রোজ নামচা- ১৬

Leena Haq
লীনা হক

লীনা হক: আমার স্টুডেন্ট ইন্টার্ন রাজেশ জেসপার। ভারতীয় বংশোদ্ভূত ডেনমার্কের নাগরিক পঁচিশ বছর বয়সী কোপেনহেগেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র রাজেশের কথা এর আগেও লিখেছিলাম।

রাজেশ কাজ শিখতে এসেছে বাংলাদেশে, সেই সাথে আমার একটু হেল্পও হয়। রাজেশকে সব মিটিং মিনিটস ড্রাফট করার দায়িত্ব দিয়েছি। রাজেশ আর নেপালী সহকর্মী রিতাসহ গিয়েছিলাম সুসং দুর্গাপুর আর বিরিশিরিতে, সেখানে আমাদের তিনটি প্রকল্পের কাজ চলছে। রিতা আর আমার মূল উদ্দেশ্য গ্রামের মানুষজনের সাথে কথা বলা বিশেষ করে আদিবাসী গ্রামগুলোতে যাওয়া আর দুর্গাপুর উপজেলা নির্বাহী অফিসারের সাথে মিটিং, ফেরার পথে নেত্রকোনার ডিসি’র সাথে মিটিং। মোট চার দিনের সফর।

রাজেশ মূলত বুঝে নিচ্ছে প্রকল্পগুলির কাজের ধরন। দ্বিতীয় দিন ঢাকা অফিসের এডমিন অফিসারের ফোন, কি ব্যাপার? কাঠমান্ডু অফিস থেকে ফোন এসেছে রিতার স্বামী হঠাৎ অসুস্থ হয়ে হসপিটালে, রিতাকে পরের দিনের ফ্লাইটেই ফিরে যেতে হবে কাজেই আমাদেরকে তড়িঘড়ি ফিরতে হল ঢাকায়। শেষ দুপুরে রওনা করে গাজীপুরের বিখ্যাত জ্যাম ঠেলে ঢাকায় পৌঁছুতে পৌঁছুতে বেশ রাত। মানসিক এই অবস্থায় রিতাকে আর হোটেলে যেতে দিলাম না, সেই সাথে রাজেশকেও থেকে যেতে বললাম আমার বাসায়।

কোন রকমে দুটো খেয়ে যার যার মতন বিছানায় যাওয়ার প্রস্তুতি। সারাদিনের ধকল আর গরমে কাহিল অবস্থা। রাজেশকেও বললাম স্নান সেরে ঘুমুতে যেতে। কিছু সময় পরে ডাইনিং হলে জলের বোতল নিতে এসে শুনি কে যেন আমার নাম ধরে ডাকছে, তাকিয়ে দেখি, গেস্ট রুমের দরজা দিয়ে মুখ বের করে রাজেশ বলছে, আমি কি কালকে সকালে স্নান করতে পারি? এখন আমার ইচ্ছে করছে না। কোন সমস্যা হবে কি?

আমার কানে বাজলো সারাদিনের ক্লাস টিউশন সেরে ঘেমো শরীরে আমার ছেলে সম্পদের গলা, মা, এখন আর শাওয়ার নিতে ইচ্ছে করছে না, সকালে করবো, আই প্রমিস। রাজেশ বাংলাদেশে ছিল প্রায় তিন সপ্তাহ। সে আমার সাথে বিভিন্ন মিটিঙে গেল, মিনিটস লিখল, বেশ কিছু ফাইলিং বাকি ছিল, আমাদের প্রায় পেপারলেস অফিসে সব ডকুমেন্ট ইনটরানেটে আপলোড করতে হয়, স্লো নেট স্পীডে সে এক বিরক্তিকর কাজ। রাজেশ আমার বহুদিনের জমে থাকা ফাইলগুলো আপলোড করতে সহায়তা করলো।

