রোজ নামচা- ১১

Leena with Valerie
ভ্যালেরির সাথে লীনা হক

লীনা হক: ভ্যালেরিয়া বয়াত্তি- আমার সহকর্মী। ইতালির মিলানের শহরতলীতে জন্ম। গ্রাজুয়েশন করেছে ইতালি থেকে ইকনমিক্স আর পলিটিক্সে। সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজে মাস্টার্স করেছে ইংল্যান্ড থেকে। ভ্যালেরিয়া অতি চমৎকার একজন মানুষ। সব সময় হাসি খুশি প্রাণবন্ত।

পেশায় ট্রেনিং স্পেশালিস্ট। প্রায় ২০ বছরের কাছাকাছি তার কাজের অভিজ্ঞতা। অনেক বড় বড় ইন্টারন্যাশনাল এনজিওতে কাজ করেছে। কাজ করেছে আফ্রিকার অনেক দেশে, লাতিন আমেরিকায়। এখন বেশ কয়েক বছর চাকরি ছেড়ে দিয়ে কনসালটেন্সি করছে। বর্তমানে ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের হিউম্যানিটেরিয়ান ডিপার্টমেন্টের ট্রেনিং কনসালটেনট হিসেবে দেশে দেশে ট্রেনিং পরিচালনা করছে।

ভ্যালেরিয়ার সাথে আমার পরিচয় ২০০৯ থেকে। সে বেশ কিছুদিন আমার সহকর্মীও ছিল। আমাদের মধ্যে খুব দ্রুতই বন্ধুত্ব তৈরি হয়ে যায়। এই বার দিল্লীতে দেখা ভ্যালেরিয়ার সাথে প্রায় আড়াই বছর পরে। সে এসেছে ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের নুতন নীতিমালা সম্পর্কে আমাদেরকে অবহিত করতে। একসাথে পুরো সপ্তাহ। ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের আয়োজনে এই ওয়ার্কশপ টিতে আরও বিভিন্ন দেশের সহকর্মীরা ছিল- মিয়ানমার, নেপাল, ইন্ডিয়া, তাজিকিস্তান,  কিরঘিজস্তান, শ্রীলংকা, আফগানিস্তান, ডেনমার্ক, ব্রাসেলসের। শুধু পাকিস্তান থেকে সহকর্মীরা আসতে পারে নাই ভিসা সমস্যার কারণে।

ওয়ার্কশপের শেষে আমি আর ভ্যালেরিয়া অন্য সহকর্মীদের সাথে বের হই বাইরে, যাই দিল্লী দেখতে অথবা শপিং করতে কিংবা কফি বা দিল্লির স্ট্রিট ফুড টেস্ট করতে, তারপরে কিভাবে যেন আমরা দুইজন আলাদা হয়ে যাই। দ্বিতীয় দিন থেকেই সবাই ঠাট্টা করতে শুরু করলো- সিয়ামিজ টুইন! ভ্যালেরিয়ার ভাষায়, এটা হচ্ছে সিস্টারহুড বন্ডেজ। দেশ, জাতি, ভাষা, কালচার সবকিছু ছাপিয়ে এই বন্ধন। কি যাতনা বিষে বুঝিবে সে কিসে, কভু আশি বিষে দংশেনি যারে! ভ্যালেরিয়া থাকে ব্রাসেলসে তার দুই ছেলেকে নিয়ে। বড় ছেলে ১৬ বছর বয়সী আইজ্যাক আর ছোট ছেলে ১১ বছরের জ্যালাক। জ্যালাক ভ্যালেরিয়ার নিজের ছেলে। জ্যালাকের বাবা গুয়াতেমালার অধিবাসী। আর আইজ্যাক হচ্ছে ভ্যালেরিয়ার দ্বিতীয় স্বামী’র প্রথম স্ত্রীর সন্তান। দ্বিতীয় স্বামী কঙ্গো’ র নাগরিক। দ্বিতীয় স্বামীর সাথেও ভ্যালেরিয়ার ডিভোর্স হয়ে গেছে আর প্রায় দুই বছর। কিন্তু আইজ্যাক রয়ে গেছে ভ্যালেরিয়ার সাথে, কারণ তার বাবা তাকে সাথে নেয়নি আর তার নিজের মা কোথায় থাকে তাও তারা জানে না।

প্রশ্ন চোখে তার দিকে তাকালে ভ্যালেরিয়া হাসে,” হোয়াট কুড আই ডু মাই ডিয়ার! কান্ট এব্যানডণ্ড দ্যা বয়, ক্যান আই? তুমি কি পারতে?” মাথা নাড়ি, “জানি না ভ্যালেরিয়া, হয়ত পারতাম, হয়তো পারতাম না, কে জানে। তবে তুমি যা করছ তা কি বলে বর্ণনা করবো জানি না।” জোরে হেসে উঠে হাত ধরে টেনে নিয়ে চলে আমাকে ফুচকার দোকানের সামনে। মধ্য চল্লিশের ভ্যালেরিয়া যথেষ্ট আকর্ষণীয়া। চমৎকার মনের অধিকারী। ঝরঝরে তার ইংরেজি। যেকোনো বিষয় নিয়ে তার সাথে ঘণ্টার পর ঘণ্টা আলাপ করা যায়। ভাল রোজগার করে।

কিন্তু ঘর কেন হোল না ঠিকঠাক? “পাগল তুমি” বলে আমাকে সে ” ঠিক ঠাক ঘরের জন্য ঠিক ঠাক মানুষ যে চাই, জানো না সেটা?” ‘ দুজনের মধ্যে কেউই কি ঠিক ঠাক ছিল না তোমার জন্য? তাহলে প্রেমে পড়লে কেন?” আবার সেই ভাইব্রেটিং হাসি,’ আরে বোকা, প্রেমের জোয়ার এসেছিল বলেই হয়তো প্রেমে পড়েছিলাম, হিসেব তো করি নাই! হিসেব করলে কি আর ভুল করি তাও আবার দুই দুই বার! হোয়েন সামবডি ফলস ইন লাভ, হি অর শি জাস্ট ফল মাই ডার্লিং, মাথার ভিতরের ক্যালকুলেটর থাকলেও হার্টের ৪৪০ ভোল্টেজের তোড়ে তা বিকল হয়ে যায়!”

