মানুষ যখন জাগে, এমন করেই জাগে

 

Women Chapter‘পরিবর্তনে নারী, সিদ্ধান্তে সমান অংশীদার’-এই স্লোগান নিয়ে গতবছর মে মাসের ২০ তারিখ থেকে হাঁটি হাঁটি পা পা করে যাত্রা শুরু করেছিল বাংলা ভাষায় নারী ইস্যুভিত্তিক অনলাইন পোর্টাল ‘উইমেন চ্যাপ্টার’। কেউ জিজ্ঞাসা করলে আমি বলি, এটা শুধুই পোর্টাল নয়, এটা একটা আন্দোলন। আমাদের চারপাশে ঘটে যাওয়া ঘটনা-দুর্ঘটনা, আমাদের জীবনযাপন, প্রথা, ধর্ম আর এসবকিছুতে নারীর অবস্থানই হচ্ছে উইমেন চ্যাপ্টার। এরই মধ্যে পোর্টালটি আলোচনায় এসেছে বেশ কয়েকবার, আর এখন পেল ডয়চে ভেলের সেরা অনলাইন অ্যাক্টিভিজম অ্যাওয়ার্ড দ্য বব্স-এর গ্লোবাল মিডিয়া ফোরাম অ্যাওয়ার্ড ক্যাটাগরিতে ‘পিপলস চয়েস’ অ্যাওয়ার্ড।

ববস প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণটাও ছিল কাকতালীয়। একদিন ডয়চে ভেলে থেকে এক ছোট ভাই ইনবক্সে জানতে চাইলো উইমেন চ্যাপ্টারের উদ্দেশ্য কী। এটা কেন করা হয়েছে! আমি তাকে জানাই। তারপর আরও পরে একদিন বিকেলে সে আমাকে একটা লিংক দিয়ে বললো, নিন, এবার শুরু হলো প্রতিযোগিতা। আগামাথা কিছুই বুঝিনি। একটু একটু করে একে বলি, ওকে বলি, কি করা যায় পরামর্শ নেই। নিজেও ভোট দেই না, কাউকে বলিও না। কিন্তু শেয়ার দেই লিংকটা। কিছুদিন পর দেখি, প্রতিযোগিতায় উইমেন চ্যাপ্টারের অবস্থান দ্বিতীয়। কয়দিন পর দেখি তৃতীয়। পর্তুগিজ একটা সাইট ঠেলেঠুলে ওপরে চলে এসেছে। আর বরাবরের মতোই ইউক্রেনের একটা সাইট প্রথম হয়ে আছে। এবং ব্যবধানও বেশ অনেক। লোকজনকে তখন বলা শুরু করেছি, বিভিন্ন গ্রুপে লিংক শেয়ার করছি। কিন্তু খুব একটা কাজে আসছে বলে মনে হচ্ছে না। অত:পর সবাইকে ব্যক্তিগতভাবে নক করা শুরু করি আমি। কেউ কেউ সাড়া দেয়, কেউ দেয় না। কেউ দেখেও না দেখার ভাণ করে। একে-ওকে ধরে অনলাইনের সেলিব্রিটিদের অনুরোধ করি। কাজ হয় তো, হয় না। তবে অধিকাংশই সময় দিয়েছেন, শেয়ার করেছেন, ভোটের জন্য অনুরোধ করেছেন। কিন্তু তার পরও হচ্ছিল না। ইউক্রেনের সাথে ব্যবধান কেবলই বাড়ছিল।

এক পর্যায়ে মনে হচ্ছিল, আর পারা যাবে না। ছোট বোন, সতীর্থ, ভোরের কাগজ এর আঙ্গুর নাহার মন্টি, বন্ধু লীনা হক আর ভিকারুননিসা কলেজের শিক্ষক ফেরদৌসী বেগম সারাহ আপা, লন্ডনের তুষার সরকার, পুনেতে পড়াশোনা করা শুচিস্মিতা সীমন্তি – সবার ঐকান্তিক চেষ্টাতেও শেষরক্ষা হচ্ছিল না। নামকরা সব ব্লগার আরিফ জেবতিক, অমি রহমান পিয়াল, আসিফ মহিউদ্দিন, সিডাটিভ হিপনোটিক্স, ফড়িং ক্যামেলিয়া, সুব্রত শুভ, কে দেয়নি শেয়ার! কিন্তু ভোট বাড়ছিল শম্বুকগতিতে, আর হৃদপিণ্ডের উঠানামা হচ্ছিল দ্রুতগতিতে।

এমন সময়ই মনে হয় বন্ধু, সতীর্থ মাসকাওয়াথ আহসানের কথা।  ২ মে বিকেলে তাকে ধরি ইনবক্সে। উনি সিরিয়াসলি নেন বিষয়টা, বলেন যে, কোন চিন্তা নেই। যা করার উনিই করবেন। বললেই কী আর চিন্তামুক্ত হওয়া যায়?

