“তোমার সঙ্গে প্রাণের খেলা”

Rabi Tagoreপ্রভাতী দাস: ঘড়ির কাঁটা বিশ পেরুনো এক সকালে সাইকিয়াট্রি ওয়ার্ড বসে স্কিজোফ্রেনিয়ার পাঠ শিখেছিলাম। একে একে ডিল্যুশন, হ্যালুসিনেশন, ক্যাটাটোনিয়া পার হোয়ে এলেও নিওলজিজম এবং ম্যাজিক্যাল থিঙ্কিং এ এসে কেমন জানি আটকা পড়ে গিয়েছিলাম। ডি এস এম ফোর ঘাঁটাঘাঁটি করে উত্তর খোঁজার ধৈর্য আমার কোন কালেই ছিলনা। রুমে ফিরে টেবিলে পড়ে থাকা সঞ্চয়িতা খুলেছিলাম বরং। বুড়ো ঠাকুর যখন বললেন, “আমারই চেতনার রঙে পান্না হল সবুজ , চুনি উঠল রাঙা হয়ে ।

আমি চোখ মেললুম আকাশে, জ্বলে উঠল আলো পূবে-পশ্চিমে । গোলাপের দিকে চেয়ে বললুম ‘সুন্দর’ , সুন্দর হল সে ” ম্যাজিক্যালি বুঝে নিলেম, ও এই তাহলে ব্যাপারটা। সে রাত ফাগুনের, কি পৌষের ছিলো কিছু এসে যায়নি, বুকের নীচে বালিশ চাপা দিয়ে নীল পাতায় একটা চিঠি লিখেছিলাম পঁচিশে বৈশাখের ঠিকানায়। এবং দুই একটি অতি পুরাতন শব্দের নতুন অর্থ আবিষ্কার করেছিলাম; যেমন প্রণয় এবং প্রণয়ী, জীবন এবং প্রতীক্ষা, মুক্তি এবং শৃঙ্খল। কবির হৃদয় উপহার নিয়ে সে চিঠির জবাব এসেছে আশাতীত সময়ের ব্যবধানে। এরপর মাঘে, আষাঢ়ে, জ্যৈষ্ঠে, আশ্বিনে চিঠির আনাগোনা ডাক হরকরার তর্জন-গর্জন আর ভর্ৎসনা উপেক্ষা করে। একেক বার একেক সম্বোধনে, সেঁজুতি, শ্যামলী, চিত্রা, মানসী, পূরবী, নদী, পলাতকা এবং আরো অনেক অনেক। প্রতিবার নীল খাতা টেনে নিলেই রুমমেটদের তীব্র বিদ্রুপভরা ভ্রুকুটি; তুই পুরোই ডিল্যুশনাল।

মৃদু হেসে জানতে চেয়েছি, সখি, ভালোবাসা কি সে? হ্যাল্যুসিনেশন, ডিল্যুশন, নিওলজিজম আর ম্যাজিক্যাল থিঙ্কিং ছাড়া। থোরাজিন আর হ্যালডলের বোতলে নিরাময় জোটেনি, আমি অনন্ত ডুবে গেছি গল্পগুচ্ছ আর গীতবিতানে।

হঠাৎ সম্বিৎ ফিরে পাওয়া লিউসিড ইন্টারভ্যালে এক দিন এক দিন অন্য অন্য আলোয় ভুবন দেখা হয়। মেডিসিন লেকচার গ্যালারির সিঁড়ি ভেঙ্গে নেমা আসে হৃদয়ের মরমর ধ্বনি, অ্যানেস্থিসিয়া করিডোরে উড়ে আসা ইথারে ইথারে শেখা হয় কনশাস সিডেশন। এদিকে-ওদিকে মৃদু গুন গুন শুনি অন্য কথা ও সুরের, সব অনামি রয়ে যায়। একদিন আঙিনায় সুর তোলে বিষণ্ণ সানাই, শুভদৃষ্টির প্রহরে বরণমাল্য হাতে দেখা হয় এক আনন্দকে। একদিন ভেসে আসে শিশুর ক্রন্দন, রুমঝুম বেজে বেজে গড়িয়ে যায় জীবন ঝুমঝুমি। স্বচ্ছতার ব্যবধান ঘোচে আবার, ফিরি ভ্যালিয়ামের তীব্র তন্ময়তায়, মায়ার কুহকিনী যে ভালোবাসা জানাতে আসে, ও যে আলো-আঁধার সাথে সাথে ফিরে দিন-রজনী।

বলে, তুমি আছ, আমি আছি। ঘড়ির কাঁটা চল্লিশ পেরুলে অতিবাহিত ঐহিক পাঠে জানা হয় আলো আর আলেয়া, মায়ার ঘোর এবং স্বচ্ছতা, হ্যালডল এবং ক্যাফেইন, অতীত এবং ভবিষ্যৎ এর অবস্থান আসলে যতোটা দূরবর্তী মনে হয় ঠিক ততোটা নয়। জানা হয়, সাদা আর কালোর মাঝেই লাল, নীল, হলুদ, সবুজ, বেগুনী এবং অন্য সবগুলো রঙের অবস্থান; আলো আর ছায়ার মাঝে কিছু কিছু আবছায়া অবয়ব ঘুরে বেড়ায়, যাদের ঠিক প্রহরে দেখতে জানলে তারাও জীবনের মতোই সত্যি; পাপ আর পূণ্য ব্যতিরেকেও করণীয় অনেক কর্ম রয়ে যায় সংসারে।

