রোজ নামচা-১২

women abstractলীনা হক: নেপাল আর ভারতে মিলে প্রায় ১৭ দিনের মিশন শেষে ঘরে ফিরেছি। এসেই মায়ের হাতের রান্না করা লাউ শাক আর পাবদা মাছের ঝোল, টমেটো, ধনেপাতার ভর্তা দিয়ে ভাত খেয়েই দিলাম ঘুম। আহা!

পৃথিবীর নানান দেশে ঘুরে, উন্নত দেশ, উন্নয়নশীল দেশ, স্বল্প উন্নত দেশ, গরীব দেশ, প্রতিবেশী দেশ, ঠাণ্ডার দেশ, গরমের দেশ, নাতিশীতোষ্ণ দেশ, সমুদ্রতীরের দেশ, পাহাড়ের চূড়ার দেশ, মালভূমি আর মরুভুমির দেশ – সব দেশ ঘুরে আমার কাছে আমার এই ধূলায় ভরা বাংলাদেশই প্রিয়।

আমার উপলব্ধি হল- নিজের দেশ, নিজের স্নান ঘর, নিজের ঘরের বিছানা- এই আমার প্রিয় জায়গা। আর মায়ের রান্না, তাবৎ বড় বড় হোটেলের পৃথিবীখ্যাত খাবার চেখে দেখবার পরেও আমার মনে হয় মা যে ঝোল করেন পাবদা মাছের, টমেটো, কাঁচা মরিচ আর ধনে পাতা দিয়ে অথবা ট্যাংরা মাছের ঝাল চচ্চরী, কিংবা সর্ষের তেল দিয়ে মাখিয়ে রান্না করা গরুর গোশত- নাহ আর কিছুতেই আমাকে টানে না! সে লোকে আমাকে যতই বেআক্কেল, বেহুদা বলুক না কেন। নিজের প্রিয় বিছানায় প্রায় ১৮ ঘণ্টা ঘুমিয়ে উঠে পরিবারের সাথে বসে চা পান। সেখানেও আমার গ্রাম্য পছন্দ- নিজের প্রিয় মগ বোঝাই চা আর সেই সাথে তেল কাঁচামরিচ পেয়াজে মুড়ি মাখা সাথে একটা নারকেল নাড়ু অথবা এক টুকরা খেজুর গুড়- কোথায় লাগে চিজ পকোরা কি স্যান্ডুইচ, বাদাম দেয়া ক্র্যাকারস অথবা মাফিন!

নাহ, আমি আসলে কোনদিনই গ্লোবাল সিটিজেন তো দূরের কথা শহুরেই হতে পারলাম না আজ অবধি! মমিন্সিঙ্গা (ময়মনসিংহ) ভূত নাকি পেত্নীই রয়ে গেলাম! যাই হোক ফেলে যাওয়া সাম্রাজ্যের স্টক নিতে শুরু করলাম। গত ১৭ দিনে কোথায় কি হল আমার অবর্তমানে!

প্রথমেই কন্যার যাবতীয় কমপ্লেইন, আমি না থাকলেই তার যে ধরনের অসুবিধা হয় তার হিসাব। স্কুলের বন্ধুরা সিনেমা দেখতে যাবে তার কাছে টাকা ছিল না, খুচরো টাকা শেষ হয়ে যাওয়াতে রিকশা ভাড়া দিতে বড্ড মুশকিল হয়েছে। পহেলা বৈশাখ এসে যাচ্ছে এখনো তার পোশাক প্রস্তুত হল না, বন্ধুরা সবাই হয় কিনে নয়ত বানিয়ে ফেলেছে। আমাদের টেইলর এখন নেবে কিনা পোশাকের অর্ডার!

মা বললেন, বাজারে জিনিসপত্রের দাম এতো বেড়ে গেছে যে সংসার চালানো বড্ড মুশকিল! পেপার হকার ২৬ দিন পত্রিকা দিয়ে ৩০ দিনের বিল দিয়েছে। কেবল টিভি সংযোগকারী সংস্থাটা শুধু এত গুলো টাকা নেয় মাসে- অনেক ভালো ভালো চ্যানেল দেখা যাচ্ছে না! সেই সব ভালো চ্যানেলের মধ্যে মায়ের পছন্দ ভারতীয় বাংলা সিনেমা আর কন্যার পছন্দ কিছু ইংরেজী চ্যানেল, কাজেই সেগুলো জরুরি। আর আমি তো ছাগলের তিন নম্বর বাচ্চা! আমার মা আর মেয়ের দেখার অবসরে যদি সুযোগ পাই তবেই আমার টিভি দেখা!

