আরাধিতা, তুই আমার আরাধিত সারাজীবন

Aradhita
আরাধিতা

ইমরান আহমেদ: আজ বিশ্ব অটিজম্‌ দিবস। প্রথমেই একটা কথা বলে নেই – আমার মেয়ে কিন্তু দারুণ বুদ্ধিমতী। তাই ওকে বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন শিশু বলতে আমি রাজি নই। তবে হ্যাঁ ও সামাজিক নয়, মিশুক নয়। আরও একটা কথা –
”Autism is not a disease, its a state of mind”
এ কথাটা গেঁথে নিন মনের মধ্যে। ওদেরকে একেবারেই হেয় বা অবহেলা করা থেকে বিরত রাখুন নিজেকে এবং অন্যদেরকেও। কিছু ক্ষেত্রে ওদের বুদ্ধিমত্তার কাছে নিজেকে অনেক পিছিয়ে থাকা মানুষ মনে হবে আপনাদের!

২৩ নভেম্বর আরাধিতার বয়স আট পেরিয়ে গেল। ওকে যখন ওর মা’র জরায়ু থেকে বের করা হল ঠিক সেই মুহূর্ত টা দেখবার সৌভাগ্য আমার হয়েছিল যেটা অনেক বাবারই হয়না। কি সুন্দর ঘন কাল চুল ছিল মাথায়, আর পৃথিবীর মুখ দেখবার সাথে সাথেই সে কি কান্না ! হয়তো তখনই বুঝেছিল মায়ের ভেতরের ওই চমৎকার আরামের জায়গা ছেড়ে এ কোন অদ্ভুত জায়গায় এসে পড়লো সে। এরপর এক এক করে পেরিয়ে গেছে আটটি বছর।

এই বয়সে অন্য ছেলে মেয়েরা যখন গোগ্রাসে Harry Potter গিলছে, গাদা গাদা বই পড়ে বাবা মাকে চমৎকৃত করছে, সংসারের ভাল মন্দ বুঝতে শিখে যাচ্ছে, সম্পর্কের জটিলতা নিয়ে ভাবতে পারছে, সামাজিক অবস্থান উচ্চ থেকে উচ্চতর স্থানে নিয়ে যাবার জন্য যারা এখন থেকেই দিক নির্দেশনা পাচ্ছে- ঠিক সেই সময় আমার মেয়ে কিন্তু দিব্যি আট বছরের শিশুই রয়ে গেছে, ওর বুদ্ধি বেড়েছে কিন্তু সামাজিক হয়নি, মানুষের সাথে মিশবার দক্ষতা বা ক্ষমতা বাড়েনি। ও ওর বুদ্ধিকে নিজের মত ব্যবহার করে নিজের একটা জগত তৈরি করে নিয়েছে- যে জগতে অন্য কারও প্রবেশ ওর প্রয়োজন নেই, আর আমাদের জগতে থাকবার ইচ্ছেও ওর নেই।

বিশেষজ্ঞরা ওর এই মানসিক অবস্থার নাম দিয়েছেন AUTISM. এবং বিশেষজ্ঞরা আপাতত স্বীকার করে নিয়েছেন যে তারা জানেন না কেন এই মানসিক অবস্থার সৃষ্টি হয়। অনেক চেষ্টা এবং সাধনার পর আরাধিতার নিজস্ব এই জগতে আমি প্রবেশ করবার পথ পেয়েছি, পেরেছি আমার আর ওর মধ্যে একটা সেতু গড়তে- যার সাহায্যে আমরা আমাদের ভাবনার আদান প্রদান করতে পারি। কথা বলতে পারা আরাধিতা প্রয়োজন মনে করেনি, তাই যে বয়সে ওর কথা বলার কথা ছিল সে বয়সে ও কথা বলেনি। কিন্তু এখন বলছে কারণ ও বুঝতে পেরেছে ‘কথা’ দিয়েও ভাব বিনিময় হয়। ও এখন দু শব্দের বাক্য দিয়ে কথা বলে,যখন প্রয়োজন হবে শব্দের সংখ্যা আরও বাড়াবে।

আরাধিতা কখনও মিথ্যে কথা বলতে পারবেনা, হিংসা , বিদ্বেষ, ছলনা এই ব্যাপার গুলো ওর মধ্যে কাজ করবেনা। এই কঠিন পৃথিবীতে বাস করতে হলে প্রতি পদে ওর অন্যের সাহায্য প্রয়োজন হবে। এই ব্যাপারটা মনে এলেই খুব কষ্ট হয়, নিজেকে অসহায় মনে হয়। আমি যখন থাকবো না আমার আরাধিতাকে কে দেখবে, কে ওকে ভালবাসবে, কে ওকে বুকের মধ্যে আগলে রাখবে!

যে সব বাচ্চারা আরাধিতার মত নয় তাদের সাথে আমি আরাধিতার তুলনা কখনই করিনা- ওরা এই সমাজের কাঠামো অনুযায়ী বড় হবে, শিক্ষিত বা অশিক্ষিত, ডাক্তার , ইঞ্জিনিয়ার, উকিল, পুলিশ , সরকারি চাকর, বড় বড় NGO’র দাস দাসী, নেতা , ইত্যাদি কেউ একজন তারা হবেই। কিন্তু আমার আরাধিতা বড় জোড় আট বছর বয়সী একটা শিশুই রয়ে যাবে সারাজীবন। এই সমাজে বাস করবার কূটনীতি টা আর শিখতে পারবেনা।

আরাধিতা ! তোর জন্মদিনে আমার একটাই প্রার্থনা, তুই এরকমই থাক সারাজীবন! তোর কাছ থেকে অনেক কিছু শিখেছি রে! কোন একজন তোর মতই ভাল মানুষ যদি তোর পাশে থাকে আমৃত্যু তবেই আমার আত্মা শান্তি পাবে! আর আমি যতদিন বেঁচে আছি আমার বুকের মধ্যেই থাকবি তুই! আমার সোনা বাচ্চা।

ইমরান আহমেদ, ঢাকা

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.