না সংসারী, না সাংবাদিক

0
Monija Rahman

মনিজা রহমান

মনিজা রহমান: আমি খুব ভুলোমনা। কেউ কিছু রাখতে দিলে সযতনে তুলে রাখি। পরক্ষণেই ভুলে যাই। ফেরত চাইলে গলার স্বর যথাসম্ভব কোমল করে বলি, জানোই তো আমি একটু দার্শনিক স্বভাবের। ভাবুক প্রকৃতির। একটু সময় লাগছে। মনে ঠিক পড়বেই।

আমি খুবই ভুলোমনা। কাউকে ডাকতে গেলে নাম ভুলে যাই। বহুবার গিয়েও জায়গা চিনতে পারি না। তর্ক করতে গেলে প্রয়োজনীয় তথ্য মনে পড়ে না।

এমন ভাবুক স্বভাবের মানুষ সাংবাদিক হিসেবে একদম মানানসই নয়। আমি পড়েছি অর্থনীতিতে। দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। পড়া শেষে আমার সহপাঠিরা যখন উজ্জ্বল থেকে উজ্জ্বলতর, আমি হয়ে গেলাম স্পোর্টস রিপোর্টার। অর্থনীতিতে পড়ে ক্রীড়া সাংবাদিকতার মতো নারীদের এমন অপ্রচলিত পেশায়, আমার আগে বা পরে কেউ আসেনি এখনও। কোনদিন আসবে কিনা সন্দেহ আছে!

আমার সব কিছুই কেমন যেন সৃষ্টিছাড়া। স্কুলে পড়ার সময় কচিকাঁচার সাথী বোন ছিলাম। কলেজে উঠে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের কলেজ কর্মসূচীতে যোগ দিলাম। সেই কোথায় ধুপখোলা মাঠ থেকে বাংলামটর! সপ্তপদীর কৃষ্ণেন্দু আর কবি উপন্যাসের নিতাইচরণে এমনই মজলাম যে বলার মতো নয়। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে গিয়ে আবার জড়ালাম কণ্ঠশীলনে।

অথচ আমার এসব না করলে চলতো। পাড়ার সব মেয়ের মতো বিকেলবেলা ছাদে ঘুরে, নতুবা ভিসিআরে নতুন হিন্দি সিনেমা দেখে সময় কাটিয়ে দিতে পারতাম। কিন্তু সৃষ্টিছাড়া স্বভাবটাই সব এলোমেলো করে দিল।

গেন্ডারিয়ায় আমি যে স্কুলে পড়তাম সেই স্কুলে এক সময় শাবানা, ববিতা, সুচন্দা, চম্পা পড়েছিল। এই নিয়ে আমার চাপা গর্ব ছিল। আত্নীয়স্বজনদের সুযোগ পেলেই বলতাম সেটা। আমাদের স্কুলের তিন তলা ভবনের চারপাশে ছিল অনেকগুলি আম গাছ। সেই আম দিয়ে নিজের হাতে আচার বানিয়ে ছাত্রীদের খাওয়াতেন হেডমিস্ট্রেস (বাসন্তী গুহ ঠাকুরতা) আপা। এমন স্কুল পৃথিবীতে খুব কমই আছে, যার আনাচে কানাচে নির্বিবাদে বানররা ঘুরে বেড়ায়। পাশেই সাধনা ঔষধালয়ের মালিকদের পোষা বানর ছিল ওরা।

যখন স্কুল ছাড়লাম, খুব কান্না পেয়েছিল। তখন বুঝতে পারিনি, সম্পর্ক যত গভীরই হোক.. এক সময় সব কিছু ছেড়ে যেতে হয়। হাটখোলায় সেন্ট্রাল জেলের মতো কলেজটির জন্য অতখানি মায়া লাগেনি। হয়তো মাত্র দুই বছর ছিলাম বলে। আর বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ শেষ মানে তো নিজের জীবনের একটি অধ্যায়ের সমাপ্তি। সেটা হল ছাত্রজীবন।

ছাত্রজীবনেই চাকরি পেয়ে গেলাম। পাঠকের পাতার লেখক হিসেবে ক্রীড়ালোকে লেখার সুযোগ পেয়েছিলাম। সেই সূত্র ধরে সাক্ষাতকার দিয়ে যোগ দিলাম মানবজমিনে। তারপর একযুগ জনকণ্ঠে। সেখান থেকে ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশনে।

