সোভিয়েত নারীর দেশে-৬

সুপ্রীতি ধর: ১৯৮৬ থেকে ২০১৪, মাঝে প্রায় ২৮টি বছর। এতোকাল পর স্মৃতিকথা লিখতে বসে নিজেই হারিয়ে যাচ্ছি। কত কথা মনে নেই, কত কথা মনে পড়ছে, আবার অনেক কথা নিজে থেকেই মনে করতে চাইছি না, কী ভীষণ ধন্দ নিজের সাথেই নিজের। বড্ড বেশি নস্টালজিক হয়ে পড়ছি।

মনে হচ্ছে এই তো সেদিনের কথা। এখনও নাকে লেগে আছে টাটকা কফির ঘ্রাণ, দূর থেকে প্রায় উড়ে চলে যেতাম ক্লাশ শেষে কফির নেশায়।

না, বিস্মৃত হলে চলবে না। অবশেষে মাইক্রো আকৃতির গাড়িটি এসে থামলো একটা টিলার ওপরে। দূর থেকেই দশাসই চেহারার লোকটি আমাকে দেখিয়েছিলেন হোস্টেল, উনার ইংরেজি ভাঙা হলেও বোঝা যায়। অন্তত হোস্টেল শব্দটি শুনে না বোঝার কথা না। টিলার গায়ে হোস্টেলটি দেখে মনটা ভরে গেল। কিন্তু কাছে এসে দেখি পুরনো হোস্টেল। চার তলার দুটো রুমে নিয়ে যাওয়া হলো আমাদের দুজনকে, আগে থেকেই চাবি রেডি ছিল। রুমে ঢুকিয়ে লোক দুটো বললেন, কাছেই ক্যান্টিন (স্তালোভায়া) আছে, সেখানে খাবার আছে। গিয়ে খেতে হবে।

রুম পেলাম, ভারতীয় রুমমেটও পেলাম। ওর নাম জ্যোতি পি বালান, কেরালার মেয়ে। একেবারে সাক্ষাত শ্রীদেবী যেন দাঁড়িয়ে আমার সামনে। চোস্ত ইংরেজিতে কথা বলে, তবে উচ্চারণে ‘শ’ এর প্রাধান্য। ওকে পেয়ে আমি যেন হাতে চাঁদ পাই, অন্তত গায়ের রং তো আমাদের এক। এদিকে নাসির পড়ে গেছে একা। তবে ওর ভাগ্য ভাল যে, ওর রুমটা ঠিক আমার রুমের উল্টোদিকেই।

হঠাৎই যেন সব কোলাহল থেমে গেল। দুদিন মস্কোতে ছিলাম, তিনদিন ধরে ট্রেন জার্নি, বেশ একটা থ্রিল ছিল পুরো ব্যাপারটাতেই। কোথাও যাচ্ছি, অথচ জানছি না কোথায় যাচ্ছি। আর আজ যখন পৌঁছালাম, তখন জানা হয়ে গেল এটাই আমার আপাত গন্তব্য। হোস্টেলটা পুরনো দেখে মনটা দমে গেল, ওয়াশরুমে গিয়ে বুঝলাম আমার সহৃদয় রুমমেট খুব একটা পরিস্কার নন। জীবনভর শুচিবাই আমি, বাসার কথা মনে পড়ে গেল আবার। বেশ আয়োজন করেই এবার কাঁদতে বসলাম। পেটে খিদে, কান্নাও গতি পেল।

এমন সময়ই ঠক ঠক, দরজায় কারও নক করার শব্দ। আমার তো উঠার প্রশ্নই উঠে না, এই চরম বিদেশে আমার জন্য কেউ কোথাও অপেক্ষা করে নেই। জ্যোতিই উঠে দরজা খুলে দিল। রুমে এলো একটি ছেলে। নাসির তার পিছনে। এসেই পুরোদস্তুর বাংলায় কথা বলা শুরু করলো। নাম জানালো আহসান। যে দুজন বাংলাদেশি এই শহরে থাকে, তাদের একজন আহসান। সে কথা বলছে ঠিকই, কিন্তু তার চোখ যেন স্বাভাবিক না, এটা আমার দৃষ্টি এড়ায় না। এসেই বলতে লাগলো, এই দেশ একটা জঘন্য দেশ, এখানে মানুষ থাকে না, পারলে সে এখনই চলে যায়, কিন্তু তাকে যেতে দিচ্ছে না কেউ। আমি ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেলাম। বলে কী লোকটা? আর নাসিরের বাঙালী পাওয়ার উৎসাহে যেন কেউ ঠাণ্ডা জল ছিটিয়ে দিয়ে গেল। যাই হোক। আহসান ভাই থামলেন কিছুক্ষণ পর। বললেন, দূরে একটা জায়গায় থাকে মাহবুব নামের আরেকজন, তারই ক্লাসমেট, সেখানে যেতে হবে আমাদের।

