একাত্তরের নারীসত্ত্বা: অগ্নিশিখা ও অশ্রুবিন্দু (৬)

women-fightersমারুফ রসূল: বাঙালির মুক্তিযুদ্ধে বাঙালি নারী গৌরবজনক অবদান রেখেছেন। একদিকে দুর্জয় সাহসিকতায় যেমন তাঁরা অনন্য, তেমনি জরায়ুর জখমে তাঁরা যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা। এখানে আপোষের সুযোগ নেই। কোনো সুযোগ নেই। রাষ্ট্র কী করলো, কী করলো না- সেটা রাষ্ট্র এবং তার শাসকদের দায়-দায়িত্ব এবং নাগরিক হিসাবে আমরাও সে দায় এড়াতে পারবো না। তবে নারীর অবদানকে স্বীকার করে নেয়াটা হবে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের আরেকটা অবিসংবাদিত সংযোজন।

স্বাধীনতা অর্জন করা এবং রাষ্ট্র হয়ে ওঠা- এ দুটোর মাঝে পার্থক্য আছে। চল্লিশ বছরের বাংলাদেশ ধীরে ধীরে রাষ্ট্র হয়ে উঠছে। অনেক কিছুই ছিলো না, যা আবার নতুন করে তৈরি হচ্ছে। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে নানা গ্রন্থ রচিত হয়েছে, এবং এখনও হচ্ছে।

তবে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে আরও সবিস্তারিত গবেষণার প্রয়োজন। ব্যক্তিগতভাবে আমার প্রায়শই মনে হয়েছে শার্ল ব্যোদলেয়ার শ্রেষ্ঠ কবিতাগুলো লিখে গেছেন। ভাষার ব্যবহারের শ্রেষ্ঠত্বে সুধীন দত্ত শ্রেষ্ঠত্বের অনেক সীমানা ডিঙিয়ে গেছেন। টনি মরিসনের উপন্যাসে আমি শ্রেষ্ঠ একটা প্রেক্ষাপট পেয়েছি, শেক্সপীয়র পড়ার পর মনে হয়েছে নাটকের হাজারদুয়ারী ভালোবাসা সেখানে ডানা মেলেছে; রবীন্দ্রনাথ পড়ে দেখলাম, ছোটোগল্প নিয়ে মোপাসাঁর উত্তরসুরী হবার খেদটা আমার নেই। কেবল মুক্তিযুদ্ধের উপর পড়তে গিয়েই মনে হয়েছে- আমি সম্পূর্ণ নই, আমি যেনো কয়েক খণ্ডে খণ্ডিত। মুক্তিযুদ্ধে সাত কোটি বিপন্ন কোকিল গান গেয়েছিলো জয় বাংলা সুরে। সেই কোরাসে এদেশের নারীরাও ছিলেন। তাঁদের সম্মিলিত অংশগ্রহণেই রচিত হয়েছে ষোলই ডিসেম্বরের কাব্য। এ মহাকাব্যিক চেতনায় বাঙালি নারীরা ছিলেন এক একজন আলোকোজ্জ্বল মেটাফোর।

আমি সেই চেতনারই যোদ্ধা। একুশ শতকের বাঙালি তরুণ। একাত্তরের নারী মুক্তিযোদ্ধাদের পায়ের কাছে আমি প্রতিনিয়ত নিবেদন করি আমার প্রতিটি নিঃশ্বাস। ধীরে ধীরে বড়ো হই; হয়ে উঠি বাঙালি- সাতই মার্চের বিস্তীর্ণ করতলে আমি হয়ে উঠি এক ‘উন্নত শির’ বাঙালি। আমার বাঙালিত্বের ক্যানভাসে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ এক স্থির, ধ্রুপদী অহঙ্কার-প্রদীপ।

একই সঙ্গে আহত হই। খোঁজে ফিরি আমার মায়ের লাঞ্ছনার ইতিহাস। মুক্তিযুদ্ধ কেবল একটি ঘটনা মাত্র নয়, এটি এক আকাশের অনন্য নক্ষত্রবিথীকা। যে বর্বর নির্যাতন পাকিস্তানি সেনাবাহিনী এবং এদেশের কুলাঙ্গার বাঙালিরা করেছিলো বাঙালি নারীদের উপর, তার বিচার হচ্ছে। সম্প্রতি যুদ্ধাপরাধী কাদের মোল্লার সর্বোচ্চ শাস্তির রায় কার্যকর করা হলো। দায়মুক্তির ইতিহাস রচিত হচ্ছে।

