একাত্তরের নারীসত্ত্বা: অগ্নিশিখা ও অশ্রুবিন্দু(৫)

women 71মারুফ রসূল: গেরিলা যুদ্ধের প্রধান ভিত্তি হচ্ছে স্থানীয় বেইজ বা ঘাঁটি। গেরিলারা ভারতে ট্রেনিং নিলেও তাঁদের যুদ্ধক্ষেত্র ছিলো বাংলাদেশ। বেইজ কর্মীরা ছিলেন মুক্তিযোদ্ধাদের মূল শক্তি।

মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতিকালেই নারীসমাজ সক্রিয় দেশপ্রেমের পরিচয় রেখেছেন। ২৫ মার্চ পর্যন্ত দেশের অভ্যন্তরে সকল কর্মকাণ্ডে নারী-শিক্ষার্থী সমাজ অংশগ্রহণ করেছেন। সম্মুখ সমরে যুদ্ধ করার বিষয়ে নারীর তীব্র আকাংখা থাকায় তৎকালীন সরকার ও রাজনৈতিক দল থেকে নারীদের শুধুমাত্র অস্ত্র প্রশিক্ষণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিলো। যুদ্ধ করতে যাবার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়নি। গোবরা ক্যাম্পে ও বিএলএফ ক্যাম্পে এই প্রশিক্ষণ দেয়া হতো।

একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে নারীর অংশগ্রহণ নিয়ে হাতে গোনা কয়েকটি গ্রন্থে কয়েকটি সূত্র পাওয়া যায়।

মালেকা বেগমের লেখা ‘একাত্তরের নারী’ গ্রন্থে উল্লেখ আছে-

“সিরাজগঞ্জের মনিকা মতিন, টাঙ্গাইলের শুকরী বেগম, জামেলা বেগম, মাজেদা বেগম সরল ভাষায় বলেছেন যে, মুক্তিযুদ্ধের সময় জনসঙখ্যার অর্ধেক ছিলো নারী। অর্থাৎ তিন কোটি চুয়াত্তর লক্ষ নারী ছিলো মুক্তিযোদ্ধা। মুক্তিযুদ্ধের সময় নারীরা খবর আদান-প্রদান করতো। রাডার যেমন ভিতরে ও বাইরের শত্রুদের খবর দেয়, আমাদের নারীরা সে-ই ভূমিকায় কাজ করেছেন.. ..”

মুক্তিযুদ্ধের শুরুতে নারীদের ভাবনা, সাহস, কর্মকাণ্ড বিষয়ে অনেক তথ্য ছড়িয়ে আছে নানা জনের লেখায়। সেসব থেকে উদ্বৃত করলে বোঝা যাবে মুক্তিযুদ্ধে নারীর অবদানের কথা।

ক)    সত্যেন সেন

ছোট্ট মেয়ে মিলি অষ্টম শ্রেণির ছাত্রী। ছাত্র ইউনিয়নের সভা, মিছিল, শ্লোগানে যোগ দিতো। ছাত্রী দলে প্যারেড করে আসছিলো। বাসার বাধা পেলেও বাধা মানেনি। আমাকে সে বলতো, এবারকার স্বাধীনতা সংগ্রামে শুধু ছেলেরা নয়, মেয়েরাও এগিয়ে যাবে। এ বাড়ির (ঢাকার নারিন্দার) আর কোনো মেয়ে এভাবে ভাবতেও পারে না। ভাবার মতো দুঃসাহস তাদের নেই। বারবার সে আমায় প্রশ্ন করতো- ‘দাদা, ওরা তো আক্রমণ করেছে, আমরা কি এখনো প্রতিরোধ করবো না? কেমন করে প্রতিরোধ করবো? আমাদের হাতে যে অস্ত্র নেই?

.. ..

স্বাধীনতা সংগ্রামের যুগে পুলিশের শ্যেন দৃষ্টি এড়িয়ে পলাতক অবস্থায় যে পরিবারে ছিলাম সেখানে বৌমার রক্ষণাবেক্ষণ ছাড়া বাঁচতেই পারতাম না। স্বাধীনতার পর নতুন অধ্যায়ে সে-ই বৌমাদের কথা ভুলেই বসেছিলাম। নেমকহারামী আর কাকে বলে?”

