আমরা যারা একলা থাকি-১৯

imp 1সুপ্রীতি ধর:

একা থাকতে থাকতে প্রতিটি মানুষের ভিতরমূল পর্যণ্ত পাল্টে যায়, অনেকটা স্বাধীনচেতা হয়ে গড়ে উঠে সেই মানুষটি। যদিও অনেক সময়ই সেই মানুষটিকে আমরা হা-হুতাশ করতে শুনি যে, আহা, কেউ যদি থাকতো, পরাধীনতার দিবাস্বপ্ন দেখেন তারা।

আসলে কি তারা প্রস্তুত থাকেন নতুন যুগপৎ জীবন শুরু করার? থাকে না। প্রায়ই দেখা যায়, কেউ যদি তখন তাকে নিয়ন্ত্রণ করতে আসে তখনই সে দুর্ভেদ্য হয়ে উঠে। অবশ্য এক্ষেত্রে বলতে পারি যে, নিয়ন্ত্রণই বা করতে আসবে কেন কেউ? শুধুমাত্র বন্ধু ভেবে কেউ কি এগিয়ে আসতে পারে না? বন্ধুর মতো করে সব দোষত্রুটি মেনে নিতে পারে না? একলা চলার যে জীবনে অভ্যস্ত হয়ে আছে বন্ধুটি, সেখানে আরেকজন বন্ধু হয়েই তো কাটিয়ে দেয়া যায় পুরো একটি জীবন। কি এমন সমস্যা তাহলে?

সমস্যা আসলে আমাদের চিন্তায়, আমাদের বোধে। আমরা বিশেষ করে এই এশিয়া ভূখণ্ডে বেড়েই উঠি কাউকে না কাউকে সবসময় পদাবনত করার অভিপ্রায় নিয়ে। ঠিক বন্ধুর মতো কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে চলতে শিখি না। দ্বন্দ্বটা তৈরি হয় এখানেই। ভেসেলকা (ওরফে ভেসি) বুলগেরিয়ার মেয়ে। ছোটবেলা থেকে স্বাধীনচেতা সে। পড়াশোনা করেছে রাশিয়ার সেন্ট পিটার্সবুর্গ স্টেট ইউনিভার্সিটিতে, আন্তর্জাতিক সাংবাদিকতা বিভাগে। বরাবরই ভাল স্টুডেন্ট এবং স্টুডিয়াসও সে। সেইসাথে প্রচণ্ড কর্মঠ। ছাত্রজীবন থেকেই তাকে দেখা গেছে যেকোনো প্রোগ্রামে অগ্রণী ভূমিকা নিতে। বুলগেরিয়ার ছাত্র সংগঠন ঠিক করেছে বুলেটিন বের করবে, ভেসি দাঁড়িয়ে গেল। রাতের পর রাত জেগে, লেখা জোগাড় করে তিন মাসের মাথায় বের করে আনলো আস্ত একটা বুলেটিন। নিজে ভাল কবিতা লেখে, ভাল ছবি আঁকে। আবার প্রেমও করে সে। জীবনে সে থেমে নেই। নেই শূন্যতা। এক বন্ধু যায় তো, আরেক বন্ধু আসে। ক্ষণিকের জন্যও মন খারাপ করতে দেখা যায় না তাকে।

প্রেম সম্পর্কে ভেসির স্বগতোক্তি হলো-প্রেম এবং সেক্স-দুটোই হলো আর্ট বা শিল্পকলা। একে যতো সৃজনশীল করবে, ততোই উপভোগ করবে জীবনে। তার ভাষায়, ছিঁচকাঁদুনেদের জায়গা নেই এই কলায়। সে আরও বলতো, ‘দেখো, আমার জীবনে প্রেম এসেছে, গেছে, আবার এসেছে। তবে কাউকে আমি ঠকাইনি। একসঙ্গে আমি অনেকের সাথে প্রেম করিনি। জীবনে মিথ্যার আশ্রয় নেইনি’। ওর কথাটা এখনও কানে বাজে। চারপাশে তাকিয়ে যখন সংসার ভাঙার গল্প শুনি, পরকীয়ার কাহিনী শুনি, তখন মনে হয়, ভেসিরাই ভালো, অন্তত হিপোক্রেসি নেই ওদের মাঝে।