আরো জানা হয়, জন্ম মানেই শুধু যেমন জীবনের শুরু নয়, তেমনি মৃত্যুতেই সব ক্ষয় হয়ে যায় না। নিমগ্ন দ্বিপ্রহরে টেবিলে তাই অসমাপ্ত কফির মগ, সপ্তাহ শেষের সামাজিক নিমন্ত্রণের লিস্টি, দিনরাতের জমাখরচের হিসেব নিকেশ, ভাইটামিন ডি’র অভাবের জন্য লেখা সূর্যস্নানের প্রেসক্রিপশন আর ইলেকট্রনিক মেডিক্যাল রেকর্ড এর বন্ধুবৎসল টেম্পলেট ছড়ানো ছিটানো রেখে অকষ্টকল্পিত রেল স্টেশন থেকে যখন-তখন ট্রেনে চড়ে বসি।

তিনি আজও তেমনি ঋজু, মোহিনী দুচোখ আকাশে আকাশে আজো জ্বালে অনন্ত আলোক। স্টপেজে স্টপেজে যাত্রীদের নামা-ওঠায়, কিছু অনামিকা সুরের নাম জানা হয়, কিছু অস্পষ্ট শব্দ অর্থ খুঁজে পায়, চেতনায় তবু কেবল তার-ই নিবিড় অধিকার। ভিড় ঠেলে একদিন একদিন এক একজন সামনে এসে দাঁড়ায়। এইতো সেদিন সেই শ্রুতিমধুর গদ্য কবিতা’র দুই হাতে ঝকঝকে বইখানি মুখের সাথে তুলে ধরে ঠোঁট উল্টানো অনুযোগ, তোমার কেবলই রবীন্দ্রনাথ! আমার চকিত সংশয়ের বিপন্নতা ঘোচায় তাঁর অনাবিল প্রশ্রয়, “তবু বিহঙ্গ ওরে বিহঙ্গ মোর এখনি অন্ধ, বন্ধ করো না পাখা”।

হাত বাড়িয়ে তুলে নেই আলো রঙা নিভাঁজ প্রচ্ছদের নবীন সংকলন, এক কোনায় তার মেঘমেদুরের অভিমানী টোল নজর এড়ায় না কারোই। ফেরা হয় রোজকার বাস্তব জংশনে, শেষ যাত্রী কেবল দুইজন। টেবিলে অপেক্ষমাণ নতুন ইন্সটল করা বিলিং সফট ওয়্যার আর সেল ফোন মিস হোয়ে যাওয়া বান্ধবীর লং ডিসট্যান্স কল। ভয়েস মেইলে তার তীব্র হতাশা, তুই ইদানীং আরো বেড়েছিস, আগে শুধু ম্যাজিক্যাল থিঙ্কিং ছিল, এখন ম্যাজিক্যাল এ্যাক্টিংও। এবারে সত্যি সত্যি তোর চিকিৎসা দরকার।

Ritu
প্রভাতী দাস

গণিতের সরল রেখা, বক্র রেখা, গোলক বা বিন্যাস এবং সমাবেশ আর ভালো-মন্দ, সাদা-কালো, সুস্থ-অসুস্থ, প্রাচীন-আধুনিক ইত্যাদি পরিভাষাময় পৃথিবীকে পাশ কাটিয়ে সঞ্চয়িতা খুলে চিকিৎসা নিতে বসি,

“…মানুষের যাবার দিনে চোখ

বিশ্ব থেকে নিকিয়ে নেবে রঙ, মানুষের যাবার দিনের মন

ছানিয়ে নেবে রস!

শক্তির কম্পন চলবে আকাশে আকাশে, জ্বলবে না কোথাও আলো।

বীণাহীন সভায় যন্ত্রীর আঙুল নাচবে, বাজবে না সুর।

সেদিন কবিত্বহীন বিধাতা একা রবেন বসে

নীলিমাহীন আকাশে ব্যক্তিত্বহারা অস্তিত্বের গণিততত্ত্ব নিয়ে।

তখন বিরাট বিশ্বভুবনে দূরে দূরান্তে অনন্ত অসংখ্য লোকে

লোকান্তরে

এ বাণী ধ্বনিত হবে না কোনোখানেই–

“তুমি সুন্দর’, “আমি ভালোবাসি’।

বিধাতা কি আবার বসবেন সাধনা করতে

যুগযুগান্তর ধ’রে।

প্রলয়সন্ধ্যায় জপ করবেন–

“কথা কও, কথা কও’,

বলবেন “বলো, তুমি সুন্দর’,

বলবেন “বলো, আমি ভালোবাসি’?

 

শুভ জন্মদিন বুড়ো, তোমার সঙ্গেই প্রাণের খেলা, প্রিয় আমার ওগো প্রিয়।

(লেখক যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী চিকিৎসক)

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.