(রফিকুল ইসলাম সম্পাদিত ‘রক্তাক্ত বাংলা’, ঢাকা, মুক্তধারা, ১৯৭১-১৯৮৯। পৃষ্ঠা: ৫২, ১৭৮, ২১৩)

খ)    সরদার ফজলুল করিম

একাত্তরের স্বাধীনতা যুদ্ধ তার অমোঘ উচ্চারিত দাবি, ‘ইতিহাস কথা কয়’, ‘ইতিহাসকে কথা বলতে দাও’। কিন্তু সে দাবি পূরণে অনীহা ও অনিচ্ছা যেনো ক্রমান্বয়ে দূরতিক্রম্য হয়ে দাঁড়াচ্ছে। বাংলাদেশের প্রায় প্রতিটি লোকই কোনো না কোনোভাবে স্বাধীনতা যুদ্ধের সাথে জড়িত ছিলেন। গ্রামে গ্রামে, ব্যক্তিতে ব্যক্তিতে বহু ঘটনার উদ্ভব হয়েছে। বহু বীরত্ব গাঁথা বিশ্বাসঘাতকতা, ত্যাগ, অত্যাচার, নিপীড়ণের কাহিনী স্তরে স্তরে গড়ে উঠেছে। এর পরিমাণ অনুধাবন করা কঠিন।

(সরদার ফজলুল করিম, রুমীর আম্মাও অন্যান্য প্রবন্ধ, ঢাকা, জাতীয় সাহিত্য প্রকাশনী, ১৯৮৯, পৃষ্ঠা ১৬৫-১৬৮)

গ)    বাসন্তী গুহঠাকুরতা

মুক্তিযুদ্ধে মেয়েদের অংশগ্রহণ মানে মেয়েদের সাহস

(বাসন্তী গুহঠাকুরতা, একাত্তরের স্মৃতি, ঢাকা ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেড, ১৯৯১)

ঘ)    আনিসুজ্জামান

রাজনৈতিক ছাত্র সংগঠনের পাশাপশি মহিলা সমাবেশ মিছিলে যুক্ত হলো চট্টগ্রাম বান্ধবী সংঘ, মহিলা পরিষদ, মহিলা আওয়ামী লীগ। জানুয়ারি, ফেব্রুয়ারি, মার্চ’৭১-এ বড়ো বড়ো সমাবেশ হলো

(আনিসুজ্জামান, আমার একাত্তর, ঢাকা সাহিত্য প্রকাশ, ২০০১। পৃষ্ঠা: ২৭)

ঙ)    এম আর আখতার মুকুল

এটা অত্যন্ত দুঃথজনক যে ’৭১ এর মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশের নারী সমাজের অবদানের মূল্যায়ন আজ পর্যন্ত হয়নি। অথচ বাস্তবে তাদের সহযোগিতা অবিস্মরণীয় হয়ে রয়েছে। বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলের গৃহবধূরা যেভাবে নিজেদের আহার পর্যন্ত মুক্তিযোদ্ধাদের দান করেছিলেন সে সব ঘটনা অন্তত মুক্তিযোদ্ধাদের স্মরণ থাকার কথা।.. ..

(ফরিদা আখতার সম্পাদিত, মহিলা মুক্তিযোদ্ধা*, ঢাকা, নারীগ্রন্থ, ১৯৯১। পৃষ্ঠা: ৪৪-৪৬)

Maruf Rasul
মারুফ রসূল

এপ্রিলের শেষের দিকে ঢাকায় প্রতিরোধের ভিত্তিগুলো গড়ে উঠতে থাকে। অধ্যাপক গিয়াসউদ্দিন, অধ্যাপক জয়নুল আবেদীন, অধ্যাপক বোরহানউদ্দিনখান জাহাঙ্গীর, মুনতাসীর মামুনসহ অনেকের চেষ্টায় একটি দল তৈরি হয়, যাঁরা মুক্তিযোদ্ধা এবং শহিদ পরিবারকে সহায়তা করতেন। বেবী মওদুদ সাহায্য করতেন এইসব কাজে। একাত্তর সালে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে ঢাকার সেক্টর দুই এর মুক্তিযোদ্ধাদের কতোগুলো পরিবারের মেয়েরা ঢাকার ভিতরে নানা কাজে সক্রিয় ভূমিকা রেখেছিলেন। একটি পরিবারের তিন বোন- আসমা, রেশমা ও সায়মার লেখা থেকে জানা যায় যে, মুক্তিযোদ্ধারা যখন ঢাকায় আসতো তাদের স্টেনগান, এক্সপ্লোসিভ ও গ্রেনেডগুলো গোপনে সংরক্ষণ করতো তারা তিন বোন। অপারেশনে যাবার পূর্ব-মুহূর্তে সেই অস্ত্র মুক্তিযোদ্ধা ভাইদের হাতে তুলে দিতো তাঁরা।