আজ থেকে বিয়াল্লিশ বছর আগের কৃতকর্মের জন্য পাকিস্তান সরকার ক্ষমা চাইবে কি না, আমি জানি না; তবে কাদের মোল্লার সর্বোচ্চ শাস্তির রায় কার্যকরের পর পাকিস্তানি মহল যেভাবে প্রতিক্রিয়া জানাচ্ছে, তাতে হুমায়ুন আজাদ স্যারের এ কথাটা অন্তত প্রমাণিত হয় যে- পাকিস্তানিদের আমি বিশ্বাস করি না, এমনকি যখন তারা গোলাপ নিয়ে আসে, তখনও না। যে নির্মম নির্যাতনের দলিল একাত্তরে পাকিস্তানিরা রচনা করে গেছে বাঙালির মানচিত্রে, তার কোনো ক্ষমা নেই। বাংলাদেশ কোনোদিন ক্ষমা করবে না পাকিস্তানিদের, এমনকি রাষ্ট্রীয়ভাবে ক্ষমা প্রার্থনার পরও না। এ বক্তব্য শুনে যাদের ভ্রু কুঁচকে গেলো, তাদের বলছি- মুক্তিযুদ্ধের রক্তাক্ত ইতিহাসের পাটাতনে দাঁড়িয়ে আমি মানবতার সঙ্গীত গাইতে শিখিনি। আমার কাছে মানবতা মানে, মানুষের জন্য মমত্ববোধ; জাতিগতভাবে পশুত্ববোধ নিয়ে বেড়ে ওঠা কোনো পাকিস্তানির জন্য আমার ‘মানবতা’ নয়।

বিজয়ের এই অনন্য ক্ষণে আমি নিটোল স্বপ্নে দু চোখ ভরি। আমি গর্বিত হই এটা ভেবে যে, যুদ্ধাপরাধীদের সর্বোচ্চ শাস্তি বাস্তবায়নের ইতিহাস আমি দেখে যেতে পারছি। আমার ভবিষ্যতের বুনন ঘটে নীলছোঁয়া স্বপ্নের নকশিকাঁথায়, স্বপ্ন দেখি- আগামী কয়েক বছরের মধ্যেই ‘বাংলাদেশ ও মুক্তিযুদ্ধ’ হবে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ পাঁচটি রিসার্চ টপিকের একটি, অসাধারণ অত্যাধুনিক ও সহজলভ্য বিশাল একটি মুক্তিযুদ্ধের আর্কাইভ করা হবে, বাংলাদেশের প্রতিটি শিক্ষার্থী খেলার মাঠের অ্যাসেম্বলিতে দাঁড়িয়ে জাতীয় সঙ্গীত গাইবে একেবারে প্রাণের ভেতরের প্রাণ থেকে, বড়ো হবার সাথে সাথে প্রতিটি শিশু শিখবে মুক্তিযুদ্ধ আর বাংলাদেশের ইতিহাস, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিটি শিক্ষার্থী বাঙলা সাহিত্য পড়বেন মনের আনন্দে (প্রাগৈতিহাসিক বাতিল মূর্খদের মতো বলবে না- ওটা তো আমার সাবজেক্ট নয়), বাংলাদেশের প্রতিটি মায়ের কাছে তাঁর সন্তানের জন্য শ্রেষ্ঠ উপহার হবে বই- মুক্তিযুদ্ধের বই, চিরন্তন পাঠের স্থান হবে শহিদ মিনার-স্মৃতিসৌধ আর বধ্যভূমির পবিত্র মাটি।

Maruf Rasul
মারুফ রসূল

এরপরও যে সব অসামঞ্জস্যতা থাকবে সেগুলো এমনিই ধুয়ে যাবে। বাতিল হয়ে যাবে অপাঙতেয়রা। হারিয়ে যাবে বিভৎস কালো রাত। প্রকৃতির অমোঘ নিয়মে হারিয়ে যাবে আমাদের মতো সাধারণ মানুষরা। নতুন শিশুর জন্য ছেড়ে দিতে হবে স্থান। হারিয়ে যাবো আমিও, নিয়ম মেনে চলে যাবো না-ফেরার দেশে। তবুও বাংলাদেশ থাকবে। তবুও সত্যের অপরূপ পোট্রেট হয়ে থাকবে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস। বাংলাদেশ- আমার প্রিয়তম মাতৃভূমি। মুক্তিযুদ্ধ- আমার প্রাণের বারান্দায় এক চিলতে দুর্লভ রোদ্দুর।

সে-ই অনাগত প্রজন্মের শাণিত মেধায় বাংলাদেশ স্নাত হবে। যে রকম মাঘের কুয়াশায় স্নাত হতো জীবনানন্দের হৃদয়।

(শেষ পর্ব)

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.