যাতে সে বাংলাদেশী পারিবারিক আর সামাজিক পরিমণ্ডলের কিছু ধারণা পেতে পারে সেইজন্য কোন হোটেল বা গেস্ট হাউজে না রেখে তার থাকার ব্যবস্থা হয়েছিল আমারই বন্ধু একজন বাংলাদেশীর বাসায়। নিজের হাতে রান্না করে রাজেশ আমার বন্ধুকে তাক লাগিয়ে দিলো। আমাকে আবার অনুরোধ করলো আমি যাতে রহস্য ফাঁস না করে দেই যে সে আমার থেকে রেসিপি লিখে নিয়েছে এবং রান্না করার সময় ফোনে আমার নির্দেশ অনুযায়ী করেছে। হেসে বলেছি, কোন চিন্তা নাই, কেউ জানবে না। একথায় সে আবার বলে, কিন্তু আমার মনে হয় সে (আমার বন্ধুটি) বুঝে যাবে। দুজনেই হাসি এই কথায়।

তিন সপ্তাহে তিনটি উইকএন্ড আর একটা সরকারী ছুটি পাওয়া গেল। প্রতি উইকএন্ডের শুরুতে রাজেশ জিজ্ঞ্যেস করতো, আমি কি তোমার বাসায় আসতে পারি! তোমাকে ঘরের কাজে বা রান্নার কাজে সহায়তা করার জন্য! যথারীতি প্রতি শুক্র-শনিবার সকালে রাজেশ চলে আসে আমার এখানে সারাদিন কাটিয়ে রাতে ডিনার সেরে ফিরে যেত তার home stay বাড়ীতে।

আমার বন্ধু হাসে, আপা, এই ছেলে তো আপনারই সত্যিকারের ছেলে যেন। উইকএন্ড ছাড়াও অনেকদিন অফিসের শেষে আমার সাথে বাসায় চলে আসে। আমার বাসায় এসেই সে কাজে লেগে যায়। আমাকে পেঁয়াজ কেটে দেয়, মুরগি কেটে ধুয়ে দেয়, টেবিল লাগায়, খাবার শেষে লেফট ওভার খাবার ফ্রিজে তুলতে সাহায্য করে।

আমার মেয়ে হাসে, ভাইয়া, তুমি এত কাজ কেন করো? চলো সিনেমা দেখি। রাজেশ বলে, না না, আগে হাতের কাজ শেষ করি, তারপরে সিনেমা। মেধা বলে, করো তুমি কাজ, আমি এইসব করবো না। রাজেশ দু একদিন রান্নাও করলো আমার এখানে।

এরই মধ্যে ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের ইউরোপ ডে। আমাদের সংস্থার একটি ডকুমেন্টারি ফিল্ম বেস্ট কমুনিকেশন পুরস্কার পেয়েছে। পুরস্কারের ঘোষণা হয়েছে ব্রাসেলসে গত মাসে। ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের ঢাকা অফিস থেকে জানানো হল আমাদের হাতে পুরস্কারটি তুলে দেয়া হবে ইউরোপ ডে’র অনুষ্ঠানে। সকল ইউরোপিয়ান ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলোর রাষ্ট্রদূত, সরকারের মন্ত্রী, আমলা থেকে শুরু করে এনজিও’র কর্তাব্যক্তিরা এই অনুষ্ঠানের আমন্ত্রিত। রাজেশের জন্যও একটি কার্ড যোগাড় করা হল। কার্ডে লেখা আছে পোশাক’ কমফোর্টেবল’। এদিকে কাঠমান্ডু থেকে আসার সময় বাংলাদেশের গরমের কথা মাথায় রেখে রাজেশ শুধু টি শার্ট আর কেডস নিয়ে এসেছে। অনুষ্ঠান উপলক্ষে আরেক সহকর্মীর সাথে গিয়ে এপেক্স থেকে একজোড়া স্নিকার কিনে নিয়ে এলো। শার্ট কেনার পালা, একটা ফুল স্লিভ শার্ট তাকে আমি কিনে দিলাম উপহার হিসেবে। কত বার যে সে শার্টটি পরে দেখল।

