ইংরেজি বর্ণে জাতীয় সঙ্গীত ও টাইমস স্কয়ারে দেশপ্রেম

Pataka 4সাদিয়া মাহ্জাবীন ইমাম: আমার বন্ধু চিং এশাকে শব্দ ব্যবহারের জন্য প্রাইজ দেয়া উচিৎ। গত নয় বছর ধরে আমি তার এই গুণের সাথে পরিচিত। তবে এখানে দাঁড়িয়ে যে কাজটা সে করলো, এটা সামলে নিতে মোটামুটি আমাকে মিথ্যে একটা গল্প ইনস্ট্যান্ট উপস্থাপন করতে হয়েছে।

আমি আর এটিএন বাংলার সিনিয়র স্পোর্টস রিপোর্টার চিং এশা দাঁড়িয়ে আছি নিউ ইয়র্কের টাইমস স্কয়ারের রেড স্টেয়ার্স-এ। উদ্দেশ্য  হাতে পতাকা নিয়ে সমবেত কণ্ঠে জাতীয় সঙ্গীত গাওয়া। ২৬ মার্চ উপলক্ষ্যে প্রবাসী বাংলাদেশীরা টাইমস স্কয়ারে গান গেয়েছেন, এমন একটি নিউজ বাংলাদেশের গণমাধ্যমে প্রচারিত হবে বলে এই আয়োজন। ঢাকায় বসে যে সব নিউজ সম্পাদনা করি তার মধ্যে প্রবাসীদের খবরও থাকে। আজ স্বশরীরে নিজেই দেখতে এলাম। এখানে প্রবাসী বাংলাদেশী, প্রবাসী সাংবাদিক ও নিউইয়র্কের বাংলাদেশ কনস্যুলেটের কর্মকর্তারা উপস্থিত রয়েছেন। আমরা রেড স্টেয়ার্স এর সিঁড়িতে লাইন ধরে দাঁড়িয়েছি। পতাকা দুলিয়ে গাইবো, আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি। প্রথমে একবার রিহার্সেল তারপর ফাইনাল রেকর্ড। সবার হাতে পতাকা গান গাওয়ার সময় দোলাতে হবে। আর আছে একটা কাগজে আমাদের জাতীয় সঙ্গীতের প্রথম অংশটুকু লেখা।

তাপমাত্রা ৩৪ ডিগ্রী ফারেনহাইট মানে বাংলাদেশের হিসেবে মাইনাস ১ ডিগ্রী সেলসিয়াস প্রায়। এখানকার যারা মাইনাস থার্টি পেয়েছেন তাদের জন্য সামার, কিন্তু আমার মত বাংলাদেশী গেঁয়ো যে জীবনেও ৬ ডিগ্রী সেলসিয়াসের নীচে ঠান্ডা পায়নি তার জন্য মাইনাস ওয়ান মোটামুটি এ্যান্টার্কটিকা অবস্থা। তিনটি সোয়েটার ও একটা ওভারকোট পড়ার পরও মাঝে মাঝে হাত বের করে দেখি রক্ত চলাচল পুরোই বন্ধ হয়ে গেছে কিনা, গলা কেশে ঝেড়ে পরিস্কার করে দেখলাম শব্দ বের হয় কিনা। না ঠিক আছে, চলবে আর আফটারঅল এতো কোরাস সঙ্গীত। এর মধ্যে দুই ভদ্র মহিলা ও এক ভদ্র মেয়ে এসেছেন লাল স্যান্ডেল পায়ে দিয়ে এবং সবুজ রঙের জামার উপর স্রেফ একটা সোয়েটার গায়ে। তাদের দেখে আমি লজ্জায় কোথায় মুখ লুকাবো বুঝতে পারছিলাম না। এমন ঠান্ডা কে অগ্রাহ্য করে ওরা সবুজ-লাল সালোয়ার কামিজ পরেছে । আহা একেই বলে দেশ প্রেম। আর আমি বন ভালুকের মত কালো রঙএর কাপড়ে যেন শোকের অনুষ্ঠান।

