আমরা যারা একলা থাকি-১৫

imp 1উইমেন চ্যাপ্টার: দীর্ঘদিনের অভ্যস্ত একাকি জীবনে যখন নতুন করে কারও আগমন ঘটে, তখন এর ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া হয় নানামুখী। যে ব্যক্তির জীবনে কেউ এলো, সেই ব্যক্তিও যেমন হঠাৎ করেই সবকিছু মেনে নিতে পারে না, অবিশ্বাস্য ঠেকে অনেক কিছুই, তেমনি সেই ব্যক্তির এতোদিনকার বন্ধুরাও বিষয়টা আত্মস্থ করতে সময় নেয়। তাদের মনেও বন্ধু হারানোর কষ্ট চিন চিন করে বাজতে থাকে। সাধারণত একাকি মানুষের বন্ধুও হয় একাকিই। একা বন্ধুটি তখন আরও একা একা হয়ে পড়ে। ফলে বন্ধুতে-বন্ধুতে কষ্ট বাড়ে। সময়ের শিডিউল মেলে না, কষ্টের কথাগুলো বড়বেশি ভিনদেশি ঠেকে….মনে হয় কোন সুদূর থেকে ভেসে আসা কোন গল্প হয়তো…..।

অহনার জীবনে সেইরকমটিই ঘটেছে। টানা ২৪ বছর কাঁধের ওপর একটি বিশ্বস্ত, নির্ভরতার হাতের অভাব বোধ করেছে প্রতিনিয়ত। চেয়েছে, কেউ তাকে বিপদের সময় বুকে জড়িয়ে বলুক, ‘ম্যা হু না’। পরম নিশ্চিন্তে প্রতি রাতে সে ঘুমাতে চেয়েছে। চলতে চেয়েছে একটি নির্ভার জীবনে, কেউ তাকে নিয়ে ভাবুক, কেউ তার অফিসে যাওয়ার পুরো পথটুকু সশরীরে না হলেও, মনের দিক থেকে সঙ্গী হোক, তার বাসায় ফিরে আসা নিয়ে দু:শ্চিন্তা করুক, আর সে খিল খিল করে হেসে উড়িয়ে দিয়ে বলবে, ‘এতো ভেবো না তো আমায় নিয়ে’! কিন্তু মনে মনে ঠিকই চাইবে, এমনটিই হোক।

অহনার ঈশ্বরে বিশ্বাস তেমন নেই, আবার অবিশ্বাসীও নয় সে। তার মতে, কোন একটা সুপার পাওয়ার অবশ্যই আছে। সে প্রকৃতিও হতে পারে। যার ওপর মানুষের কোন হাত নেই, সে তাই ঘটায়, যা অবশ্যম্ভাবী। আর প্রকৃতি সবকিছুই ফিরিয়ে দেয়, দেনা-পাওনা যা আছে, সব। কর্মফলেও অগাধ বিশ্বাস অহনার। আর এই বিশ্বাসটুকু সে পেয়েছে তার মায়ের কাছ থেকে। আজন্ম লড়াই করে যাওয়া মায়ের মেয়ে সে। যে মা তাকে বিপদের সময় বলতেন, ঝড় যেদিকে আসবে, সেদিকেই ছাতা ধরতে হয়। দুষ্টামি করে অহমা ঝটপট পাল্টা প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়ে বলেছিল, ঝড় যদি সব দিক থেকেই আসে, তখন? মা হেসে বলেছিলেন, ‘তখন ছাতা মাথার ওপর দিয়ে রাখবি, যাতে মাথাটা অন্তত বাঁচে’। এই মাথা অহনার মায়ের কাছে সম্মানেরই আরেক রূপ।

অহনার মা আরেকটা কথাও বলতেন, ‘আমি যেমন একাত্তর পাড়ি দিয়েছি, তুইও ধরে নে যে, এটা তোর জীবনে একাত্তর, তুইও পারবি’। অহনা সবসময় মায়ের এই কথাগুলোকে সম্মান দিয়ে নিজের জীবন যাপন করতে চেয়েছে।

