আমরা যারা একলা থাকি- ২১

imp 1উইমেন চ্যাপ্টার: একলা থাকি’র ২০ পর্ব প্রকাশের পর আরও প্রতিক্রিয়া পাওয়া গেল। একলা থাকি লেখা হয় একাকী জীবনের বিষয় নিয়ে, কিন্তু এইবারের প্রতিক্রিয়া দেয়া এই পাঠকদের প্রায় সবাই যৌথজীবন যাপন করছেন।

পুরুষরা জানিয়েছেন, ‘ব্যক্তি স্বাধীনতার’ প্রশ্নে বিবাহিত জীবনে পুরুষ হিসাবে স্ত্রী দ্বারা কি ধরনের কঠোর নিয়ন্ত্রণে তারা আবদ্ধ। কিভাবে তাঁরা নিজের পরিবার নিজের মা-বাবা-ভাই-বোন থেকে ক্রমশ বিচ্ছিন্ন হয়েছেন। আর নারীরা বলেছেন, কিভাবে পুরুষতান্ত্রিক পরিবার আর সমাজ ব্যবস্থার যাঁতাকলে তাঁদের ব্যক্তিসত্ত্বা নতজানু হতে হতে ক্রমশ বিলীন হয়ে গিয়ে পরজীবীতে পরিণত হন তাঁরা।

একজন নারী পাঠক বলেছেন, আমাদের সমাজে পুরুষের ব্যক্তিস্বাধীনতা ভোগের পক্ষে, আর নারীর সবকিছু বর্জন করে সন্ন্যাসব্রতে। এখনো আমাদের কাছে আদর্শ নারীর সমার্থক শব্দ হচ্ছে ত্যাগী। নারী যদি তার যাবতীয় ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য বোধ ত্যাগ না করতে পারে তবে তার আদর্শে আস্থাভাজনতা অর্জিত হয় না। অপর একজন নারী বলেছেন, আধুনিক নারী যখন তার অন্তর্নিহিত শক্তি দিয়ে এই সমাজের পুরনো বৃত্তকে ভাংতে শুরু করেছে তখন চিরদিনের সুবিধাভোগী পুরুষ তাতে ভীত হবে অথবা বিপক্ষে যাবে সেটাই স্বাভাবিক। কারণ নারীর তৈরী নুতন সামাজিক বৃত্তে থাকতে হলে পুরুষকে তার আগের অবস্থান ছেড়ে সমঝোতায় আসতেই হবে। আর সেজন্যই এই ভীত অথবা বিপক্ষে থাকা পুরুষরা নারীর ক্ষেত্রে “স্বাধীনতা” শব্দটির নানান রুপদান করে থাকে। প্রকৃতপক্ষে “স্বাধীনতা” শব্দটির অন্য কোন বিশেষণ দরকার নেই, এটি স্বয়ংসম্পূর্ণ একটি শব্দ। যে ব্যক্তি স্বাধীন হবে তাকে নিজেই অনুভব করতে হবে সে স্বাধীনতার আনন্দ আর পালন করতে হবে দায়িত্ববোধ। স্বাধীনতা শব্দটি সমাজ বহির্ভুত নয়। আর সে জন্যই যে কোন মানুষের স্বাধীনতার সীমা/বৃত্ত অন্য মানুষকে আঘাত করবে না। যদি করে তবে তা হবে “স্বেচ্ছাচারিতা” আর এটি নারী-পুরুষ সবার জন্য একই। এক্ষেত্রে শুধু নারীর দিকে আঙ্গুল তোলার দিন শেষ হয়েছে।

অপরদিকে একজন পুরুষ পাঠক বলেছেন, ভুল ধারণা বা অপব্যাখ্যা থেকেই ভুল বুঝাবুঝি আর ভুল বুঝাবুঝি থেকেই সম্পর্কের অবনতি আর ক্ষয় আর ক্ষয়ে যাওয়া সম্পর্ক ক্রমশ বয়ে আনে একাকী জীবনের পরিণতি- এক ছাদের নীচে অথবা বাইরে।

