মেয়েকে বাঁচাতে মা যখন ঘাতক

maaউইমেন চ্যাপ্টার: নিজের কিশোরী কন্যাকে রক্ষা করতে গিয়ে শেষপর্যন্ত উত্যক্তকারীকে খুন করে আলোচনার কেন্দ্রে এসেছেন এক দরিদ্র মা। খাদিজা বেগম (৪৫) নামের ওই নারীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। আইনের চোখে তিনি দোষীসাব্যস্ত হলেও সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমগুলোতে তার পক্ষেই দাঁড়িয়েছেন সবাই। বলছেন, ঘরে ঘরে এমন ঘাতক মায়েদের প্রয়োজন এখন সমাজ থেকে ব্যাধি দূর করতে। সবাই তাঁকে আইনের আওতামুক্ত রাখারও আহ্বান জানিয়েছেন।

পুলিশ ও উপস্থিত সাংবাদিকদের কাছে খাদিজা বেগম বলেন, পুলিশ ও প্রভাবশালীদের দুয়ারে দুয়ারে ঘুরেছি।  আশ্বাস দিলেও কেউই সাহায্যের হাত বাড়ায়নি। শেষটায় বাধ্য হয়ে নিজেই সব বিচারের ভার কাঁধে তুলে নিয়ে ঘাতক হতে বাধ্য হয়েছি। মা হয়ে মেয়েকে রক্ষা করতো পারব না?- এ যন্ত্রণা আমাকে তাড়িত করছিল। জানি, বিচারে আমার ফাঁসি হবে। তবে এ নিয়ে আমার কোন অনুশোচনা নেই। দুঃখ শুধু একটাই, দুর্বলের পাশে কেউ থাকে না। যার ক্ষমতা ও দাপট বেশি তাকেই সবাই সমীহ করে। সে যত বড় শয়তানই হোক না কেন।

যশোর সদর উপজেলার দেয়ারা ইউনিয়নের ভেকুটিয়া গ্রামের কৃষক খাদিজা বেগম গত ১২ মার্চ নিজ বাড়িতে হাসুয়া (বড় দা) দিয়ে হত্যা করেন উত্ত্যক্তকারী একই এলাকার বাসিন্দা পাঁচ সন্তানের পিতা মফিজুর রহমান মফিকে (৪৪)। এ ঘটনায় যশোর কোতয়ালী থানায় মামলা হয়েছে। পুলিশ খাদিজাকে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করে।

পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে খাদিজা বেগম বলেন,  প্রচুর সম্পদ না থাকলেও সংসারে সুখ ছিল। কিন্তু শয়তান মফি আমার সেই সুখের সংসার তছনছ করে দিয়েছে। তার হাত থেকে রেহাই পাওয়ার জন্য পুলিশ-দারোগা, মেমা্বর, পার্টির লোকের কাছে গিয়েছি। কেউ আমার সাহায্যে এগিয়ে আসেনি।

ঘটনা সম্পর্কে খাদিজা বেগম বলেন,  একই ইউনিয়নের তেতুলবাড়িয়া গ্রামের মোসলেম শেখের ছেলে মফিজুর রহমান মফি। সে আমার বোনের  ননদের মেয়েকে প্রথম বিয়ে করে। ঐ ঘরে তার চার মেয়ে ও এক ছেলে রয়েছে। বড় মেয়ে কলেজে পড়ে। তারপরও সে কোটচাঁদপুরে গিয়ে আমার বোনের মেয়ে রুনাকে  উত্ত্যক্ত করত। সেখান থেকে রুনার বাবা-মা রুনাকে আমার কাছে পাঠিয়ে দেয়। আমার বাড়িতে এসেও মফি তাকে বিরক্ত করত। একটা সময় রুনা বাধ্য হয়ে মফিকে বিয়ে করে।

তিনি আরও বলেন,  এখানেই শেষ নয়। এরপর মফি আমার অষ্টম শ্রেণি পড়ুয়া মেয়েকে উত্ত্যক্ত করা শুরু করে। আমি তাকে নানাভাবে বুঝাই যে, ও তোমার মেয়ের চেয়েও ছোট। ওকে বিরক্ত করো না। কিন্তু সে আমার কথা না শুনে  সাঙ্গপাঙ্গদের সঙ্গে নিয়ে মাঝেমধ্যেই বাড়িতে এসে শাসাতো এবং বিয়ের জন্য চাপ দিত। এ নিয়ে এলাকার লোকজনও নানা বাজে মন্তব্য করতে শুরু করে। এ অবস্থা থেকে পরিত্রাণ পেতে মফির বিরুদ্ধে থানায় জিডি করেছি, জানিয়েছি এলাকার মেম্বারকে, ধর্না দিয়েছি রাজনৈতিক নেতাদের কাছে। কিন্তু মফির বিরুদ্ধে কেউ ব্যবস্থা নেয়নি। উল্টা মফির উৎপাত আরও বেড়ে যায়। এ অবস্থায় মাসখানেক আগে  মেয়েকে আমার মেজ ছেলের(রাজমিস্ত্রী) কাছে ঢাকায় পাঠিয়ে দেই।

খাদিজা বেগম বলেন, ঘটনার দিন মাগরিবের নামাজের পর কোরআন শরীফ পড়ছিলাম। এ সময় মফি ঘরে ঢুকে আমার মেয়ে কোথায় তা জানতে চায় এবং এখনই মেয়েকে তার হাতে তুলে দিতে বলে। এ সময় কৌশল করে রান্নাঘর থেকে বেটে রাখা মরিচ এনে মফির চোখে লাগিয়ে দেই। এরপর হাসুয়া (বড় দা) দিয়ে কুপিয়ে তাকে হত্যা করি।

কথা বলার এক পর্যায়ে খাদিজা বেগম ডুকরে কেঁদে ওঠেন এবং বলেন, ইজ্জতের মালিক আল্লাহ। আল্লাই রক্ষা করবে। খুন করে আমি কোনো ভুল করিনি। আমার কষ্টটা  আমার মত মায়েরাই একমাত্র বুঝতে পারবেন।

কোতোয়ালী মডেল থানার অফিসার ইন-চার্জ ( ওসি) এমদাদুল হক শেখ বলেন, জিজ্ঞাসাবাদ শেষে খাদিজাকে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। নিহত মফির সম্পর্কে তিনি বলেন, মফি এর আগে চারটি বিয়ে করেছে। মফি হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় তার পিতা বাদী হয়ে থানায় মামলা করেছেন। তবে মফির বিরুদ্ধে থানায় দায়ের করা  খাদিজা বেগমের জিডি সম্পর্কে ওসি জানান,  ঐ সময় পুলিশ এলাকায় গিয়েও মফিকে খুঁজে পায়নি।

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.