দেশের প্রথম নারী স্পোর্টস রিপোর্টার হওয়া কিংবা প্রথম নারী সাংবাদিক হিসেবে বিদেশে পুরুষ ফুটবল, ক্রিকেট, হকি টুর্নামেন্ট কভার করা ছাড়া আমার আর কোন অর্জন নেই। প্রথমে যারা পথে নামে বা পথ দেখায়… এইটুকুই। এর বাইরে প্রাপ্তির খাতা শূন্য। বিশ্বকাপ ফুটবল কিংবা অলিম্পিক গেমসের মহাযজ্ঞে নিজেকে দেখার সুযোগ হয়নি।

নারী সাংবাদিক এই বিশেষায়ণে ব্র্যাকেটবন্দী হয়ে থাকার মধ্যে গর্ব করার আদৌ কিছু আছে কি? জীবনে কত শত বার যে শুনতে হয়েছে… ‘আপনারা এখন কতজন আছেন?’ তুলনা হয়েছে কেবল নারী সাংবাদিক হিসেবে। সাংবাদিক হিসেবে মূল্যায়ন করেছে কতজন! কেউ ভাবেনি, কেউ খোঁজ নেয়নি…… রান্না-বান্নাসহ সংসারের যাবতীয় কাজ, সন্তানকে গোসল করানো-খাওয়ানো পর্ব শেষ করে একজন মানুষ কিভাবে মাঠে আসে খেলা কভার করতে! শুরুর দিকে বহু বহু দিন গেছে পুরো প্রেসবক্সে সবাই পুরুষ.. মাঠে খেলছে পুরুষরা… গ্যালারি ভর্তি দর্শক পুরুষ… শুধু আমি একা নারী কাজ করেছি।

জীবন আমাকে বার বার পিছিয়ে দিয়েছে। আর আমি প্রতিবারই মাথা তুলে দাঁড়াতে চেয়েছি।

২০০৩ সালের ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহটা আমি কোনদিন ভুলব না। এত শীত পড়েছিল সে সময় যে বলার নয়। আমার জীবনের সমস্ত বিশ্বাস আর স্বপ্ন এসেছিল সেই শীতের দুপুরে এক খণ্ড মাংসপিন্ড হয়ে। থাকবে না বলেই হয়ত সে এসেছিল পৃথিবীর সব সৌন্দর্য্য নিয়ে। জন্মাবার তিন দিনের মাথায় সে চলে গেল আমার বুক শূন্য করে দিয়ে।

ঠিক দেড় বছরের মাথায় ঘটল আরেকটি দুর্ঘটনা। আমার এবার প্রেগন্যান্সি জন্ডিস ধরা পড়ল। সন্তান ও আমার দুজনের জীবনই বিপন্ন। অবশেষে সৃষ্টিকর্তা আমাকে ১৬০০ গ্রামের একটি মানবশিশু দিল। দশ দিন পরে যার ওজন হল ১৩০০ গ্রাম। শিশুটির কোন নাম ছিল না। বারডেম হাসপাতালের স্কাবুতে থাকতো ও দিন-রাত। আমি থাকতাম বাসায়। দু:স্বপ্ন দেখে মাঝরাতে ঘুম ভেঙ্গে যেত। হাসপাতালে ফোন করে বলতাম, ‘ডাক্তার আমি আট নম্বর বেবির মা বলছি.. ও কেমন আছে? ঠিকভাবে শ্বাস নিতে পারছে তো? এখন ওর অক্সিজেনের মাত্রা কত?’

এভাবে বিনিদ্র রাত আর কষ্টকর দিন পার হতে লাগলো। দ্বিতীয়বারের মতো আরেকটি দু:সংবাদকে কোনভাবে মেনে নিতে চাইতো না মন। সারাক্ষণ প্রার্থনা করতাম সৃষ্টিকর্তার কাছে, আল্লাহ আমার সন্তানকে ভালো করে দাও। মনে হতো আমি এক বিচ্ছিন্ন দ্বীপের বাসিন্দা। আর কোনদিন আমি ফিরতে পারবো না জীবনের মূলস্রোতে।

মহাকালের হিসেবে খুব সামান্য সময়। কিন্তু আমার জীবনের সবচেয়ে কষ্টকর সেই ৫৩ দিন। অবশেষে ৫৩ দিন পরে সৃষ্টিকর্তা মুখ তুলে তাকালেন। দুই কেজি ওজনের প্রায় দুই মাস বয়সী এক মানব সন্তানকে নিয়ে শুরু হল এরপরের যুদ্ধ।

তৃতীয় সন্তান নিতে আমাকে কেউ উৎসাহিত করেনি। দুইবারের তিক্ত স্মৃতি ভোলা সত্যি কঠিন ছিল। আমি একাই সাহস করলাম।

