কালি, কলম আর লেন্সে যাদের জীবন গাঁথা

women journalistঝর্ণা মনি: দৃশ্যপট-১। ২০০৬ সালের ২ মার্চ। রাত দু’টা। কুখ্যাত জঙ্গী নেতা শায়খ আব্দুর রহমানকে গ্রেপ্তারের জন্য সিলেটের সূর্যদীঘল বাড়ির চারপাশ ঘিরে রেখেছেন আইনশৃংখলা বাহিনীর সদস্যরা। এত রাতে আরামের ঘুম হারাম করে ক্যামেরা তাক করে দাঁড়িয়ে আছেন এক নারী আলোকচিত্রী। হঠাৎ আইনশৃংখলা বাহিনীর এক সদস্যের দৃষ্টি যায় তার দিকে। সহাস্যে মন্তব্য করেন, এত রাতে এখানে লেডি কেন? কি করে?
দৃশ্যপট-২
ডেডলাইন ২৫ ফেব্রুয়ারি, ২০০৯। রাজধানীর পিলখানার বিডিআর সদরদপ্তরে চলছে নারকীয় হত্যাকান্ড। বৃষ্টির মতো ধেয়ে আসা গুলি, গ্রেনেড আর টিয়ার গ্যাসকে উপেক্ষা করে মাইক্রোফোন, ক্যামেরা, কাগজ-কলম হাতে দাঁড়িয়ে রয়েছেন কয়েক জন নারী সাংবাদিক। একটু সংবাদ পেলেই মুর্হুতের মধ্যে জানিয়ে দিচ্ছেন দেশবাসীকে।
দৃশ্যপট-৩
২৪ এপ্রিল ২০১৩। স্মরণকালের ভয়াবহ ট্র্যাজেডি ঢাকার অদূরে সাভারের রানাপ্লাজা ধস। আহতদের আর্তচিৎকারে ভারি সেখানকার পরিবেশ। গোটা জাতির দৃষ্টি সেখানে। আর জাতিকে প্রতিমুর্হুতের সংবাদ জানাতে পুরুষ সহকর্মীর পাশাপাশি উপস্থিত ছিলেন প্রিন্ট ও ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ার নারী সাংবাদিকরা।
দৃশ্যপট-৪
এটি ২০১৩ সালের ৬ এপ্রিলের ঘটনা। রাজধানীর শাপলা চত্বরে ধর্মীয় মৌলবাদী সংগঠন হেফাজতে ইসলামের সমাবেশে পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে লাঞ্ছিত হন এক নারী সাংবাদিক। হেফাজতে ইসলামের কর্মীরা তাকে শুধু নারী বলেই সমাবেশস্থলে কয়েকদফা বেধড়ক পিটিয়ে আহত করে।
উপরের বাস্তব ঘটনাগুলোই প্রমাণ করে অদম্য সাহস আর মনোবল নিয়ে ঘর ছেড়ে কাজে বের হওয়া এসব নারীর কাছে পেশাই মূখ্য।

জীবন ও জীবিকার তাগিদে নয় বরং পেশাগত দায়িত্ব পালনে বদ্ধ পরিকর নারী সাংবাদিকরা কন্টকাকীর্ণ পথেই হেঁটে যাচ্ছেন মাইলের পর মাইল। অন্যান্য আট/দশটা পেশার মতো সকাল-সন্ধ্যা ডিউটি বা এসি করা রুমে বসে ফাইল দেখা নয়, শুধু নামী দামি সেমিনার কক্ষে বসে আলোচনা করা নয়, নারী সাংবাদিকের জীবন গাঁথা কালি, কলম আর লেন্সে। সময় বাঁধা পড়েছে সমাজের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ কাজে।

বাংলাদেশে সাংবাদিকতায় নারীর পদচারণা শুরু হয় মূলত ব্রিটিশ শাসনামলে। ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশদের হাত থেকে স্বাধীনতা পাওয়ার প্রায় এক মাস আগে বেগম পত্রিকার প্রকাশনা শুরু হয়। এই সাময়িকীর সম্পাদক নুরজাহান বেগমের হাত ধরেই নারীরা মূলত সংবাদপত্রের জগতে প্রবেশ করে। তবে প্রকৃত অর্থে নিউজ রুমে নারীর কাজ শুরু আরও পরে।

