আমরা যারা একলা থাকি- ২০

imp 1উইমেন চ্যাপ্টার: একলা থাকি’র ১৯তম পর্বে একটু খানি সূত্রপাত করেছিলাম অনেকদিন একলা থাকা নারী যখন আবার নুতন করে সাথী খোঁজেন বা যুগ্ম জীবন শুরু করতে চান কি কি মানসিক দ্বিধা তাঁর মনে কাজ করে। এরমধ্যে উল্লেখ্য ছিল নারীর ব্যক্তি স্বাতন্ত্র্য বোধের বিষয়টি। অনেক ধরনের প্রতিক্রিয়া পাওয়া গেছে, নারী পুরুষ উভয় ধরনের পাঠকই প্রতিক্রিয়া দিয়েছেন, অনেকে মূল লেখার নিচে, কেউ কেউ ফেসবুক শেয়ারে আর বেশীরভাগ ইনবক্সে।

মজার ব্যাপার হল নারী পুরুষের প্রতিক্রিয়া ভিন্ন ভিন্ন ধরনের। প্রতিক্রিয়াগুলি পড়তে পড়তে একটা জিনিশ পরিষ্কার হয়ে ওঠে যে নারী আর পুরুষের কাছে ‘ব্যক্তি স্বাধীনতা’ শব্দটি পুরোপুরি ভিন্ন অর্থ বহন করে। প্রতিক্রিয়া দিয়েছেন এমন নারীদের সবাই বলেছেন, ‘ব্যক্তি স্বাধীনতা’ মানে আত্মসন্মানবোধ বিসর্জন না দিয়ে নিজের সিদ্ধান্ত নিতে পারা, নতজানু হয়ে না থাকা, পারিবারিক-অর্থনৈতিক যে কোন বিষয়ে সিদ্ধান্তের অধিকার। নিজের আয়ের উপরে নিয়ন্ত্রণ থাকা ইত্যাদি। নারীর প্রফেশনাল ক্যারিয়ারকে সমান মর্যাদার দৃষ্টিতে দেখতে হবে।

অপরদিকে পুরুষ পাঠকদের বেশীরভাগ (সবাই নন) মতামত দিয়েছেন যে যুগ্ম জীবনে সুখী হতে হলে নারীর ‘কর্তৃত্বপরায়ণতা’ ( ইংরেজিতে dominating শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে) ছাড়তে হবে। ব্যক্তিস্বাধীনতার নামে নিজের (পড়ুন নারীর ইচ্ছে) ইচ্ছেকে প্রাধ্যান্য দিলে সেখানে সংঘাত আসবেই। কেউ কেউ বলেছেন, যুগ্ম জীবনকে আনন্দময় করতে হলে নারীর ব্যক্তি স্বাধীনতার নামে ‘absolute freedom’ এর চিন্তা ছাড়তে হবে। পুরুষের মন্তব্যে এই absolute freedom কথাটির গূঢ়ার্থ ‘স্বেচ্ছাচারিতার’ প্রতিশব্দ বলেই মনে হল আমার কাছে।

পুরুষদের কেউ বলেছেন, যৌথজীবনের মূলমন্ত্র নির্ভরশীলতা, এখানে পুরুষের উপরে নারীর নির্ভরশীলতার কথাই বুঝাতে চেয়েছেন সেই পাঠক। একজন আরও একধাপ এগিয়ে গিয়ে বলেছেন, দ্বিতীয়বার যৌথজীবনে প্রবেশের আগে নারীটিকে ‘কম্প্রোমাইজ’ করতে হবে তার ব্যাক্তি স্বাধীনতা, এই ‘কম্প্রোমাইজ’ শব্দটি আমার কাছে ‘স্যাক্রিফাইস’ বলে প্রতীয়মান হল। একজন জানালেন, দ্বিতীয়বারের মতন শুরু করতে গেলে আগে যুগ্ম জীবনের আবশ্যকীয় বা রিকয়ারমেনটস নারীটির জেনে নেয়া কর্তব্য বলে মন্তব্য করেছেন। কোন পুরুষ পাঠকই মানুষ হিসাবে নারীর আত্মসন্মানবোধ বা নারীর অর্থনৈতিক এবং সিদ্ধান্তগ্রহণের স্বাধীনতার কথাটা উল্লেখ করেন নাই।