কী বলতে কী বলা হয়ে গেল! যাকগে, সেই ভেসি জীবনের অনেকটা পথ পেরিয়ে এসে ফেসবুকের মাধ্যমে খোঁজ পেলো তার পুরনো এক প্রেমিকের। যে চিলিতে থাকে। শুরু হলো ফোনের পর ফোন, রাত জেগে কথা বলা। আবার সেই পুরনো অনুভূতি দুজনেরই। দুজনেই ব্যাকুল দুজনের জন্য। ভেসি তখন ইতালিতে থাকে, স্পেনিশটা শিখে নিল খুব দ্রুত। অত:পর এক সুন্দর সকালে ভেসি বিদায় জানালো তার প্রাপ্তবয়সী ছেলে এবং মেয়েকে, বিমানে চড়ে বসলো চিলির পথে। পিছনে ফেলে গেল জীর্ণ হয়ে যাওয়া সংসারের ধুলোবালি। তার কথা ছিল, ‘ওকে যখন এতো বছর পর ফিরেই পেলাম, ঈশ্বর যেহেতু আবার মিলিয়ে দিল দুজনকে, দেখি না ঝালাই করে’।  ওর আনন্দে তার বন্ধুরাও খুশি হয়ে বিদায় জানালো।

দিন যায়, মাস যায়, ফেসবুকে ছবির পর ছবি পাল্টায় ভেসি আর তার বন্ধু রেনে। বছর না ঘুরতেই হঠাৎ ইনবক্সে ভেসির ক্ষুদেবার্তা। ‘নাহ, হলো না, জীবনটা আমাকে আবার ভাসিয়ে দিল, রেনের এতোটুকু পরিবর্তন হয়নি’। ভেসির কথা হচ্ছে, রেনে আগেও যেন জীবন সম্পর্কে উদাসীন ছিল, এখনও তাই আছে। এতোটুকু পরিবর্তন হয়নি। মদ খায়, মাতলামি করে। আর পারেনি ভেসি। জীবনের এই পড়ন্ত পর্যায়ে এসে আর ‘এক্সপেরিমেন্ট’ করতে ইচ্ছে করেনি তার। চলে এসেছে। বিদেশে বন্ধুকে হারিয়ে কিছুদিন হাতড়ে বেড়ায় সে। ফটো সাংবাদিকতা তার নেশা এবং পেশাও। এটাকেই সে অবলম্বন করে নতুন করে একটু একটু করে পায়ের নিচে ভিত শক্ত করছে সে।

ভেসির মতোন শক্ত মনের কয়জনাই বা থাকে! এই মহাদেশে যাদের জন্ম, বিশেষ করে মেয়েরা ভৌগোলিকভাবেই দুর্বল মনের। আর সংসার ভাঙা মেয়েগুলো হয় আরও বেশি নাজুক। পুরুষরাও এই মেয়েদের এমন নাজুক দেখতেই যেন ভালবাসে। মেয়েরা যখন মাথা ফুঁড়ে বেরুতে চায়, তখন চলে তাদের ওপর দমন-পীড়ন।

শাহানা দুই সন্তানের মা, স্বামী থেকেও নেই। দীর্ঘদিন একা থাকার লড়াইয়ে নেমে শাহানা ভুলেই গেছে, তার জীবন পরিচালনায় অন্য কেউ কোনদিন হাত বাড়াবে। সে কখন ঘুমাবে, কখন খাবে, কখন কোথায় যাবে, এগুলো যখন কেউ নিয়ন্ত্রণ করতে আসে, শাহানা বিদ্রোহী হয়ে উঠে। তার অপরপক্ষ বুঝতে চায় না, শাহানার সময় দরকার। অনেক অনেক সময়। যে জীবন তাকে শিখিয়েছে দুপায়ে দাঁড়াতে, সেই জীবন তো তাকে হুট করে বসিয়ে দিতে পারে না। যে জীবন তাকে যখন-তখন নিজেকে নিয়ে ভাবার স্বাধীনতা দিয়েছে, সেই জীবন তো তাকে এমন ঝুপ করে পরাধীন করতে পারে না কারও।

কথা হচ্ছিল শাহানার সাথে। পারিবারিকভাবেই তার বিয়ের কথা হচ্ছে এতোবছর পর এসে। সেও রাজী। কিন্তু মনটা খচখচ করছে এই ভেবে যে, তার এতোদিনের লালিত জীবনটা শেষ হয়ে যাবে না তো! সে কী আর আগের মতো করে মাথা তুলে বাঁচতে পারবে? এরকম নানা চিন্তায় শাহানা সেই ১৮ বছর আগের অনিশ্চিত জীবনে আবার উল্টোপথে হাঁটে।।।

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.