যা হোক অভিজাত পোশাক-সাজ সজ্জা আর ঠাস ঠাস করে দ্রুত ইংরেজি আওড়ে যাওয়া ভদ্র মহিলাদের দেখে বুঝলাম অবশ্যই আমার সবার পেছনে দাঁড়ানো উচিত। দরকার হলে আমি সিঁড়ি থেকে নেমে রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে  আমার সোনার বাংলা বলে চেঁচাব, কিন্তু এই সুন্দরী ললনাদের পাশে দাঁড়াবো না। এটা রেকর্ড হবে, সব মিডিয়াতে যাবে এবং নিউইয়র্ক ড্রিমস নামে একটি সংস্থার আবার ইউটিউবে আপলোড করার কথা। এদের পাশে দাঁড়ালে আমাকে  দেখাবে হরিজন সম্প্রদায়ের মত। এক পা দুপা করে পিছিয়ে অন্য সিঁড়িতে দাঁড়ালাম। আর চিং আমার সাথে এলো লাফাতে লাফাতে। ভাগ্য খারাপ হলে যা হয়, অভিজাত শ্রেণীর এক সুশ্রী এসে দাঁড়ালেন আমারই  সামনে। আমি মনোযোগ দিয়ে একটা জিনিস দেখছিলাম যেটা দেখার পর থেকে আমার ভেতরে তোলপাড় হচ্ছে। হাতের পতাকাটা।

পতাকার স্টিকের নীচে লেখা মেইড ইন চায়না। আমি বাংলাদেশের পতাকা হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছি অন্য মানুষের দেশে এটা আমার জন্য ভালোলাগার বিষয়, কিন্তু সেই আনন্দ পুরো নষ্ট হয়ে গেল যখন দেখলাম আমার পতাকা বানিয়েছে চায়না।

হটাত চিংয়ের চিৎকারে আমি ভাবনা থেকে বের হলাম। চিং এর চেঁচামেচি ছিল এরকম, ইয়া আল্লাহ শুনছিস এই মাইয়া কি খুঁজে? আমি বললাম, কোন মাইয়া? কি খুঁজে ? সে বললো, আমাদের সামনে দাঁড়ানো বাংলাদেশি মেয়েটা অনুষ্ঠানের একজন আয়োজককে জিজ্ঞেস করেছে, তার কাছে ইংরেজি ক্যাপিটালে লেখা আমার সোনার বাংলার কথাগুলো আছে কিনা? সে বাংলা পড়তে ভুলে গিয়েছে। চিং এই কথা শুনে মনে হলো ধাক্কা দিয়ে সেই সবুজ জামা-লাল স্যান্ডেল পরা মেয়েকে সিঁড়ি থেকে ফেলে দেবে। তবে তার আভিজাত্য দেখে সেটা না করে আমার কাছে অভিযোগ করলো চেঁচিয়ে। আমি ঘটনা বুঝতে কয়েক সেকেন্ড সময় নিলাম। এরপর ভালো মানুষ হওয়ার একটা চান্স নিয়ে ফেললাম, বললাম, আহা নিজের দেশের জাতীয় সঙ্গীত মুখস্থ নেই, বাংলা পড়তে  পারে না, তার মানে সে বাই বর্ন মার্কিনী। আহা আহা তবু বিদেশিনী আমার সোনার বাংলা গাইতে এসেছে এটাকি কম বড় দেশ প্রেমের কথা? ( নিজের উপস্থিত বুদ্ধিতে নিজেই মুগ্ধ আমি)।