তখন ২০১০ সালের ঢাকা এসএ গেমস চলছিল। আমি গেমসের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের রিপোর্টসহ বেশ কয়েকদিন মাঠে গেলাম। সারাদিন অফিস করে সাত ফেব্রুয়ারি রাতে ভর্তি হলাম হাসপাতালে। স্কয়ার হাসপাতালে বিশাল টিভিতে দেখলাম বাংলাদেশ ক্রিকেটে স্বর্ণ জিতেছে। আর যেদিন সন্তান হলো, ফুটবলে স্বর্ণ জিতল লাল-সবুজরা। ভাবলাম আমার সন্তান হবে গোল্ডেন বয়। সেরকমই ছিল। এই প্রথম টেনশন আর দুশ্চিন্তা ভরা মুখের পরিবর্তে দেখলাম প্রিয়জনদের হাসি মুখ। এই প্রথম জন্মানোর কিছুক্ষণের মধ্যে সন্তানের সঙ্গে আমার ছবি তোলা হল, ভিডিও করা হলো।

ভাবলাম, আমার জীবনের সুদিন এসে গেছে। সুসময় বুঝি এভাবেই আসে। আমার মতো সুখী আর কে আছে!

বিধাতা অলক্ষ্যে হাসলেন। আমার ছোট সন্তানের যখন আড়াই বছর, ডাক্তার জানালো ও আর দশটা সাধারণ শিশুর মতো নয়। ও মানসিকভাবে আলাদা। চেহারা দেখে যেটা বোঝা যায় না। ওকে সময় দিতে হবে প্রচুর। আর সেটা মা হিসেবে আপনাকেই করতে হবে। কারণ আমাদের সমাজ মায়েদের ত্যাগকেই স্বাভাবিক হিসেবে ধরে নেয়।

আমাকেই সময় দিতে হবে। আমি তখন দেশের প্রথম নারী স্পোর্টস ইনচার্জ হিসেবে জীবনে কিছুটা সাফল্যের স্বাদ পেয়েছি। আমি সিদ্ধান্ত নিতে পারছিলাম না। এক সময় বুঝলাম এভাবে সিদ্ধান্তহীনতায় ভোগার চেয়ে ভুল সিদ্ধান্ত নেয়াও ভালো।

আমি শর্ত সাপেক্ষে চাকরি ছাড়লাম। এভাবে চলতে লাগলো দিন। আমার বড় শিশু আগের চেয়ে পরীক্ষায় ভালো ফলাফল করলো। ছোটজনের আগের চেয়ে উন্নতি হয়েছে। ডাক্তার বলেছে, ও হয়তো হতে পারে কোন যুগান্তকারী প্রতিভা! সেই আশায় বুক বেঁধেছি। আমি আবার প্রস্তুত হচ্ছি প্রিয় পরিমণ্ডলে ফেরার।

আমি জানি, আমাকে অনেকে ভুল বোঝে। সেটা আমারই দোষ। আমি তাদেরকে ঠিকভাবে বোঝাতে পারিনি। আমি জানি যে … আমার জন্য কোথাও কেউ অপেক্ষা করে নেই। কোন কিছু থেমে নেই আমার জন্য। তবু আমি হাসি মুখে দাঁড়াই এসে সবার দুয়ারে।

আগেই বলেছিলাম আমি খুব ভুলোমনা। ভাবুক স্বভাবের। অন্যের চোখে যেটা দোষ, আমার কাছে সেটাই কেন যেন খুব প্রিয়। হয়ত সৃষ্টিছাড়া বলেই। মা যেমন তার অসুন্দর সন্তানকে সবচেয়ে বেশী ভালোবাসে.. আমার তেমনি দোষগুলির প্রতিই বেশী পক্ষপাত।

নিয়তির ঢেউ বার বার দূরে সরিয়ে দেয়। আমি আবার ভেসে চলে আসি। আর ভুলোমনা বলেই হয়ত ভুলে যাই সব কিছু। জীবনের সব দু:খ, অপ্রাপ্তি…বঞ্চনাকে…।

মনিজা রহমান, নির্বাহী সম্পাদক, খেলার ভুবন

(লেখাটি এবছর রিপোর্টার্স ইউনিটি থেকে ৮ মার্চ উপলক্ষে প্রকাশিত কণ্ঠস্বর এ ছাপা হয়েছে)

 

 

শেয়ার করুন:
  • 1
  •  
  •  
  •  
  •  
    1
    Share

লেখাটি ২৩১ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.