হাসি আমিও। ঠিকই বলেছে সে। একলা জীবন কষ্টের বইকি। বাংলাদেশে, কি ব্রাসেলসে মোটামুটি একই। বাজার করা, রান্না করা, ছেলেদের স্কুল ম্যানেজ করা, আবার টাকা পয়সার জোগান ঠিক রাখা সবই তাকে একা হাতে করতে হয়। ‘তবু ভাল, সারাদিন কাজের শেষে ঘরে ফিরে খিচ খিচ আর অশান্তি মানুষ কতদিন সহ্য করতে পারে! একা থাকার কষ্ট আছে, কিন্তু শান্তিও আছে। দিনের শেষে আমার প্রফেশনাল ক্যারিয়ার নিয়ে অপমানজনক কথা হজম করতে হবে না।”

ভ্যালেরিয়ার প্রথম স্বামী ছিল ফটোগ্রাফার, পেশায় ভাল করতে পারছিল না সে, জেরটা এসে পড়ছিল ভ্যালেরিয়ার উপরে। কথা বার্তা ছাড়াই একদিন সে ফিরে যায় গুয়াতেমালায়। ‘ভাগ্যিস ছেলেকে দাবি করে নাই সে। অবশ্য কোনদিন খবরও করে না ছেলের।” দ্বিতীয় স্বামী ভ্যালেরিয়াকে ইউরোপে আইনগতভাবে বসবাসের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করেছিল, যা সে অনেক পরে বুঝতে পেরেছিল যখন একদিন কাজের শেষে তাড়াতাড়ি ঘরে ফিরে নিজের বিছানায় অন্য নারীর সাথে স্বামীকে পেয়েছিল।

সেই থেকে ভ্যালেরিয়া একা থাকে। যদি মনের মতো কাউকে পায়, সঙ্গী হিসাবে বিবেচনা করবে হয়তো, কিন্তু ঘর করার স্বপ্ন তার আর নাই। ‘সংসার আমার নিয়তিতে নাই। ছেলেদের নিয়ে ভাল আছি। শুধু যখন ব্রাসেলসের বাইরে যেতে হয়, ছেলেদের কে বন্ধুদের ভরসায় রেখে যেতে হয়। এটাই কষ্ট। তবে আমার ছেলেরা আমাকে বড় ভালবাসে। বড়টা আমাকে অনেক কাজে সাহায্য করে। আমি চুপচাপ থাকলে এসে জানতে চায় , মা কি হয়েছে!”

আমার নিজের ছেলের কথা মনে পড়ে, দেশে থাকতে কত কাজে আমার সাহায্য করত যাদু আমার। ভ্যালেরিয়ার সাথে সময় কাটানোর সুফল হচ্ছে জীবনকে এত পজিটিভ দৃষ্টি দিয়ে সে দেখে যে আমি খুব অনুপ্রাণিত হই। জীবনের ধন কিছুই যাবে না ফেলা-এটাই তার জীবনের মূলমন্ত্র। শপিং এ গিয়ে ছেলেদের জন্য রাজ্যের কেনা কাটা করে ভ্যালেরিয়া। আমিও কিছু কিনি আমার কন্যার জন্য। দুই বন্ধু আবার একই রকম কুর্তা কিনি নিজেদের জন্য। আমি তাকে একটা উপহার দিলে সেও আবার আমার জন্য আরেকটা কিনে। নিজেরাই হাসি আমরা। হোটেলে ফিরে সেই সব জিনিস খুলে খুলে বিছানার উপরে সাজিয়ে রেখে ডেকে দেখাই একজন আরেকজনকে। চলে আসার আগের রাতে গভীর রাত পর্যন্ত সুইমিং পুলের পাশে বসে বসে গল্প করি।

কাজের কথা, অকাজের কথা, হাসি আবার ইমোশনাল হয়ে চোখ ভিজিয়ে ফেলি। ভোরে ভ্যালেরিয়ার ফ্লাইট, শেষ রাতে এয়ারপোর্টে যেতে হবে তাকে। বিদায় বলে যার যার রুমে চলে আসি। ঘুম আসে না চোখে আমার। এক সময় ঘড়ি দেখি ভোর ৩টা বাজে, ভ্যালেরিয়া এখুনি রওনা হবে, নক করি তার দরজায়, টোকা দিতেই দরজা খুলে সে বলে আমিও ভাবছিলাম তোমাকে কল করবো। হোটেলের কর্মী তার সুটকেস নিচে নামিয়ে নিয়ে যায়। লিফটের সামনে একজন আরেকজনকে জড়িয়ে ধরি।

‘ভাল থেকো বন্ধু আমার। আবার দেখা হবে। বুওন আমিকো আদ্দিও …দাল্লা…বেনে…!

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.