জানালো, নিজের পরিবারের বাইরে এই প্রথম কেউ তাকে এত দামী উপহার দিলো। যাওয়ার আগে দিয়ে রাজেশ তার মা, বাবা আর বোনেদের জন্য উপহার কিনল। এই প্রথম সে সবার জন্য একসাথে উপহার কিনছে। মা আর বোনেদের জন্য কেনার সময় আমার সাহায্য দরকার। কেনার পরে প্যাকেট খুলে বার বার দেখে আর বলে, মা এটা পছন্দ করবে। বোনেরাও অপছন্দ করবে না মনে হয়। তার এইসব কাজ দেখি আর নিজের ছেলের কথা মনে ভাসে। কিছু কিনে এনে নিজেই কতবার যে দেখত আর বোনের সাথে পরামর্শ করতো আমি পছন্দ করবো কিনা!

যাওয়ার আগের রাতে আমার সাথে খেতে বলেছিলাম। রাজেশ এত্ত বড় আর সুন্দর একটা ফুলের বোকে নিয়ে হাজির। সেই সাথে একটা তরমুজ আর আনারস। সে জেনেছে যে, এই দুটো আমার প্রিয় ফল। আর এনেছে জিলিপী। মাদারস ডের সময় আমার সাথে তার দেখা হবে না তাই এই অগ্রিম উপহার। নিজের চোখের জল লুকোবার জন্য রান্না ঘরে চলে যাই। এখানে থাকার সময়ে রাজেশকে পরামর্শ দিয়েছিলাম, চেন্নাইয়ে যে চাইল্ড হোমে সে ছিল, সেই হোমে মেইল করতে আর যে সময় তাকে আর তার বোনকে দত্তক দেয়া হয়েছিল তখনকার সুপারভাইজারের ফোন নাম্বার যোগাড় করে দিতে। তাহলে সে অন্তত গ্রামের ঠিকানাটা হয়তো পাবে।

রাজেশ ফিরে গেছে কাঠমান্ডুতে তার বাংলাদেশের প্রথম দফার এসাইনমেনট শেষ করে। সে চলে যাওয়ার পরে আমার এবং মেধার দুজনেরই একটু খালি খালি লাগছিল। যদিও প্রতিদিন কথা হয় স্কাইপ অথবা ভাইবারে। আজকে সে জানালো, চেন্নাইয়ের সেই চাইল্ড হোমটি বন্ধ হয়ে গেছে গত জানুয়ারিতে আর সুপারভাইজারের ঠিকানা কেউ জানে না। কাজেই চেন্নাই যাওয়ার প্ল্যান হয়তো বাদই দিতে হবে।

জিজ্ঞ্যেস করলাম, রাজেশ তোমার কি মন খারাপ হয়েছে এই খবরে? কেউতো ছিল না ওখানে। কাউকে তো পেতে না তোমার মায়ের কথা জানার জন্য। ম্লান গলায় জানালো, কিছুটা মন খারাপ হয়েছে। আমি দেখতে চেয়েছিলাম আমি কোথা থেকে এসেছি। কেমন ছিল সেই জায়গা, যেখানে আমার মা-বাবা থাকতো। আমার জানতে ইচ্ছে করে, আমার নিজের মায়ের কথা, যার কোন স্মৃতি আমার মনে পড়ে না।

নিজের মনেই বলে চলে, আমি জানি, আমি আর বাসন্তী অনেক ভাগ্যবান। যে জীবন আমরা পেয়েছি তাতো আমাদের হওয়ার কথা ছিল না। কিন্তু তবু আমি জানতে চাই আমার অতীত। আমার নিজের মায়ের কথা। আমার দত্তক মায়ের চোখের মনি আমি, তবু আমার বড্ড জানতে ইচ্ছে করে কেমন দেখতে ছিল আমার নিজের মা। কেমন করে আদর করতো আমাকে। আমার ‘রাজেশ’ নামটি কি মায়ের রাখা? সিনেমার সেই হিরো কি তার পছন্দের ছিল!

