আজ আমি অন্য কারো মা

ami maaফারহানা আনন্দময়ী: ভোরে ঘুম ভেঙেই প্রতিদিনের অভ্যাসমত বারান্দায় গিয়ে নিম গাছটি ছুঁয়ে দাঁড়ালাম, গ্রিলের ফাঁক গলে হাত বাড়ালেই তাকে ছুঁতে পারি। শুভসকাল জানানোর জন্য ডালে বসা যে কোনও একটা চড়ুঁইকে খুঁজে নিই, ভোরের ভাজে রোদ্দুর খুঁজে নিই যেমন।

তিনতলা থেকে চোখ পড়লো নীচের আঙিনায়, নীচেরতলায় থাকেন আমার শ্বাশুড়ি…মাস চারেক আগে আব্বু চলে যাওয়ার পরে উনি একাই থাকেন সেখানে। ব্যক্তিস্বাতন্ত্রে বিশ্বাসী নারী তিনি… ছেলে, ছেলের বউ, মেয়ে সকলকেই পূর্ণ স্বাধীনতা দিয়েছেন যার যার নিজের মত ক’রে থাকার জন্য। কেন জানি মনে হয়, কোন এক অজানা কারণে আম্মু একা থাকতেই ভালবাসেন। কাউকে বিরক্ত করতে বা বিরক্ত হতে পছন্দ করেননা।

কোথা থেকে কোথায় চলে এলাম। যে কথাটি বলার জন্য কলম ধরা, সেটাই বলা হলোনা।
নীচে তাকিয়ে দেখলাম, ১০/১১ বছরের একটি মিষ্টিমুখের ছেলে আঙিনা ঝাড়ু দিচ্ছে। আম্মুর একাধিক সাহায্যকারী কাজের মানুষের দলে নতুন সংযোজন এই ছেলেটি। দেখলাম আদির একটি বেন-টেন গেঞ্জি গায়ে পরে ছেলেটি আঙিনাভরা ঝরা নিমপাতা ঝাড়ু দিয়ে পরিস্কার করছে।
অনেকক্ষণ তাকিয়ে থাকলাম, তাকিয়ে থাকতে থাকতে যেন ছেলেটির অবয়বে আদিকেই দেখতে পাচ্ছিলাম। বুকের ভেতরটা কেমন খামচে ধরলো।

একই বয়সের দুটো ছেলে… হয়তো অপুষ্টির কারণে আদির চেয়ে একটু ছোটই দেখায়। অথচ অবস্থানে কত ফারাক। একজন পরম নিশ্চিন্তে ঘুমায়… ঘুম ভেঙে স্কুলে যাবার জন্য তৈরী হচ্ছে। নইলে ছুটির দিন হলে ঘুম ভেঙে আইপ্যাডে গেইম খেলে বা ই-বুক পড়ছে। আর অন্য ছেলেটি তারই পুরনো গেঞ্জিটা গায়ে দিয়ে সকালের বাসি আঙিনা জঞ্জালমুক্ত করছে।

দৃশ্যটা অপরাধবোধে বিষ ঢালতে লাগলো ক্রমাগত। বিবেককে চাবকাতে লাগলো এই প্রকট সামাজিক বৈষম্য… বিকটাকার এই বৈষম্য এমনই এক শেকল, যা কিছুতেই ভাঙতে পারিনা… কিছুতেই ডিঙাতে পারিনা…একা তো নয়ই।

আমার স্বামীকে বললাম, আম্মুকে বলো ছেলেটাকে কাছাকাছি কোনো স্কুলে ভর্তি করিয়ে দিক। স্কুল থেকে ফিরে না হয় বাকি কাজ করবে। স্কুলের খরচ আমরা দেবো। ওর উত্তরে যা বুঝার বুঝে নিলাম, বুঝতে পারলাম অনেকের কাছেই এটা আদিখ্যেতা মনে হবে। আমার কষ্টটা কষ্টের জায়গায়ই থাকলো, মায়াটা বাড়তেই থাকলো ছেলেটার জন্য।

আজ রাতে আমাদের ঘরে আমার শ্বাশুড়ির খাওয়ার কথা রয়েছে। হয়তো মা দিবসও পালন করবো একটি কেক কেটে। ভেবেছি আম্মুকে বলবো, ছেলেটিকেও যেন অবশ্যই সঙ্গে করে নিয়ে আসে।
ছেলেটি হয়তো জানবে না, কিন্তু আজ আমি সারাদিন আমার সবটুকু মমতা নীরবে ওকেই দিয়ে যাবো।
বছরের ৩৬৪ দিন তো অধরা আদিই পায়, আজ না হয় নাই পেলো। ওরা এতো পায়, যে একদিন না পেলে কোথাও এতোটুকু কম পড়বে না ওদের।

আজ আমি অন্য মা,
আজ আমি অন্য কারো মা।

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.