এরপর থেকেই শুরু হয় নানা কসরতের প্রচারণা। জীবনেও দেখি নাই এসব। এক পর্যায়ে মনে হচ্ছিল, এই প্রচারণা আবার নেগেটিভ প্রভাব না ফেলে আবার! কিন্তু প্রচারণা তখন তুঙ্গে, ফেরার আর পথ নেই। লড়াইয়ের মাঠে নেমে হয় জয়, না হয় পরাজয় নিয়েই ঘরে ফিরতে হবে। নিরপেক্ষ-সুশীল হয়ে থাকার জো নেই। চারদিক থেকে তখন সবাই কোমর বেঁধে নামলো। শাহবাগ আন্দোলনের সময় অনেকগুলো ছোটবড় বন্ধু পেয়েছিলাম। তারা পাশে এসে দাঁড়ালো। কানিজ আকলিমা সুলতানা, অনিমেষ রহমান, সুমিত সাহা, সৈকত কুল, লোপা, তৃষ্ণা-এদের নাম না বললেই নয়।  সবাই যার যার জায়গা থেকে কাজ করেছে নিরলসভাবে। ফেরদৌসী বেগম সারাহ আপা একপর্যায়ে মরীয়া হয়ে তাঁর ছাত্রীদের ট্যাগ করতে শুরু করেন। তাঁর কথা হলো, কখনও ছাত্রীদের কাছে কিছু চাওয়া হয় না। এটাই সুযোগ। আর ছাত্রীরাও তাঁকে নিরাশ করেনি। অনেকে এখন ব্যক্তিজীবনে ব্যস্ত হয়েও কথা রেখেছে প্রিয় শিক্ষকের। ধন্যবাদ সেইসব অদেখা ছাত্রীদের।

নিয়ম অনুযায়ী ৭ মে শেষ হওয়ার কথা ছিল ভোটদান প্রক্রিয়া। কিন্তু সঠিক সময়টা নিয়ে বিভ্রান্তি ছিল। কেউ বলছিল রাত ১২টা, কেউ বলছিল জার্মানির সময়। তবে মূল ভোটযুদ্ধ শুরু হয়েছিল ৬ তারিখ বিকাল থেকে। ইউক্রেনের সাথে নয়শ ভোটের ব্যবধান কিভাবে কমে আসছিল তা দেখা ছিল এক অনন্য অভিজ্ঞতা। ৬ তারিখ পার হয়ে সাত তারিখ দিবাগত রাতে মনে হচ্ছিল অনলাইন যোদ্ধাদের কেউ ঘুমায়নি। ভোট পড়ছে, আর সবাই নেচে উঠছে আনন্দে। বিষয়টা গড়াতে গড়াতে এমন একটি পর্যায়ে গিয়ে পৌঁছালো যখন ‘উইমেন চ্যাপ্টার’ আর কোন ব্যক্তিবিশেষের রইলো না, সীমা ছাড়িয়ে গিয়ে পুরো বাংলাদেশের, বাংলা ভাষাভাষীর লড়াইয়ের প্রতীক হয়ে দাঁড়ালো। মূল লড়াইটা হয়ে গেল বাংলাদেশ বনাম ইউক্রেনের মধ্যে। বন্ধু জান্নাতুল মাওয়া সেই শুরু থেকেই বকাবকি করে আসছিল প্রচারণার ভাটা দেখে, এবার সেও নড়েচড়ে বসলো। তৃষ্ণা ৭ তারিখ সকালে দৌড়ে গেল ছোট বোনের অফিসে। সবাইকে দিয়ে ভোট দেওয়ালো। বন্ধু লীনা তার অফিসের সবাইকে বাধ্য করলো ভোট দিতে। আমেরিকায় ছেলেকে ফোন করে ভোট দিতে বললো। তুষার সরকার লন্ডনে বসে অস্থির হয়ে উঠলো। একে-ওকে ফোন করে পিসির সামনে বসালো, নিয়ম বোঝাতে বোঝাতে কত টাকার বিল তুলেছেন ফোনে, নাইবা জিজ্ঞাসা করলাম।