এর আগেও একলা থাকি’র একটি পর্বে লেখা হয়েছিল এই বিষয়ে, বিশেষ করে আমাদের সমাজে ‘স্ত্রী’ বা ‘স্বামী’ শব্দটি এখনো যেন ‘ক্রীতদাস’ এর সমার্থক। এখনো দম্পতিরা মনে করেন ‘স্বামী’ বা ‘স্ত্রী’ টি তার সম্পত্তি। যেন ‘স্বামী’ বা ‘স্ত্রী’ র আলাদা কোন মানব সত্ত্বা বিয়ের পরে আর থাকতে নেই। যেন বিয়ের দলিলে সাইন করার সাথে সাথে দুপক্ষই ‘বন্ডেড লেবার’। আসলে আমাদের পারিবারিক শিক্ষায় এখনো নারীদেরকে তৈরি করা হয় এমন এক সুখী বৈবাহিক জীবনের জন্য, যার মধ্যে শুধুই শেখানো হয় পুরুষকে তুষ্ট রাখার উপায়সমূহ। যা নারীর ভেতরের মানবসত্ত্বাকে  ছাপিয়ে যেতে বাধ্য করে অনেকসময়ই।

অন্যদিকে পুরুষের জন্য বৈবাহিক শিক্ষা বলতে আছে, বিয়ের প্রথম রাতেই মারতে হবে বেড়াল। এই বেড়াল আর কিছু নয় এটি নারীর ব্যক্তিসত্ত্বার রুপক বলেই আমার কাছে মনে হয়। আবার অন্যদিকে কিছু নারী এটাও ধারণা করে যে, বৈবাহিক সূত্রে পাওয়া পুরুষটি তার হাতের পুতুল মাত্র।

কেন যেন আমাদের সমাজে এখনো যুগল জীবনে সুখী হবার মূলমন্ত্র হিসাবে ‘ছাড়’ দেয়ার ব্যাপারটি প্রাধান্য পায়। ছাড়ের কথা যখন আসে তখন প্রথম টার্গেট নারী। নারীকেই ছাড়তে হয় তার পরিবার, ব্যক্তিস্বাধীনতা, আত্মসম্মানবোধ, ক্ষেত্র বিশেষে পড়ালেখা, তার চাকরি। পুরুষের ছাড়ের ব্যাপারটি নারীর ছাড়ের তুলনায় প্রায় কিছুই না। তবে হ্যাঁ, ‘তোমারে বধিবে যে গোকুলে বাড়িছে সে’- এই মিথকে সত্যি করে কিছু পুরুষও ‘ছাড়’ দেয়া খানিক অসহায়ের দলে পড়ে যেতেই পারেন।

আসলে দুজন নারী-পুরুষের যুগল জীবনকে সফল সুখী করার জন্য প্রথম যে বিষয়টি বোঝা দরকার তাহলো, পুরুষ নারীকে বা নারী পুরুষকে অধীনস্থ দেখতে না চাওয়া বা একে অপরের উপরে কর্তৃত্ব করতে না চাওয়া। দখলদারিত্বের এই মনোভাব অবশ্যই ছাড়তে হবে। এই জীবন দুজনের জীবন। স্ত্রী বা স্বামী দুজনেই এই জীবনের সমান অংশীদার। কারো কোন বিষয়ে যোগ্যতা কম থাকলেও একে অন্যের এই কমতি পুষিয়ে দেয়া। বুঝে নেয়া যে এই জীবনের সকল দায়িত্ব, সকল সফলতা, সকল আনন্দ বেদনায় দুজনের সমান অংশ। এই ধারণা, বুঝা আর তা নিজের জীবনে চেষ্টা করার মধ্যেই সফল সুখী যুগল জীবনের মূল চাবিকাঠি। মানুষ হিসেবে একে অপরকে সন্মান করার এই বিষয়টি আমাদের পাঠ্যসূচীর অন্তর্ভুক্ত করার সময় এসেছে। ভবিষ্যতে হয়তো তাহলে শুধু নারী-পুরুষ নয়, সামাজিক কনফ্লিক্টও অনেকাংশেই কমে আসবে।

জানাতে হবে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে যে, নারী যেমন কারো অধীন বা আজ্ঞাবহ নয়, তেমন পুরুষও নারীকে নিজের কর্তৃত্বপরায়ণতার শিকলে বাঁধতে চাইবে না। দুজনে মিলেই এই পরিবার, সমাজ। কেউ কারো চেয়ে কম বেশী নয়। পারিবারিক বা সামাজিক দায়িত্বপালনে দুজনেরই সমান ভূমিকা রয়েছে। নারী-পুরুষ কেউ কারো দখলে পাওয়া সম্পত্তি নয়, বরং যুগল এই জীবন পরস্পরের সম্পদ।

যেন সত্যি হয় কবিগুরুর সেই কথা সকল নারী-পুরুষের যুগল জীবনে, আমাদের আঁখি হোক মধুসিক্ত, অপাঙ্গ হয় যেন প্রেমে লিপ্ত, হৃদয়ের ব্যবধান হোক মুক্ত, আমাদের মন হোক যোগযুক্ত।

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.