে তুমি কত বিস্তৃত করে উপলব্ধি করতে পারছো, সেখানে। এই সুযোগটা তুমি এখানেই পাবে’। আমি কিছুটা নড়েচড়ে বসলাম আমার সিদ্ধান্ত থেকে। তাছাড়া ততদিনে এই দেশটার প্রতি একটা আকর্ষণ গড়ে উঠেছে আমার মনে, তা থেকে বিচ্যুত হতেও চাইলো না মন।

তিনি আমার মন ভাল করার জন্য তাঁর বাসায় আমাদের ক্লাসের পাঁচজনকে একদিন দাওয়াত দিলেন। আমরা মহানন্দে চললাম তাঁর নির্দেশমতো ঠিকানা ধরে ধরে। এটিও বললেন, সেই যে সারপ্রাইজের কথা তিনি বলেছিলেন, আজই তিনি দেবেন সেটা আমাকে।

বাসে করে যাচ্ছি সের্গেইয়ের বাসায়। একটা বাসে হয়নি, দুটো বাস লেগেছে। দ্বিতীয় বাসটি তখন প্রায় গন্তব্যের কাছাকাছি, সের্গেই বলেছিলেন, আমরা যেন খুব ভাল করে খেয়াল করি চালকের অ্যানাউন্সমেন্ট। আমরা তাই করছিলাম। প্রতিটি ঘোষণাই আমরা মনোযোগ দিয়ে শুনছিলাম, পাছে না আবার গন্তব্য ভুল করি। আমাদের সাথে অভিজ্ঞ বা ভাল ভাষা জানা কেউ তো নেই। আর তখন মোবাইলের যুগও না। কাজেই হারিয়ে গেলে পাবে কে?

হঠাৎই চালকের এক ঘোষণায় আমার অন্তরাত্মা ঝনঝন করে উঠলো। আমি ডুকরে কেঁদে উঠলাম। এ আমি কী শুনছি! চালক বলে চলেছেন, ‘আমাদের পরবর্তী স্টপেজ ইউগা-জাপাদনি বাংলাদেশ’। ঠিক শুনছি তো? কী বলেছেন উনি, বাংলাদেশ? এটা কি করে সম্ভব? এখানে বাংলাদেশ আসবে কোথা থেকে? প্রায় ঝাঁপিয়ে পড়লাম চালকের ওপরে। কী বললেন আপনি? অত চোস্ত রুশ তখনও জানি না। কিন্তু কী বলতে চাই তা বোঝাতে পারি। উনাকে বলতে থাকলাম, তুমি জানো আমি বাংলাদেশের মেয়ে? তুমি জানো? চালক আমার দিকে তাকিয়ে হেসে মাথা নাড়লেন শুধু। স্টপেজে আসার পর নামিয়ে দিলেন আমাদের। উনি আমাদের সুখী জীবন কামনা করে বাসের দরজার বাটনে চাপ দিলেন। দরজা বন্ধ হয়ে গেল।

সামনে দাঁড়িয়ে সের্গেই। হাসি হাসি মুখ। আমার ছলছল চোখ দেখে উনি বললেন, সারপ্রাইজটা কেমন হলো? কিছুই বললাম না প্রত্যুত্তরে। একটা কেমন যেন অভিমান কাজ করলো আমার সের্গেইয়ের ওপর।

(চলবে)

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.