আশির দশকে বেশ কয়েকটি সাময়িকী ও পত্রিকায় রিপোর্টিংয়ে আসেন নারীরা। তবে নব্বইয়ের দশকে বাংলাদেশে গণমাধ্যম বিপ্লবের আগ পর্যন্ত সেই অর্থে সাংবাদিকতায় নারীর দেখা মেলে না। এখন টেলিভিশন ও পত্রপত্রিকা মিলিয়ে শতাধিক সংবাদ প্রতিষ্ঠানে কাজ করছেন নারীরা। তাদের সংখ্যাও খুব একটা নগণ্য নয়। যদিও পুরুষ সাংবাদিকের অনুপাতে নারী সাংবাদিকের সংখ্যা এখনও কম।

প্রতিনিয়তই সাংবাদিকতায় নতুন নারীর অংশগ্রহণ এবং চাকরি ছাড়ার ঘটনা ঘটায়, নারী সাংবাদিকের সঠিক সংখ্যা জানা সম্ভব হয়নি। তবে বাংলাদেশে সাংবাদিকদের মধ্যে নারীর সংখ্যা শতকরা প্রায় পাঁচ ভাগ বলে ধারণা করেছেন কর্মরত সাংবাদিকরা। আর পুরুষপ্রধান এই ক্ষেত্রটিতে পেশাগত, মনস্তাত্ত্বিক, সামাজিক, পারিবারিক ও পারিপার্শ্বিক নানা সমস্যা মোকাবেলা করেই টিকে থাকতে হচ্ছে নারীদের। সংবাদ মাধ্যমে প্রবেশ করতে যেমন তাদের বেগ পেতে হচ্ছে, তেমনি টিকে থাকার জন্য লড়ে যেতে হচ্ছে অদৃশ্য এক যুদ্ধ। বাংলাদেশের সংবিধানে পেশা বৃত্তির স্বাধীনতা নিশ্চিত করা হয়েছে। কিন্তু তারপরও নারী নিজের আসন এখনও পাকা করতে পারেনি সাংবাদিকতার পুরুষপ্রধান ক্ষেত্রে।

তবে স্বাধীনতা পূর্বকালে একজন নারী যেখানে ঘরের বাইরে যাবার কথাই ভাবতে পারত না, নানাবিধ সামাজিক শৃঙ্খলে বাধা ছিল তাদের গতি। স্বাধীনতা উত্তরকালে সেখানে সর্বক্ষেত্রের মতো গণমাধ্যমেও নারীর অংশগ্রহণ পরিলক্ষিত হচ্ছে এবং নারী সেখানে যোগ্যতা প্রদর্শনে সাফল্য অর্জন করছে। পূর্বে রির্পোটিং-এও নারীর অংশগ্রহণ ছিল সীমিত। বর্তমানে রাজনীতি, সংসদ, অপরাধ, খনিজ, জ্বালানি, অর্থনীতি এবং স্পোর্টস রির্পোটিং-এ নারী দক্ষতার পরিচয় দিচ্ছে।

এক সময় নারী সাংবাদিকতাকে নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখা হতো। এ পেশাতে নারীর অংশগ্রহণ ছিলো নানাবিধ সামাজিক ও পারিবারিক প্রতিবন্ধকতা। বর্তমানে অনেক বেসরকারী রেডিও-টেলিভিশন চ্যানেল প্রতিষ্ঠার কারণে নারী সাংবাদিকগণ যোগ্য কর্মীর পারঙ্গমতা প্রদর্শনে সক্ষম হয়েছেন। ফলে সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গীরও ধীরে ধীরে পরিবর্তন ঘটছে।

Jharna Moni
ঝরণা মনি

অবশ্য নারী সাংবাদিকরাও নির্যাতনের বাইরে নয়। তাদের যুদ্ধ করতে হচ্ছে ঘরে-বাইরে সর্বত্র। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে নারী সাংবাদিকরা কাজ করছেন। অফিসে বৈষম্য, কখনো কখনো যৌন হয়রানির বিষয়টিও রয়েছে। আবার সংসারের বিরাট দায়িত্বের বোঝাও নারীর ঘাড়ে। এসব কিছুর পর এ পেশাকে তারা চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়েছেন এবং পেশাবোধকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন। কালি, কলম আর লেন্সের মর্যাদার সঙ্গে অভিন্ন করেছেন নিজেকে।

ঝর্ণা মনি, দৈনিক ভোরের কাগজ।

(লেখাটি রিপোর্টার্স ইউনিটি থেকে প্রকাশিত কণ্ঠস্বর এর এবারের বিশেষ নারী সংখ্যায় ছাপা হয়েছে)

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.