মুক্তিযোদ্ধা আলম, শাহাদাৎ চৌধুরী, ফতেহ আলী, জিয়া প্রমুখ ঠিক করলো মুক্তিযুদ্ধের অগ্রগতি বিষয়ে ঢাকাবাসীদের জানাবেন তাঁরা। সে জন্য ১৪ আগস্ট ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের পতাকা উড়াবার কর্মসূচী নেয়া হয়। তিন বোন সে-ই অনুযায়ী জুলাই এর ২১ থেকে ২৮ তারিখ পর্যন্ত ২০০ পতাকা সেলাই করে। এটা কি মুক্তিযুদ্ধ না!

চট্টগ্রামে ‘মহিলা মুক্তিযোদ্ধা স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী’ গড়ে তুলেছিলেন ডাক্তার নুরূন্নাহার জহুর। দেশের ভেতরে এ রকম সংগঠিত কাজের ক্ষেত্রে ছিলো নানা সমস্যা। এ বিষয়ে বিস্তারিত বলবো না- কারণ এ বিষয়টি নিয়ে বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর চট্টগ্রাম শাখার সভাপতি বেগম মুশতারী শফী একটি চমৎকার সুখপাঠ্য বই লিখেছেন; নাম ‘মুক্তিযুদ্ধে চট্টগ্রামের নারী’। (বইটি পড়ার অনুরোধ রইলো)

১৯৭১ সালে সারা পূর্ব-পাকিস্তানের পরিস্থিতি স্বাভাবিক; এইটি বোঝানোর জন্য মেট্রিক পরীক্ষা দেবার জন্য জোর জবরদস্তি করা হলো। সেই পরীক্ষা বয়কটের একটা পরিবল্পনা কার্যকর করেন নারী অভিভাবকগণ। পাকবাহিনীর একটা প্রচারণা ছিলো ১৯৭১ সালে পরীক্ষা না দিলে সারা জীবন পরীক্ষা দেয়া থেকে বহিস্কার করা হবে। স্বনামধন্য কথাসাহিত্যিক রাবেয়া খাতুন এ বিষয়ে খোঁজ খবর নেবার দায়িত্ব নিলেন। তাঁর চাচা হাফিজউদ্দিন ছিলেন ধানমন্ডি বয়েজ স্কুলের হেডমাস্টার। রাবেয়া খাতুন অনেক কষ্টে তার বাসা পর্যন্ত যায়, তিনিই জানালেন ওই বক্তব্য গুজব, আর কিছু নয়। এরপর সব মায়েরা একসাথে মেট্রিক পরীক্ষা না দেবার প্রচারণা চালান। বর্তমানে এ বিষয়টিকে যতোই সামান্য দৃষ্টিতে দেখেন; এটি ছিলো অনেক বড়ো একটি দৃষ্টান্ত। এই মায়েরা কি মুক্তিযোদ্ধা নন?

সিলেটের চা বাগানের চা-নারী শ্রমিকরা মুক্তিযুদ্ধ করেছেন সশস্ত্র হয়েই। চা শ্রমিকদের মধ্যে প্রথম কলেজ পড়ুয়া (১৯৬৭) দুজন ছাত্রী- তৃপ্তি বুনারজি ও সন্ধ্যা রাণী বসাক যুদ্ধ করেছেন লক্ষ্মীছড়া চা বাগানে। দেশেই ছিলেন, বাগানেই ছিলেন মৃত্যু ঝুঁকি নিয়ে। এখন তাঁরা সরকারি কর্মচারী।

এছাড়া মুক্তিযোদ্ধাদের জবানবন্দীতে লেখা বিভিন্ন জায়গায় নারীদের অংশগ্রহণের কথা এসেছে। বেশ স্বতঃস্ফূর্তভাবে। মুক্তিযোদ্ধা হারুন হাবিব লিখেছেন-

‘মুক্তিযোদ্ধা রবিউল যখন আহত হন তখন গ্রামের গৃহবধূরা সহায়তা করার জন্যে এগিয়ে এসেছিলেন। যদিও গৃহস্বামীরা দরোজায় দাঁড়িয়ে ইতঃস্তত করছিলেন’।

(চলবে)

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.