মন্তব্যদানকারী সকল নারী পাঠক বলেছেন, পারস্পারিক শ্রদ্ধাবোধের কথা, বলেছেন পারস্পারিক বিশ্বাস আর ছাড় দেয়ার কথা। এসব কথা মাত্র একজন পুরুষ পাঠক বলেছেন। নারীরা সামাজিক দায়িত্ব পালন বা সন্তানের দায়িত্ব পালন, গৃহকর্মে সহযোগিতা এসবের কথাও বলেছেন। পুরুষের মন্তব্যে এসবের কোন উল্লেখ নাই। এই প্রতিক্রিয়াতে এটা পরিষ্কার যে, এই ২০১৪ সালেও আমাদের এই পুরুষতান্ত্রিক সামাজিক এবং মানসিক পরিমণ্ডল নারী-পুরুষের যুগ্মজীবনকে সফল করার পুরো দায়িত্ব নারীর উপরে চাপাতে চায়। এখনো নারীর ব্যক্তি স্বাতন্ত্র্যকে আখ্যায়িত করতে চায় স্বেচ্ছাচারিতা হিসেবে।আরও আছে, বেশ কয়েকজন পুরুষ বলেছেন, নারী একবার একা থাকতে অভ্যস্ত হয়ে গেলে সে আর সংসারী হতে পারে না। একলা থাকা নারী আর কারো ‘অধীনে’ থাকতে চায় না। কিন্তু একলা থাকা পুরুষের দ্বিতীয় যৌথ জীবনের বিষয়ে এসব প্রতিবন্ধকতার কথা আসে নাই। ছোট্ট এই লেখাটি আর এই বিপুল সংখ্যক প্রতিক্রিয়া আমাদের আবারো মনে করিয়ে দেয়, নারী, বাংলাদেশের নারী, তুমি এখনো পুরোপুরি মানুষ হয়ে উঠো নাই। এখনো নারীর রিপ্রডাকটিভ প্যাসিভ ভূমিকাটিও সাংসারিক সুখের মূল হিসাবে গণ্য করা হয়।

বলা হয়, সুখী হতে হলে নারীকে পুরুষের উপরে নির্ভর করতে হবে। কিন্তু নারীর উপরে পুরুষের নির্ভরশীলতার কথা আমাদের মাথায় আসে না। এই নির্ভরশীলতা বলতে মূলত অর্থনৈতিক এবং সিদ্ধান্তগ্রহণের নির্ভরশীলতা। এই নির্ভরশীলতা মানসিক বা সহযোগিতা মূলক নির্ভরতা নয়। এই নির্ভরশীলতা মুখাপেক্ষি থাকার কথা বলে। একটা কথা আরও স্পষ্ট হলো, আসলে যতদিন আমাদের মানসিকতা থেকে নারীকে গ্রহীতা বা আদেশ-উপদেশ পালনকারীর ভূমিকা থেকে সরিয়ে মানুষের মর্যাদা না দিতে পারবো, ততদিন নারী পুরুষের সমান অধিকারের বিষয়টিও অধরা রয়ে যাবে। নারীর আত্মসন্মান বোধের জায়গা থেকে নারীকে দেখতে না পারলে, অনেক অনেক যৌথ জীবন সফল হয়তো হবে সময়ের হিসাবে, কিন্তু সত্যিকার অর্থে যুগ্মজীবন হয়ে উঠবে কিনা সন্দেহ হয় আমার!

আমাদের গল্পের মতন অনেক শাহানা বা অহনা একাকীই হয়তো পাড়ি দিবে জীবনের বাকী সময়- একা কিন্তু স্বতন্ত্র আত্মসন্মানবোধে গরীয়ান একজন মানুষ হয়েই। মনে ভেসে যায় চিত্রাঙ্গদার উক্তি,’ নহি দেবী , নহি সামান্যা নারী। পূজা করি মোরে রাখিবে ঊর্ধ্বে সে নহি নহি , হেলা করি মোরে রাখিবে পিছে সে নহি নহি। যদি পার্শ্বে রাখ মোরে সংকটে সম্পদে, সম্মতি দাও যদি কঠিন ব্রতে সহায় হতে, পাবে তবে তুমি চিনিতে মোরে।‘ (চলবে)

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.