সাহেরা কথা-১০

Bangali nariউইমেন চ্যাপ্টার: সাহেরার মন খারাপ। সাহেরাদের একটা টিভি ছিল, ১৪ ইঞ্চি রঙিন, কনকা। সেকেন্ড হ্যান্ড এই টিভিটি সাহেরা কিনেছিল গত বছর ৬ হাজার টাকা দিয়ে। টিভিটা সাহেরার জন্য প্রথমে বিনোদন বিলাস থাকলেও ক্রমশ প্রয়োজন হয়ে দাঁড়িয়েছে। সাহেরার ছোট মেয়েটি স্কুল থেকে ফিরে দুপুরে- তারপরে মা ঘরে ফেরা না পর্যন্ত সারা দুপুর বিকেল মেয়েটি একা বাড়িতে। সাহেরার স্বামী যদি রিকশা চালাতে নাও যায় তবু মেয়েকে দেখে রাখবার অবসর তার কোথায়! সে বস্তির ঢোকার মুখের দোকানের সামনে পয়সা দিয়ে ক্যারম খেলায় ব্যস্ত। মেয়েটি অন্য বাড়ীতে খেলতে যায়। বস্তির মধ্যে কত ঘটনা ঘটে।

ঘটনা না বলে অঘটন বলাই শ্রেয়। মেয়ের নিরাপত্তা নিয়ে চিন্তিত সাহেরার কাছে টিভিটা এক ধরনের প্রোটেকশন মেজার নিয়ে এলো মেয়ের জন্য। স্কুল থেকে ফিরে খেয়ে-দেয়ে মেয়ে টিভির সামনে,সাথে আরও বাচ্চারা। মোটামুটি চিন্তাহীন সাহেরা। অবশ্য ৯ বছরের একটি শিশুর জন্য খেলাধূলা না করে সারাক্ষণ টিভির সামনে বসে থাকা শরীর ও মনের জন্য কতটা ক্ষতিকর সেই কথা আর বুঝাতে যাই না সাহেরাকে। নিজের ভিতরের মায়ের মন নিয়ে অনুভব করি তার আশংকাগ্রস্ত মনকে। বরং আমিও কিছু টাকা দেই তাকে টিভিটা কেনার জন্য।

টিভি আসার পরে সাহেরার বেশ বিনোদনের একটা উপাদান হলো। ১০০ টাকা দিয়ে সে কেবল টিভির লাইন নিয়েছে। বাংলা সিনেমা আর সিরিয়াল তার প্রিয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। স্বপ্নের টিভি নায়িকারা এখন প্রতিদিনের দৃষ্টি সীমায়। আমার মায়ের সাথে সে ভারতীয় টিভি সিরিয়াল নিয়ে খুচরা আলাপও করে মাঝে মধ্যে। ঠাট্টা করে যদি কোনদিন বলি, সাহেরা অমুক সিরিয়ালের নায়িকার শেষ পর্যন্ত কি হলো! সাহেরা পা ছড়িয়ে বসে শুনিয়ে দেবে আমায় সেই বউ- শাশুড়ির কলহ কাহিনী অথবা গল্পের পুরুষের অন্য নারীতে আসক্তির কথা। তার মতামত জানিয়ে দিতেও দ্বিধা করে না সে। আমার টিভি দেখার প্রায় অনভ্যাসকে সে বড়ই কঠিন সমালোচনা করে।

” তোমরা বড়ই আরচরজ্য (আশ্চর্য) মানুষ আফা! অস(রস) কস নাই কুন! এত্ত বড় সিনেমার নাখান( মতন) টিপি (টিভি সে বলতে পারে না ) খান খুলিয়াও দেখেন না। জুদিন বা দেখেন, কি কতগুলা বেটা ছাওয়া বেটি ছাওয়া বসি বসি প্যাঁচাল পারে সেইগুলা নোয়ায় তো ফুট ফুট ইংলিশ (এটা একদম ঠিক উচ্চারণ করে সে) বাঘ-ভাল্লুকের কাণ্ড দেখেন! কত সুন্দর সিনেমা দেখায়। কত মজার কাহিনী, তোমরা কিছুই দেখেন না”!

তো ভালই চলছিল সেই টিভি। সপ্তাহ দুয়েক আগে, আমি যখন দেশে ছিলাম না, একদিন দুপুরে সাহেরার মেয়ে প্রতিবেশীর ফোন থেকে কাঁদতে কাঁদতে জানালো, কতগুলো লোক এসে তাদের ঘরের টিভিটা নিয়ে যাচ্ছে। তার বাবা উঠোনে দাঁড়িয়ে কিন্তু কিছুই বলছে না। প্রতিবেশী জানালো, সাহেরার স্বামী গত কয়েকমাসে দোকানে ৭০০ টাকার পাউরুটি, বিস্কুট,কলা, চা, সিগারেট ইত্যাদি বাকিতে খেয়েছে। দুই মাস ধরে তাগাদা দিয়েও টাকা আদায় করতে না পেরে শেষ পর্যন্ত দোকানদারের এই সম্পত্তি ক্রোক। আর কিছু না পেয়ে টিভি নিয়ে যাচ্ছে।

