টেমুদি যেভাবে হারিয়ে গেল

DSCN0774
ছবি: পলাশ

লুতফুননাহার লতা: সে অনেক আগের কথা । দেশ তখনো স্বাধীন হয় নি । খুলনায় আমাদের পাড়ায় সে সময় হিন্দু , মুসলমান , বৌদ্ধ , খৃস্টান আমরা সবাই এক সাথে অসম্ভব সৌভ্রাতৃত্বের সাথে ছিলাম । আমরা বড় হয়েছি ঈদ, পূজো, বড় দিন, বৌদ্ধ পূর্ণিমা সব পালন করে । খুব যখন ছোট ছিলাম আমার মা যেমন ঈদে আমাদেরকে নতুন জামা দেবার ব্যাবস্থা করতেন, তেমনি পূজো আসলেও নতুন জামা দিতেন ।

বাড়ীর সামনে সুশীল কাকার বড় মাঠ, তারপরে তাঁদের পুরনো দিনের পলেস্তারা খসা ইটের দালান বাড়ী । আমাদের পাড়ায় তখন ইটের বাড়ী খুব কম ছিল । তো সেই বাড়ীর ছিল বারান্দা অসম্ভব রকমের উঁচু । সুশীল কাকার এক জন ভাই ছিল, কালী পূজোর দিন অনেক কান্না কাটি করতেন সম্ভবত একটু আধটু নেশা টেশা করতেন বলে, আজ তাঁর নাম আর মনে নেই , ওনার মাকে ছেলেমেয়েরা সবাই ডাকত ঠাকুর মা , কিন্তু সংক্ষেপে ঠাম্মা । আমিও তাই ঠাম্মা’ কাছে ডেকে নাড়ু খেতে দিলে একবারের জায়গায় দুইবার ঠাম্মা ঠাম্মা করতাম ।

আমাদের সেই খেলার মাঠে হোলির রঙ খেলা হত, পূজো হত, বাতাসা ,মোয়া , চিড়ে কলা নারকেল দিয়ে মাথা , কিম্বা নাড়ু এসব খেতাম সারাদিন আর সন্ধ্যার পরে আমরা সব ছেলেমেয়েরা দল বেধে চাটাইয়ে বসে রাত জেগে কীর্তন গাইতাম কীর্তনিয়া দের সাথে ,মাথায় শিশির পড়বে বলে মা চাদর দিয়ে হাত টাত সমেত মাথা মুড়ে একটা কাঠ পুতুলের মত কাপড়ের পোটলা বানিয়ে দিতেন।

সুশীল কাকার ছেলেমেয়েদের অদ্ভুত বাজে ধরনের নাম ছিল ! যেমন পাদা দিদি , টেমু দিদি , ত্যান্দড় , বান্দড় , ওনার ছেলেমেয়ে দের যমের হাত থেকে রক্ষা করার জন্য এই সব নাম করন , অথচ ওদের ভালো নামগুলো রেখেছিলেন অসাধারন । অরুন , গোরা , রূপা । গোরা দা কে আজো আমরা ডাকি গড়া দা বলে ।

স্বাধীনতার পরে ওনার সেই ভাই আর ফিরে আসেনি, পথে শরণার্থী শিবিরে ঠাম্মা মারা যান , আর টেমুদি এসেছিলেন ফিরে ! কিন্তু কি জানি কি হল, কিন্তু কিছুদিন পরে একটু একটু করে শিশি ভরে এসিড কিনে কিনে জমিয়ে রেখেছিলেন , মাঝে মাঝে মিনিদের বাড়ীতে এলে, আমাদের সাথে গল্প করতেন , কিভাবে দেশ থেকে পালিয়েছিল, কোথায় কোথায় কিভাবে কেটেছে পথে প্রান্তরে ! শরণার্থী শিবিরে কিভাবে ছিল ওরা ! আজ মনে প্রশ্ন জাগে ও কি সত্যি যেতে পেরেছিল ওপারে ! নাকি মিলিটারী আটকে ফেলেছিল ওকে ! কি হয়ে ছিল সেখানে ওর !

তখন সে সব কথা জানতে চাওয়ার মত বয়স হয়নি আমার বা মিনির ! কিন্তু আমরা নিরব হয়ে টেমুদির কথা শুনতাম । হঠাত একদিন সেই জমিয়ে রাখা এসিড পান করলেন আকন্ঠ ! বেশ কতদিন অর্ধদগ্ধ তন্ত্রী নিয়ে আর্তনাদ করে করে একসময়ে হারিয়ে গেলেন ।

Lata apa
লুতফুননাহার লতা

একদিন ভোর বেলায় ঘুম ভেঙ্গে সামনের বাড়ীর বন্ধু মিনি’র কাছে শুনলাম টেমুদি আত্মহত্যা করেছেন । হ্যাঁ কাল রাতে ও মারা গেছে । ও বাড়ী থেকে সকাল হবার আগেই ওঁর সকল স্মৃতি মুছে ফেলা হল ! খুলনার রুপসা নদীর ধারে শ্মশানে ওকে চির বিদায় দিয়ে নিঃশব্দে ফিরে এলেন ওঁর বাবা , দাদারা ! আমার মা খুব ভোরে উঠে চুলায় ভাত চাপিয়ে দিয়ে জায়নামাজে বসে নামাজ না পড়ে বসে বসে নিঃশব্দে কাঁদছেন ! পাশের বাড়ীর জর্জদার বোন বেলাদি, রোজকার মত সেদিনও গলা সাধছেন ‘উঠাতা বাজা মুরালী আজা গুনিয়ান কি কুঞ্জমে ‘

সেদিন থেকে ওবাড়ীতে কেউ কোনদিন ওঁর নাম উচ্চারণ করেনি আর !

কেন ?

নাহ মন খারাপ হয়ে গেল ! ভেবেছিলাম টেমুদির কথা একদিন সময় করে লিখব , আজ কেবল হোলির আনন্দ, পূজোর আনন্দের কথা লিখব আর এবারের হোলির দিনে আমাকে কেউ আসতে বলল না ! আমার বন্ধুরা ! এমন কি খুশীও একবার বলল না ! এসব ভেবে অভিমানে কিছু লিখতে চেয়েছিলাম !

আমার যে অনেক কথা বলার ছিল !

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.