খাবার ঘরের একটা বাল্ব খারাপ হয়েছে আমি যাওয়ার পরেরদিন থেকেই, প্রায় এক সপ্তাহের বেশী কল বেল কাজ করছে না, মেয়ের বাথরুমের ঝাঁজরি দিয়ে জল দ্রুত সরছে না, একদিনের ঝড়ো হাওয়ায় আমার দুটো টব পরে গিয়ে কোনা ভেঙ্গে গিয়েছে, কাপড় শুকোতে দেয়ার রশি ছিঁড়ে গেছে। স্যানিটারি মিস্ত্রি, কাঠের মিস্ত্রি, ইলেকট্রিক মিস্ত্রি, কেবল টিভির অফিসের লোক- সবার নাম টেলিফোন নম্বর খাবার ঘরের হাত ধোয়ার বেসিনের কাছে মজুদ আছে, কিন্তু তাদেরকে ফোন করার জন্য মানুষতো দরকার!

আহ! ভাবতেই মনটা কেমন গর্ব গর্ব হয়ে উঠে, এই সব কাজের সামাল দেয়ার জন্যই তো আমার মতন মানুষ সংসারে দরকার। ইস আমি না থাকলে কি যে হবে এই জগত সংসারের! তো ঠিকঠাকের কাজ না হয় বেশী পরিশ্রম আর অল্প টাকায় ম্যানেজ করা যাবে। টেইলরকেও ফোন করে অনুরোধ করা হলো যাতে সে পহেলা বৈশাখের আগেই মেয়ের পোশাক তৈরি করে দেয়, না হয় একটু বেশী মজুরীই রাখল। এদিকে অফিসে যাওয়ার জন্য গাড়িতে পা না রাখতেই ড্রাইভার শোনাল সেই মোক্ষম সংবাদ- গাড়ীর এসি কাজ করছে না আপা! তার হাসি মুখ দেখে মনে হলো লটারি জেতার সংবাদ শোনাচ্ছে!

Leena Haq
লীনা হক

জিজ্ঞ্যেস করে আরও কনফিউসড হলাম, ‘ এসি’র গ্যাসেরও সমস্যা হইতে পারে, আবার কম্প্রেসরটাও চইলা গিয়া থাকতে পারে, গ্যারেজে দেখাইলে বুঝা যাইব!’ বলতে আর পারলাম না যে, গর্দভ, গ্যাস ভরতে হলে একধরনের খরচ আর কম্প্রেসর রিপ্লেস করতে হলে আরেক বিরাট বহরের খরচ, তোমার কথায় তো মুড়ি-মুড়কির এক দাম বলে বোধ হচ্ছে!’ বলা যায় না, যত কথা মনে আসে তার ৮০ ভাগও বলা যায় না এই জীবনে! তবু ভালো লাগে এই জীবন।

মেয়ের কমপ্লেইনের পাশাপাশি তার জন্য নিয়ে আসা উপহার সামগ্রী দেখে উচ্ছ্বসিত তার আনন্দ আমার মনকে ভরে তোলে। সাথে সাথে ফেইসবুকে পোস্টিং। শুনি মা যেন কাকে ফোনে বলছেন,’আমার জন্য যে সম্বলপুরী শাড়ীটা এনেছে – যেমন তার জমিন তেমনি আঁচল। আর স্যান্ডেলটাও এতো আরাম পরতে, মজবুতও অনেক‘। আমার আনা কালো পোলো টি শার্টে ড্রাইভার লুকিং সো স্মার্ট। সাহেরা তার থ্রী পিস একবার খুলে দেখে আবার ভাঁজ করে রাখে, আবার একটু খুলে দেখে। মুখে স্মিত হাসি। এইতো জীবন। এইই আমার জীবনের আনন্দ।

মাঝে মাঝে ক্লান্তিকর হয়ে ওঠা, বেঁচে থাকাটা দিন শেষে এদের জন্যই আনন্দের। আর বাল্ব ঠিক করা, নুতন টব কেনা, রশি ঝোলানো, উৎসবে পার্বণে সাজ পোশাকের ব্যবস্থা, এগুলো আমি না করলে কে করবে শুনি! আমার মতন এতো জরুরি প্রয়োজনীয় মানুষ আর দ্বিতীয়টি কি আছে আমার কন্যা আর আমার মায়ের জীবনে! নিজের এই প্রয়োজনীয়তা নুতন করে উপলব্ধি করে মন ভালো হয়ে উঠে, সত্যি সত্যি।

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.