ভাইবারে তার গলা অস্পষ্ট হয়ে আসে যেন। হিন্দী ফিল্মের বিখ্যাত নায়ক রাজেশ খান্নার কথা আমিই বলেছি তাকে। গোটা তিনেক সিনেমাও সে দেখেছে রাজেশ খান্না অভিনীত। নিজের আবেগের রাশ টেনে আমি বলি, তাহলে চেন্নাই যাওয়ার পরিকল্পনা বাদ দিও না। যাও তুমি। দত্তক পিতা-মাতার কাছ থেকে জেনে নাও যদি কোন ঠিকানা থেকে থাকে, যদি নাও থাকে তবু তুমি যাও। চেন্নাই শহরের কাছাকাছি জেলে গ্রামগুলোতে ঘুরলে হয়তো কোন সন্ধান পেতেও পারো। না পেলেও অন্তত নিজের মনকে বলতে পারবে তুমি চেষ্টা করেছিলে। আমাদের কিছু সহযোগী প্রতিষ্ঠান আছে চেন্নাইয়ে, তাদের একজনকে আমি মেইল করবো, ফোনও করবো তোমাকে সহায়তা করার জন্য। তুমি ভেবো না, কিছু একটা সন্ধান পাওয়াই যাবে। বলার সময় যুক্তিবাদী মন বলছিল এটা প্রায় অসম্ভব একটা কাজ। অন্যদিকে আমার ভিতরের মায়ের মন বলছিল, কে জানে কোন নিকট আত্মীয়কে হয়তো পেয়েও যেতে পারে যে তাকে বলতে পারবে তার মায়ের কথা। চেষ্টা করতে অসুবিধা কি!

এতদিনে হাসিখুশী প্রাণবন্ত রাজেশের চোখে লুকিয়ে থাকা বিষণ্ণতার প্রকৃত কারণ যেন বুঝতে পারলাম। এই পৃথিবীর অন্যতম ভাল রাষ্ট্রের সচ্ছল শিক্ষিত পরিবারে বেড়ে ওঠা রাজেশ এখনো প্রতিনিয়ত জেলে পরিবারে তার নিজের মাকে খুঁজে ফিরে। যে মাকে তার মনে পড়ে না, যে মায়ের গায়ের সুবাস তার নাকে ভাসে না। মায়ের কোন ছবি তার কাছে নাই, নিজের থেকে তিন বছরের বড় বোন বাসন্তীর বর্ণনায় সবুজ লাল চেক শাড়ী আর লম্বা বেনীতে ফুল গোঁজা মায়ের একটি কল্পনা চিত্র সে করে নিয়েছে। কখনো সে আমার সাথেও মেলাতে চায় তার কল্পনার মায়ের প্রতিচ্ছবি। এসবই কল্পনা। মা তার বেঁচে নেই। তবু সে খুঁজতে চায় কেমন ছিল সেই গ্রাম, যেখানে তার জন্ম হয়েছিল জেলে পরিবারের এক নারীর গর্ভে। কেমন ছিল সেই নারী!

কেউ কি বলতে পারবে তাকে কেমন ছিল তার মায়ের চেহারা, সন্তনাদের জন্য সে কেমন করতো! কি রেঁধে খাওয়াত ছেলে-মেয়েকে! কেমন ঘর ছিল তাদের! পৃথিবী ছেড়ে চলে যাওয়ার মুহূর্তে সে কি তার অবুঝ সন্তানদের জন্য হাহাকার করে উঠেছিলো! এই খোঁজা হয়তো রাজেশের সারাজীবন ধরে চলবে।

 

 

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.