আমার মনের ভেতর তখনো পতাকা নিয়ে কষ্টটা রয়েছে। আমি বাংলাদেশের পতাকা ধরে আছি যেটা বানিয়েছে চায়না। তবু এই ইংরেজি হরফে সোনার বাংলার কথা খুঁজতে চাওয়ার একটা ব্যখ্যা দিতে পেরে কিছুটা সান্ত্বনা পেলাম। আমার বন্ধু চিং মানলো কিনা জানিনা, ও গান শুরু হলে চিৎকার করে ‘সি’ স্কেলে গাইলো। ওর কণ্ঠ শুনে অন্যরাও দেখি তাকাচ্ছে আমাদের দিকে।

আমি বুঝেছি চিং কি বলতে চাইছে। চিং বাংলাদেশের পাহাড়ী অঞ্চলের মেয়ে। বান্দরবানের মানুষ চিং-এর ভাষা মারমা। ও আমার কথায় চুপ করেছে ঠিকই, কিন্তু সবার চেয়ে উঁচু গলায় জাতীয় সঙ্গীত গেয়ে বোঝাতে চাইছে, মারমা ভাষা-ভাষি হয়ে বাংলাদেশ থেকে আমেরিকা এসেও নির্ভুল উচ্চারণে না দেখে গাইতে পারি আর তুই আমাকে এর বাই বর্ন নিয়ে অযুহাত দিচ্ছিস। এই গান মনে রাখার জন্য বাংলা পড়তে জানতে হবে? তবে ভদ্রতা করে  চিং মুখে কিছু বললোনা।

সামনের ললনা এতক্ষণ সব কথা বলেছে ইংরেজিতে। বুঝলাম এ বাংলা বলতেও পারেনা, বোঝেওনা। আমি চিংকে বললাম, রাগ করিসনা মাফ করে দে, এই মেয়ে জন্মেছে এই দেশে, লিপস্টিকের স্টাইল, দাঁড়ানোর অঙ্গি দেখে বুঝিসনা? আকস্মিক সেই তরুণী সামনে থেকে আধো বাংলা আর আধো ইংলিশে যা বললো তার অর্থ, আমি কিন্তু বুঝতে পেরেছি তোমরা আমাকে নিয়ে কথা বলছো। আমি কয়েক বছর আগে চলে এসেছি এটা বুঝতে হবে। আমার তখন সিঁড়ি থেকে পড়ে যাওয়ার অবস্থা। তার মানে সে বাই বর্ন না। কয়েক বছর আগে এসেছে !!! প্রায় সমসাময়িক বয়সি হবে। আচ্ছা তবুও ধরে নিচ্ছি বছর পাঁচেক ছোট সেই সুশ্রী ললনা। ২৫ বছরের এক বাংলাদেশি মেয়ে কেমন করে ঠোঁটে গ্লস দিতে হয়, চোখে শেড, আইপ্যাড ব্যবহার, ইঙ্গিতে বাঁকা হয়ে দাঁড়িয়ে নিজেকে আকর্ষণীয় দেখানোর কৌশল সব জানে, শুধু জানেনা কোন আবেগ দিয়ে মনে রাখতে হয় আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি … শব্দ কয়টি।

আমাদের সাথে কয়েকজন স্প্যানিশ, আইরিশ ও আমেরিকানও ছিল। ওরা ওদের মত উচ্চারণে গাইলো আমাদের জাতীয় সঙ্গীত। একটুও কানে বাজেনি, একটুও খারাপ লাগেনি কারো। এমনকি পতাকা নেড়ে এতগুলো মানুষের একসাথে দাঁড়িয়ে গান গাওয়া দেখে টাইমস স্কয়ারে আসা বিভিন্ন দেশের পর্যটকরা পর্যন্ত জড়ো হয়েছে। নিজেদের ছবি তোলা বাদ দিয়ে এই গ্রুপের ছবি তুলেছে। আমার শুধু গলার কাছে কিছু একটা আটকে আসছিল যন্ত্রণায়।

