‘মা’

Men wid a childমাসকাওয়াথ আহসান: ‘মা’ শব্দটির আবেদন ধ্রুপদী। মা মানেই একটি ত্যাগী চরিত্র; যাকে এক দেবীর আসনে বসিয়ে আমরা সবাই তাকে ব্যবহার করি। উনি যেন জন্মেছেন কেবল দিতে; এর বিপরীতে কিছু নিতে উনি চান না। আমরা তো অকৃতজ্ঞই। তাই আমরা মা’র কাছে থেকে নেয়ার দল। দেয়ার দলতো নই। বিশেষ করে ছেলেরা। একটি ছেলের পিছে নিজের জীবন দিয়ে দেন মা। আর ছেলে স্ত্রৈণ হয়ে মাদার ইন ল’র সেবা করে।

মেয়েরা এদিক দিয়ে কিছুটা ভালো। মা’র খোঁজ খবর রাখে। অসুখ-বিসুখে পাশে থাকে।।

তারপরেও একসময় বৃদ্ধ মা একা হয়ে যান। সমাজ পশ্চিমের দিকে পড়িমরি করে দৌঁড়াচ্ছে। ফলে অনেক মা এখন বৃদ্ধাশ্রমে। স্ত্রৈণ ছেলে মাকে গাড়ীতে করে নামিয়ে দিয়ে আসে সেই অচেনা বাড়ীতে। তারপর বিরাট সফল ছেলে বৌয়ের সঙ্গে চলে যায় সিস্টার ইন ল’দের বিরাট কোন রেষ্টুরেন্টে খাওয়াতে।

সেদিন এক কথিত ‘পশ’ বৃদ্ধাশ্রমে একজন বৃদ্ধার মৃত্যুর পর খবর পেয়ে তার মেয়ে এসে প্রথম যা করে, মায়ের গয়নার বাক্সটা খোঁজে। নিও এলিট সমাজের ঐ মেয়েটি ফেসবুকে ‘মিসিং ইউ মম’ লিখে স্ট্যাটাস দিলে আরো গয়নার বাক্সরা এসে, ‘রেস্ট ইন পিস’ লিখে দিয়ে যায়।

মোটামুটি এরকম একটি হিপোক্রেসির ক্যানভাসে পালিত হয় ‘মা দিবস’।

তবে সেই ‘বোকা’মা আর এ যুগের চালাক ‘মায়ের’পার্থক্য বিস্তর। মা-মা-ই বলে খেঁকিয়ে ওঠে অনেক প্রশমনবাদী। কিন্তু অযোগ্য মা কোন ‘মা’ নয়। বাচ্চা মানুষ করতে অসক্ষম উত্তরাধুনিক মায়েরা বাচ্চাকে অপরিকল্পিতভাবে বড় করে। ইংলিশ মিডিয়ামে পড়ায়। বাংলা শেখা দরকার নাই; এরকম নির্বোধ মত পোষণ করে।

পশ্চাদপদ নারী সমাজ নব্য ক্ষমতায়নের তোড়ে ধরাকে সরা জ্ঞান করে। টিভি বিজ্ঞাপনের আদলে বাচ্চার খেলাঘর বানায়। বাচ্চাদের পোশাক-আশাকও একি; শর্টস আর টি-শার্ট; অ্যামেরিকান হতে হবে যে। বাচ্চা বসে ঘন্টার পর ঘন্টা ভিডিও গেমস খেলে। মা তখন ডেসপারেট হাউজ ওয়াইফ টিভি সোপ দেখে। আর আরেকদল মা ‘ঘার ঘার কী কাহানী’ দেখা নিয়ে ব্যস্ত। কেউ ব্যস্ত ফেসবুকে। মা হিসেবে স্যাক্রিফাইস বা ত্যাগের যে মিথ তা ‘মা’ দিবসের সারগর্ভ প্রবন্ধের নস্টালজিয়া মাত্র। একবিংশের মায়ের শিশু প্রতিপালন মি, বিনের গাড়ী চালানোর মত ঝুঁকিপূর্ণ ও বিনোদনদায়ী।

এ যুগের মেয়েরা পণ করেছে রান্না শিখবো না। খুব বেশী হলে সিদ্দীকা কবিরের রান্নার বই কিনে কটা জিনিস রেঁধে দেয়া শেখে তারা। তাও ওসব নিরীক্ষামূলক খাবার শিশুদের পক্ষে খাওয়া অসম্ভব। মুখে নিয়ে বসে থাকে। অপাচ্য খাবারের পিণ্ড হাতের মধ্যে নিয়ে বাচ্চার পিছে দৌঁড়ে বেড়ায় কথিত প্লাস্টিকের মা। বাচ্চারা বাধ্য হয়ে ফাস্ট ফুডের দিকে ঝুঁকে পড়ে।

আমাদের প্রজন্মের অনেকে শিক্ষিত-চাকুরীজীবী মায়ের অধীনে বড় হয়েছে। কিন্তু মা অলরাউন্ডার হওয়াতে শিশুর জীবন ছিল সুস্থতার ছন্দে আনন্দময়।

আগে মায়েরা বাচ্চার সঙ্গে অনেক গল্প করতেন। এযুগের মায়ের সেই ধৈর্য্যও নেই। কারণ এরা অলরাউন্ডার নয়। হয় চাকরি-বা রান্না এরকম খেলোয়াড়।