দীর্ঘ ২৪ বছরের টানা কর্মমুখর জীবনের পর অহনা আজ একটু স্বস্তি চায়। যদিও জানে, এ জীবনে হয়তো স্বস্তি তার পাওয়াই হবে না কখনও। তবুও আজ যখন কিছুটা প্রতিশ্রুতি দেয় অন্য এক মানুষ, তখন নিজেকে নতুন করে ভাবতে বসে। কি ছিল, কি পেয়েছে, কি পাওয়ার ছিল, কি পেল না….এসব নানান চিন্তা তার মাথায় ভর করে। এর কিছুটা সে শেয়ার করে কিছু কাছের বন্ধুদের। এই বন্ধুরাও একা জীবন চালায়। তারাও চায় অহনার এই সুখ যেন স্থায়ী হয়। অহনাকে তারা বলেও সে কথা। অহনার দুর্ভাবনার জায়গাগুলো, নতুন মানুষ নিয়ে অস্বস্তির জায়গাগুলো ওরা কাটাতে চেষ্টা করে, যদিও জানে, অহনা ঠিক মেনে নিতে পারে না অনেক কিছুই। তারপরও অহনার মুখে আজ অনেক প্রশান্তির ছাপ, এটা চোখ এড়ায় না কারও।

এটা ভালবাসার ছাপ, বন্ধুরা বলে অহনাকে। ‘তোর একার দিন কাটলো বলে’ -ঠাট্টাচ্ছলে বলা কথাগুলো শুনে অহনার মনটাও খুশিতে ভরে উঠে। মনে মনে ঘর সাজায়, নতুন সংসার। ইস্, কতদিনের স্বপ্ন ছিল একটা সংসার করার। আজ এই অবেলায় বুঝি সেই সংসার সাজানোরই ডাক এলো….মনে মনে ভাবে অহনা। এটাও ভাবে, ‘কোন এক শক্তির অদৃশ্য সূতায় বাঁধা সবার জীবন, যাকে যেভাবে নাচাবে, সে সেইভাবেই নাচবে, কার কখন মোড় পরিবর্তন হবে, কেউ বলতে পারে না’।

আজকাল বড্ড বেশি ভাগ্যনির্ভর হয়ে পড়ছে অহনা। অথচ এমনটি ছিল না সে কখনও। স্কুলে পড়ার সময় আস্তিকতা-নাস্তিকতা নিয়ে দিনের পর দিন যুক্তিতর্কে মেতে থাকতো সে। সেই তারই মুখে এখন অন্য কথা। নিজেকেও চিনতে পারে না অহনা। তাহলে কি সে বদলে গেল?

একা থাকার জীবনই কি ভাল ছিল না? প্রশ্নটা কুড়ে কুড়ে খায় অহনাকে। যদি ভালোই থাকবে, তাহলে সেই জীবনে এতো হা-হুতাশই বা কেন ছিল? আজ যখন একাকীত্ব ঘুচানোর সুযোগ সামনে, তখন অহনা কেন দ্বিধায় ভুগছে। সে তো নিশ্চিত জানে, মা বেঁচে থাকলে সবচেয়ে খুশি উনিই হতেন। ‘একা এই জীবন সাগর পাড়ি দিবি কি করে’ এই ভাবনাটা মাকে অতীষ্ঠ করে রাখতো জীবিত থাকতে। পরপারেও মা নিশ্চয়ই মেয়ের হাসি-খুশি, নির্ভাবনাময় একটা জীবন দেখতে চেয়েছেন।

অহনার দিন কাটে ঘোরের মধ্যে। একার জীবন, নাকি নতুন চ্যালেঞ্জ, কোনটা সে বেছে নেবে আজ?

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.