বৈপরীত্য!

Newspaper pixতানিয়া মোর্শেদ: বন্ধু আইরিন যখন আমার লেখাকে বই-এর আকারে দেখতে চাইলো, আমি বলেছিলাম যে আমি কোনো কিছু করতে পারবো না। এক সময় এও বলেছিলাম যে, তোমার বা অন্য কারো লেখা প্রকাশ করবার হলে আমি খোঁজ নেওয়া থেকে শুরু করে সব করতাম। কিন্তু নিজের লেখা নিয়ে কাউকে বলতে পারবো না কিছু। ও বলেছিল যে, সে এসব করবে। আমি ও’কে তখন জানিয়েছিলাম যে, ভালো মত খোঁজ নেবে প্রকাশক, প্রকাশনী সম্পর্কে।

বাংলাদেশের নামকরা এক পত্রিকা, প্রকাশনীর সাথে ওর চেনা জানা আছে। আমি সেই পত্রিকা পড়া অনেক আগেই ছেড়েছি। শাহবাগ গণ আন্দোলনের সময় তা চূড়ান্ত হয়েছে। কেউ যদি সেই পত্রিকার কোনো খবরের লিংক শেয়ার করেন, ফেইসবুকে, আর যদি তা আমার জানবার বিষয় হয় তাহলে হঠাৎ হয়ত দেখি। আমার প্রথম কথাই ছিল, কোনোভাবেই সেই পথে যাবে না। গেলেই যে তারা আমার লেখা প্রকাশ করতো তা কখনোই বলছি না। শর্ত ছিল, কোনো জামাতী-রাজাকারের বন্ধু, বিএনপি কারো বন্ধুর প্রকাশনী থেকেও নয়। না তারা আমার লেখা ছাপাতোও না।

বন্ধু ইমন বেড়াতে এলে, বইটি হাতে নিয়ে প্রথম পৃষ্ঠা খুলেই বলেছিল, “তোমাকে দিয়ে হবে না। প্রথম পৃষ্ঠাতেই রাজাকার-যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবী করেছো (২০০৯ এর নভেম্বরের লেখা। বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারীদের বিচারের পর)। একথা শেষে লিখতে হয়।”

ও মজা করেই বলেছিল। বলেছিল যে, যারা কিনবার, পড়বার নয় তারা প্রথম পৃষ্ঠা দেখেই রেখে দেবে। আমি বলেছিলাম যে, জানি। বই-এর বিষয়ে ফেইসবুকে জানানো বাদে কোথাও কোনও প্রচারণা করা হয়নি। করা হয়নি মানে করা যেতো না তা বলছি না। এক মাসী বই-এর কথা জানবার পর দেখা হলেই বলতেন যে, টিভিতে একটি বিশেষ চ্যানেলের একুশের বইমেলার খবর দেখেন আর ভাবেন, “লোপার বই কবে দেখাবে?”

আমি একদিন বলেছিলাম যে, এগুলো করতে হলে যোগাযোগ করতে হয়। একদিন মা’কে বলেছিলাম যে, ফেইসবুকে সেই অনুষ্ঠানের উপস্থাপকের লেখা (এক প্রশ্নকারীর উত্তর) পড়ে, বইটি তার কাছে পৌঁছে দিলে হবে। একদিন সেই অনুষ্ঠান দেখছি। দেখি কবি আল মাহমুদকে নিয়ে আসলেন কয়েকজন। বিখ্যাত সেই উপস্থাপক (নিজে একজন নামকরা ছড়াকার) পরিচয় করিয়ে দিলেন আল মাহমুদকে এভাবে, “বাংলার বিশাল কবি, প্রধান কবি …।” আর কী যে হাসি মুখে কথা বলা, যেন ধন্য হয়ে যাচ্ছেন কবির সাথে কথা বলে।

মা’কে ফোনে জানালাম, ভুলেও সেই উপস্থাপকের কাছে দেবে না। তার আগেই অবশ্য চিন্তা করছিলাম, প্রথমসারীর এই চ্যানেল মেহেরজান ছবির প্রচারণায় ছিল! ক’দিন আগে রকমারী নামে একটি অনলাইন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের কথা জেনেছি এক গ্রুপের পেইজে। এই প্রতিষ্ঠান বই সরবরাহ করে। ভাবছিলাম যে, মা’কে খোঁজ নিতে বলবো, এরা দেশের বাইরে বই সরবরাহ করে কি না। নিজের ও পছন্দের বই তাহলে আনানো যাবে।