আর বাচ্চা প্রতিপালনের কিছুই না জেনে গুগলসার্চ করে অনেক তথ্য জোগাড় করে বাচ্চাটার উপর সেই নতুন জ্ঞান প্রয়োগ করে। অথচ এইকথিত আধুনিক মা তার নিজের সত্যিকার আধুনিক মা যেভাবে তাকে মানুষ করেছিল, সেটা অনুসরণ করলেই আর গুগল লাগেনা।

তবে এই যে আধুনিক দিকভ্রান্ত অদক্ষ মা, এর জীবনের প্রধান শত্রু তার নিজের মা। দক্ষিণ এশিয়ার মেয়েদের আজকের এই অপভ্রংশ ক্ষমতায়নের কারণ; এদের মায়েরা ‘বিয়ে’র জন্য চাপ সৃষ্টি করে মেয়েদের সম্ভাবনাগুলোকে হত্যা করে। যে মেয়েটি বিজ্ঞানী মাদাম কুরী হবার কথা, তাকে কুড়িতেই বিয়ে দিয়ে বুড়িতে পরিণত করার বুদ্ধিটি আসে তার মায়ের কাছ থেকে।

আর মা দিবসে মা কে শ্রদ্ধা জানানোই চল। এহচ্ছে দিবসের আনুষ্ঠানিকতায় কর্পোরেট ব্রান্ডিং আর মিডিয়ার মা মা করে কাঁদার অপেরা। মাকে ৩৬৫ দিনই ভালবাসে মানুষ। তবে স্ত্রী তা টের পেলে গেম থিওরি খেলে ছেলেকে মা থেকে বিচ্ছিন্ন করতে। একই জিনিস নিজের জীবনে ঘটে তার ছেলের বউ এসে যৌথ পরিবার ভেঙ্গে ছেলেকে আলাদা ‘পশ’ এপার্টমেন্টে চলে যায়। সেখানে মাদার ইন লকে তখন আসতেই হয়, মেয়ের যাবতীয় দুর্বলতা লুকাতে; রান্না-বান্না, হোম মেকিং, বেবী সিটিং।

আজকাল আরেক নতুন গিমিক এসেছে মাকে বিদেশে বেড়াতে নিয়ে যাবার; ছেলে ‘মা এসে পরো’ বলে টিকেট পাঠালে মা খুশীতে ডগমগ হয়ে গিয়ে দেখে, ছেলের বউয়ের বাচ্চা হবে। ‘আয়া’ হিসেবেই আনা হয়েছে তাকে। সারাজীবন হাঁড়ি ঠেলে এসে নিউইয়র্কে ছেলের বাড়ীতেও হাঁড়ি ঠেলতে হয়। ঢেঁকি বেহেশতে গেলেও ধান ভানে।

আর মাদার ইন ল এই মেয়ের বাচ্চা হবার সময়ে থাকতে চাইলে সে-ই যাবার সুযোগ পায় বিদেশ যাবার। ছেলের মা হিটে আউট হয়ে যায়।

আমাদের সমাজে নির্বোধ ও ভুল আচরণগুলোকে জাস্টিফাই করা হয় আবেগের ছেঁড়া কাথার কান্না জড়িয়ে। দশ মাস দশ দিন আমাকে পেটে রেখেছিলেন বলে আমরা ডুকরে কেঁদে উঠি। আজকের মাতো প্রসব বেদনা নিতেও রাজি না। সিজারিয়ান, শর্ট কার্ট টু সাকসেস। বুঝতে পারি বায়েজীদ বোস্তামি বা বিদ্যাসাগরের মায়েদের কাল আর একাল তো এক নয়।

আর আমার প্রশ্ন হচ্ছে, আমি কী চেয়েছিলাম পৃথিবীতে আসতে! একি বসবাস করার মতো পৃথিবী! ফসিল সমাজ ব্যবস্থা, লুন্ঠক রাষ্ট্রব্যবস্থা আর কুপমন্ডুক ছাগল-বানরের জঙ্গলে কে আসতে চায়! দক্ষিণ এশিয়ার কাদাখোঁচা পাখির কুৎসিত সময়ে প্রতিদিন সময় নষ্ট হয় লুন্ঠনের ভাগ-বাটোয়ারার কাইজ্জা শুনে!

এখানে স্কুলে টিচার পড়াতে পারে না, কলেজে প্রাইভেট পড়ানোর নেশায় ক্লাসে অমনোযোগী, ইউনিভার্সিটির শিক্ষক রংধনু রাজনৈতিক প্যানেল আর কনসালটেন্সিতে ব্যস্ত। অফিসে এনালগ তামাদি হয়ে যাওয়া ইগো পালোয়ান বস, তার পোস্ট-ফ্রয়েডিও আচরণ, ফেসবুকে বিনোদনের সময় উদয় হয় ছাগলনাইয়া বা বান্দরবনের বাণী চিরন্তনী ধর্ম ও চেতনা বিবেক।

পৃথিবী এমন কোন আকর্ষণীয় জায়গা না যেখানে এসে কৃতজ্ঞতা লুটোপুটি খেতে হবে।

নিজের পুতুল খেলার দিনগুলোকে মানব পুতুল দিয়ে প্রতিস্থাপনের কথিত ‘মা’ হবার হুইমটা এতো কেন ঘটা করে ‘মা’ দিবস ইভেন্ট করে উদযাপন করতে হবে, বুঝতে পারিনা।

তবুও মা’কে অভিবাদন- এই বিপদ সংকুল জঙ্গলে টিকে থাকার ক্রমাগতঃ লড়াই-এ অকুন্ঠ সাহস জোগানোর জন্য।

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.