এদিকে উইমেন চ্যাপ্টার যখন একটু একটু করে ব্যবধান কমিয়ে আনছিল ইউক্রেনের পোর্টালটির সাথে, প্রথমে ইউক্রেন সাড়া দেয়নি। কিন্তু ৬ তারিখ বিকেল থেকে শুরু হলো তাদের তৎপরতা। সমানে পাল্লা দিয়ে ভোট পড়তে লাগলো দুপক্ষেই। ৭ তারিখ সকাল সাড়ে ১১টার দিকে সম্ভবত উইমেন চ্যাপ্টার ক্রস করলো ইউক্রেনটা। উত্তেজনায় তখন অস্থির সব যোদ্ধারা। কিন্তু নির্দেশ আসতে লাগলো, ব্যবধান বাড়াতে হবে, বিকল্প নেই। এমন সময়ই হঠাৎ মন যখন কিছুটা হলেও প্রশমিত, তখনই শুরু হয় মূল লড়াই। ইউক্রেন আবার এগিয়ে যায় ৫৬ ভোটে। ব্যবধান বাড়ছে, হৃদপিণ্ডের গতি বেড়ে চলেছে, নি:শ্বাস পড়ছে ঘন ঘন।

তখনই জানা যায়, হাতে আছে মাত্র দুই ঘন্টা ভোট দেয়ার জন্য। মূহূর্তেই সব উল্টে-পাল্টে যায়। কয়েক সেকেন্ড, মাত্র কয়েক সেকেন্ড দম নিয়ে পুরো অনলাইন পরিবার তখন ঝাঁপিয়ে পড়ে ‘উইমেন চ্যাপ্টার’ এর মধ্য দিয়ে দেশকে জিতিয়ে আনার অভিপ্রায়ে। চোখের সামনে তখন ইউক্রেন আর বাংলাদেশের পতাকা পত পত করে উড়ছে। শেষ লড়াইয়ে কোন পতাকা উড়বে, এক মরণ নেশায় পেয়ে বসে সবাইকে। দেশের প্রশ্নে এই প্রজন্ম যে একেবারেই লাগামহীন, আপোসহীন, তারই প্রমাণ দিল আরেকবার। একেকটা মূহূর্তকে তখন এক যুগ বলে মনে হচ্ছিল। লড়াইটা তখন আর শুধু দেশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। সীমানা ছাড়িয়ে ছড়িয়ে পড়েছিল পুরো বিশ্বে বাংলা ভাষাভাষীদের মধ্যে। যে করেই হোক জিতিয়ে আনতেই হবে বাংলাদেশকে এই প্রতিযোগিতায়। সে যে কী অনুভূতি, যে না গেছে এই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে, শেষমূহূর্তের এই লড়াই যারা দেখেননি, বড়বেশি মিস করেছেন জীবনে।

এটা অনেকটাই ভারত-পাকিস্তান ক্রিকেট ওয়ান ডে ম্যাচের মতোন ছিল। শেষ বল পর্যন্ত কী হবে কেউ জানে না। এটা শুধুমাত্র একটা প্রতিযোগিতা ছিল না, যেখানে ভোটের হিসাব-নিকাশ হয়েছে। এটা ছিল মানুষের ভালবাসা প্রকাশেরও একটা মোক্ষম সময়। কতগুলো মানুষ, না দেখা- না চেনা, অথচ এক হয়ে গেল মূহূর্তেই। জিতিয়ে নিয়ে আসলো জীবনেও হয়তো নাম শোনে নাই, সেই উইমেন চ্যাপ্টারকে। আসলে জিতিয়েছে বাংলাদেশকে। জিতেছে বাঙালীর ঐক্য। ফলাফলের পর বন্ধুবর মাসকাওয়াথ বলছিলেন, মানুষের ওপর থেকে তার আস্থা হারিয়ে গিয়েছিল। কিন্তু এই ভোটকে কেন্দ্র করে আবার সবার যূথবদ্ধতা দেখে সত্যিই সে আপ্লুত। বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে যে ভালবাসা এখনও আছে, তারই প্রমাণ মিলেছে এই কর্মযজ্ঞে।

তাই আজ এমন একটা জয়ের পর ধন্যবাদ আসলে জানাতে হয় বিপুল অনলাইন বাহিনীকেই। দেশের সম্মান রক্ষায় অবিচল, অগ্রগামী হবে সর্বদাই, এমনটাই আশা করি সবাই। জয় হোক তারুণ্যের, জয় হোক তাদের দেশপ্রেমের।

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.