গতকাল থেকে দেখছি যে, এক জামাতি-ধর্মান্ধ এই অনলাইন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানকে হুমকি দিয়েছে, দুজন লেখকের বই (নাস্তিকতার অযুহাতে) নিয়ে। এই অযুহাতে হুমকি দেওয়া নূতন কিছু নয়। কিন্তু হুমকির ভয়ে প্রতিষ্ঠানটির আচরণ হচ্ছে নিন্দনীয়। মানুষের বাক স্বাধীনতা হচ্ছে মৌলিক অধিকার। তা কেউ কেড়ে নিতে, বন্ধ করতে চাইলে তা হয় মারাত্মক ক্ষমাহীন অপরাধ। মানুষের পূর্ণ বাকস্বাধীনতা থাকবে ততক্ষণ, যতক্ষণ তা কাউকে আঘাত না করছে (আঘাত মানে অপরাধ)। এই হুমকি বিষয়ে পোস্টে অনেকেই মন্তব্য করছেন। কিছু পড়েছি। জানতে পারলাম যে, এরা গোলাম আজম, মওদুদী এবং এধরণের আরো কিছু মানুষের বইও সরবরাহ করে! আক্কেল গুড়ুম! এত মানুষ এর সেবা নেয় অথচ আগে এবিষয়টি কারো নজরে পড়েনি!

Tania Lopa
তানিয়া মোর্শেদ

আমার মা’কে প্রায়ই বলি, কাউকেই প্রায় বিশ্বাস করা যাচ্ছে না দেশে! গতকাল দেখলাম, জাতীয় সংগীত গাইবার বিশ্ব রেকর্ড গড়বার ফান্ডে প্রধানমন্ত্রী ইসলামী ব্যাংকের চেক নিচ্ছেন!! মনে হলো যেন, পাকিস্তানী আর্মি আর রাজাকারদের হা হা হাসি শুনতে পাচ্ছি! দুদিন আগে দীপ্ত তার সেই রিপোর্ট লেখা শুরু করেছে। আমাকে এনে দেখালো। আমি পড়ে (কিছু লাইন লিখেছে) জানতে চাইলাম, লেখাটি কোথায় পেলে? ও বললো, “আমি লিখেছি।” আমি বিস্মিত। একটি ছবি, একদল মানুষ সার বেঁধে দাঁড়ানো অপরদিকে পাকিস্তানী আর্মি রাইফেল তাক করে। এই ছবি দেখেই এই বর্ণনা! ভাবলাম, ও’কে দিয়েই হবে হয়ত! আমি বাংলাদেশের জন্মের ইতিহাস পৃথিবীকে জানাতে চাই। ও যদি লেখা চালিয়ে যেতে পারে তাহলে হয়ত একদিন ……

কিন্তু তখন বাংলাদেশ কি বাংলাদেশের মত থাকবে?? আজ ও বাবার সাথে “কসমজ” শোটি দেখছিল (গতকালও দেখেছে), সায়েন্স ক্লাসের অ্যাসাইনমেন্ট হিসাবে (না হলেও দেখতো)। ফক্স চ্যানেল দেখাচ্ছে, ইভোলিউশনের উপর ডকুমেন্টারি! বাড়িতে ফক্স চ্যানেল দেখা নিষিদ্ধ, অলিখিত ভাবে। ওদের ক্লাসে ইভোলিউশনের উপর পড়াচ্ছে। এক স্টুডেন্ট ক্রিয়েশনিজমে বিশ্বাসী। সে এই ক্লাস নিতে পারছে না। একদিন না কি কাঁদতে শুরু করেছিল, তারপর চলে গেছে। ক্লাসে এ নিয়ে কথাবার্তা চলছে বুঝতে পারছি। দীপ্তকে বলেছি যে, যে যার বিশ্বাস নিয়ে থাকুক। তর্ক করো দরকার হলে, কিন্তু কাউকে অপমান যেন কেউ না করে। ও বলেছে যে, সে (দীপ্ত) শুধু যুক্তি দিয়েই কথা বলে।

ভাবছি, যদি বাংলাদেশে শিক্ষা ব্যবস্থা বদলানো যেতো তাহলে সায়েন্স পড়া অকাট মূর্খ এত মানুষ দেখতে হতো না! দেশে সায়েন্স পড়ে অধিকাংশই ভালো নাম্বার পাবার, ভালো জায়গায় পড়বার সুযোগ, ভালো চাকুরি, বিদেশ আসা, ভালো আয়ের জন্য। জানবার জন্য কয়জন পড়ে? আর পড়লেও তো শুধু মুখস্ত করে। কয়জন “প্রশ্ন করা” শেখে? সেই হুমকিদাতাও সম্ভবত কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে সায়েন্সের বিষয়ে পড়া! আমি আশ্চর্য্য হইনি। আমার আশেপাশেই সায়ন্স পড়া অনেক অদ্ভুত মানুষ আছেন!

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.