Sadia Mahjabeen
সাদিয়া মাহজাবীন ইমাম

শুনেছি, যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় পতাকার দোকান একজন পাকিস্তানী শরণার্থীর। যুক্তরাষ্ট্রের রাস্তায় বিক্রি হওয়া ৭০ শতাংশ জিনিস চীনের অতএব বাংলাদেশের পতাকাও চীন থেকে এলে কার কি এলো গেলো!!! আশ্চর্য এ দেশে এত বিত্তবান সমর্থবান বাংলাদেশী রয়েছেন। প্রতিটি স্টেটে আছে বাংলাদেশে দূতাবাস, কনস্যুলেট যে অফিসগুলো বাংলাদেশের মানুষের ট্যাক্সের টাকায় পরিচালিত হয়, তারাও কি কিছু মনে করেন না? তাদের কাছে খারাপ লাগেনা নিজের দেশের পতাকা অন্য দেশ থেকে তৈরি হয়ে এলে?

নিউ ইয়র্ক বাংলাদেশ কনস্যুলেট অফিসে ২৬ মার্চ উপলক্ষে সন্ধ্যায় অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। কনস্যুলেট আমাদের বেশ কয়েকবার বলেছেন, মাত্র দেশ থেকে এসেছেন এখনো ঘ্রাণ আছে আপনাদের সাথে, প্লিজ চলে আসবেন ঠিক সাড়ে ছয়টায়। অবশ্যই লাল-সবুজ পোশাক মনে রাখবেন।

আসার সময় চারটি শাড়ি এনেছি নিজের জন্য। মা বলে খামোখা বোঝা বাড়াচ্ছো, দশ বছরে একদিনও দেখিনি, এখন তুমি ওই দেশে যেয়ে শাড়ী পরবে? বলেছি অবশ্যই আমি নিউইয়র্কের রাস্তায় লাল পাড়ের সবুজ শাড়ী পরে, চুল খুলে দিয়ে হাঁটবো। এতে কেউ আমাকে বলবে, সদ্য দেশ থেকে এসেছি বলে দেশ প্রেম দেখাচ্ছি। কেউ বলবে বুদ্ধিজীবী। কিছু যায় আসে না তাতে, আর সত্যিই তো, দূরে গেলে মানুষের বার্ডস আই ভিউ তৈরি হয়।

রেড স্টেয়ার্সে দাড়িয়ে আমার সোনার বাংলা গাইবার সময় মনে মনে একটাই প্রার্থনা করছিলাম, সৃষ্টিকর্তা আমার মৃত্যু যেন নিজের মাটিতে লিখে রাখেন। সন্ধ্যায় নিউইয়র্কের বাংলাদেশ কনস্যুলেট অফিসে নিশ্চই শাড়ী পরে অনেকে জাতীয় সঙ্গীত গেয়েছেন যাদের কেউ কেউ দু-তিন বছর ধরে আমেরিকায় আছেন বলে ইংরেজি বর্ণে লেখা জাতীয় সঙ্গীতের কথাও খুঁজেছেন। কিন্তু কারো হয়ত চোখে খারাপ লাগেনি পতাকার সাথে অন্য দেশের নাম থাকার মত বিষয়টি। আমি বরং ঘরে থাকাই উত্তম ভাবলাম।

যদিও এবার বাংলাদেশে জাতীয় সঙ্গীত নিয়ে দুটো দল তৈরি হয়েছে। লাখো কণ্ঠে জাতীয় সঙ্গীতের পক্ষে-বিপক্ষে অবস্থান। তাতে আমার মত অল্প বোঝা মানুষদের বিভ্রান্তি হয়েছে সত্যি, কিন্তু বাংলাদেশকে ভালোবাসার অনুভূতিতে কোথাও কম পরেনি। এখানে বসে বাংলাদেশের সময়ের জন্য অপেক্ষা করেছি। ২৬ মার্চ বাংলাদেশে  যখন জাতীয় সঙ্গীত গাওয়া হয়েছে ঘরে বসে সবুজ শাড়ী পরে টেলিভিশন খুলে  চিৎকার করে গেয়েছি আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি . . .

২৬ মার্চ ২০১৪
নিউ ইয়র্ক

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.