খবর শুনে সাহেরা দৌড়ুল বাড়ীর দিকে। আমার মা তাকে ৭০০ টাকা দিলেন টিভিটা ছাড়িয়ে নিতে। পরে না হয় বেতন থেকে কেটে নেয়া যাবে, বা কিছু একটা করা যাবে। মাও সাহেরা আর তার মেয়েটিকে আদর করেন খুব। পরের দিন সকালে সাহেরা কাজে এসে মাকে ৭০০ টাকা ফেরত দিলো। মা জানতে চাইলে বলল, এখন সে টিভি ফেরত আনবে না, আপা (আমি) এলে আমার সাথে বুদ্ধি করে কিছু একটা করবে। জানতে চাইলাম, কেন সাহেরা টিভিটা ছাড়াল না! দরকার ছিল তো মেয়েটার জন্য। জল ভরা চোখে জ্বলে উঠে সাহেরা বলল,’ মুই বুঝিয়াই টিভি ছাড়াই নাই আফা। মুই কি কেবলই যোগানদার, যাই হোক, যেমন হোক, মোকই কেবল যোগান দিয়ে যাইতে নাগবে এই জীবনভর?”

অবাক হয়ে তাকিয়ে রই। সাহেরা জানায়, যখন সে পৌঁছায় বাড়িতে, তখন তার স্বামী উঠোনে দাঁড়িয়ে সিগারেট ফুঁকছিল আর কিছু মানুষ তাকে ঘিরে আলাপ করছিল। সাহেরার মেয়েটি ঘরের দুয়ারে বসে ফুঁপিয়ে কাঁদছিল। সাহেরা যেতেই স্বামী নির্বিকারভাবে বলে, টাকা আনিছিস? মোক দে, মুই টিপি ফেরত আনি দিইম। তোক দোকানে যাওয়া নাগবে না।!” ‘মোর মাথাত আগুন জ্বলি গেল আফা! মুই অক্ত পানি করি কাম করি, একনা পয়সা দরকার ছাড়া খরচ করি না। ছাওয়াখান মোর কত কিছু কিনি খাইতে চায়, মুই না দেই, খালি কই সবুর করেক বাহে, আর কিছুদিন পরেই গেরামত ঘর কিনিম। এটটু সবুর ধরি থাক মায়ও। তোমরা যেই মিষ্টি, কলা, কমলা দেন, তাই ছাওয়াক রাখি রাখি খাওয়াই। আর দেখেন তোমরা, হারামীর ঘরের হারামী (স্বামী) বিস্কুট কলা খাইয়া ৭০০ টাকা বাকি ফালাইছে। ফির সেই টাকা মোক শুধাইতে নাগিবে!এলা মুই টাইট দিম।’

অবাক ব্যাপার, টাইট শব্দটি সাহেরা ঠিক ঠাক উচ্চারণ করে। বলি, কতদিন পারবে সাহেরা? মেয়েটি একা একা থাকবে! সাহেরা জানায়, কিছুদিন নাহয় মেয়েটি তার পাশের ঘরে থাকবে, ওই বউটি এখনো কাজে যায় না। দরকার হলে সে দুপুরে একবার গিয়ে মেয়েকে সাথে নিয়ে আসবে, কিন্তু ৭০০ টাকা দিয়ে টিভি সে এখন ছাড়াবে না। আরও জানায় সে, তার স্বামী নাকি বলেছে বাড়ীর অন্যদেরকে, দেখবে সাহেরার এই তেজ কতদিন থাকে। মেয়ের জন্য হলেও সাহেরা মাথা নোয়াবে। সময়ের ব্যাপার মাত্র।

বলতে বলতে কেঁদে ফেলে সাহেরা,’ আফা মোর জীবন খান এমুন কেন? সগই যদি মোক একাই করা নাগবে, তবে জীবনে সাথী থেকে লাভ হলো কি? হারামজাদা(স্বামী) ভাল করিয়াই জানে মুই সংসারের জন্য সগই করিম, ছাওয়া গুলাক ফালে থুইয়া কটিও (কোথাও) যাবার পারিম না। এই সুযোগ টাই শু…রের ছাওয়া নেয় গো আফা। মাইয়া দুইটা না থাকিলে মুই কবে কোনঠে চলি গেলাম হয়! মুই জানং, ওমরাই কুনদিন ফেলে যাইবে হামাগরে কিন্তু মুই কি মা হইয়া পারিম আফা! তোমরা কি পারিছেন? কাইও মা পারে না আফা। সন্তান যে আমার!’

উত্তর দিতে পারি না। ভাবি মনে মনে, সাহেরারা সবই করবে, জীবনের যাবতীয় চাহিদার যোগানদার সাহেরারা। কোনদিন যদিও বা সাহেরা রুখে দাঁড়িয়ে বলতে পারে, চাই না এই গ্লানিকর জীবন, পুতুল খেলার সংসার, চললাম আমি। কিন্তু কোনদিনই কোন সাহেরা বলতে পারবে না, থাকলো সন্তান, আমি আর যোগানদারের ভূমিকা নিতে পারছি না।

জীবনের চাহিদার যোগান একবার দিতে শুরু করলে আর থামা যায় না, সাহেরা সেটা ভালই জানে…যত যাই হোক না কেন, দোকানে বাকী থাকুক ৭০০ টাকা, টিভি ক্রোক হয়ে যাক, সাহেরা গুমরে কাঁদতে পারে, অস্থির হতে পারে, চিৎকারে আকাশ বিদীর্ণ করতে পারে, পারে না জীবন থেকে চলে যেতে…দিনের শেষে সন্তানের মায়া তাকে বেঁধে রাখে জীবনের সাথে।…যেতে পারি, কিন্তু কেন যাব! সন্তানের মুখটি ধরে একটি চুমু খাব…!

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.