তৈরিই ছিলাম, স্নান করার আশায় কিছু কাপড়চোপড় নিয়ে নিলাম সাথে। মস্কোতে দুদিন থেকে দেশীয় জড়তা অনেকখানিই কেটে গিয়েছিল। তাই অচেনা-অপরিচিত কারো হোস্টেলে গিয়ে স্নান করবো, এটা ভাবতে কোথাও অসুবিধা ঠেকেনি। টিলা বেয়ে উপরে উঠে বাস স্টপেজ। আমরাই প্রথম যাত্রী। বেশিক্ষণ লাগলো না জাইতুন নামের একটি জায়গায় পৌঁছাতে, সেখানে সারি সারি হোস্টেল। আহসান ভাই বলছিলেন, এগুলো পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের হোস্টেল। সিঁড়ি বেয়ে আবারও টিলা থেকে নেমে এলাম একটা হোস্টেলের সামনে। মাহবুব ভাই, আমার স্পষ্ট মনে আছে, লাল টি শার্ট পরা একজন ছিপছিপে চেহারার ছেলে দৌড়ে নেমে এসেছিল হোস্টেল থেকে। এসেই হাত বাড়িয়ে দিল আমাদের দিকে।

তার প্রথম কথাই ছিল, অনেকদিন পর এই শহরে কোনো বাঙালী এলো, এবার বাংলায় কথা বলা যাবে। ক্ষমা চেয়ে নিল স্টেশনে যেতে পারেনি বলে। রুমে ফিরতে ফিরতে জিজ্ঞাসা করলো, খিদে পেয়েছে কিনা! হ্যাঁ বলতেই মুখটা কাঁচুমাচু করে বললো, তিন বছর হলো দেশছাড়া, মশলাপাতি নেই, মস্কো থেকেও কেউ আসে না যে মশলা নিয়ে আসবে। আশ্বাস দেই, আমি নিয়ে এসেছি। মা আমার বড় বড় পোটলা বানিয়ে মশলা দিয়ে দিয়েছে, মেয়ে তার রান্নার জাহাজ, রান্না করে খাবে বিদেশে।

নদীর মাছ, কোনরকম মশলার ছোঁয়া পর্যন্ত নেই, শুধু শসা আর আস্ত ধনে দিয়ে রান্না, সেইসাথে ভাত। অপূর্ব সেই স্বাদ, এখনও মুখে লেগে আছে। অনেক ভাত খেয়েছিলাম আমি আর নাসির। তাকিয়ে দেখি, মাহবুব ভাই তাকিয়ে আছে আমার দিকে। কিছুটা লজ্জা পেয়ে যাই নিজের এমন হাভাতে আচরণে। সে বললো, খুব খিদে পেয়েছিল বুঝি? গলায় তার স্নেহের, না ভালবাসার সুর, ঠিক বুঝলাম না, তবে প্রশ্রয় ছিল অনেক।

খাবার শেষ হলে স্নানের কথা পাড়ি। নাসিরকে রুমে রেখে আমাকে নিয়ে গেল হোস্টেল থেকে খানিকটা দূরে । সেখানে  সারি সারি স্নানঘর। ভিতরে অনেক নারীর উচ্চকণ্ঠ, হাসির লহড়া। তবে ভিনদেশি ভাষায় কী কথায় এতো সুখ, বুঝতে পারছিলাম না। তাদের সাথে বেশকিছু ছোট ছোট মেয়েশিশুও আছে। স্নানঘরে ঢুকে আমি আমার ‘দুজোড়া এশিয়ান চোখ’ নিয়ে বিপদেই পড়ে গেলাম। চারদিকে এতো এতো ফর্সা রংয়ের সমাহার, গায়ে কাপড় পর্যন্ত নেই! বয়সও কোন ‘ফ্যাক্টর’ না এখানে, এটাই বুঝলাম। কোনরকম চোখ বন্ধ করে গায়ে জামা জড়িয়ে কয়েক শ কৌতূহলি চোখের দৃষ্টি এড়িয়ে স্নান করে বেরিয়ে এলাম। নতুন জীবনের অভিজ্ঞতার শুরু হলো তখন থেকেই। (চলবে)

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.