পত্রহীন বৃক্ষরাজির দেশে রঙের ছোঁয়া…

প্রকৃতির মতিগতি আন্দাজ করা সবসময়-ই কঠিন, তার মধ্যে ঋতু বদলের সময় হলে তো কথাই নেই। এখানে এখন চলছে তেমন একটা সময়, শীতের চলে যাবার সময় এলো প্রায়। কিন্তু তিনি এই দীর্ঘ চারমাস ধরে প্রবল অধিকারে রাখা ধরিত্রী'কে প্রায় আসন্ন বসন্তের প্রযত্নে রেখে চলে যেতে ঠিক রাজী নন। আবার বসন্ত-ই বা তার প্রাপ্য এখতিয়ার ছাড়বেন কেন? এই দুজনের অধিকার প্রতিষ্ঠার লড়াই চলছে নিত্য; আজ শীত জয়ী তো কাল বসন্ত। তাই আবহাওয়ায় চলছে নিত্য অদলবদল। গতকাল চারদিকে বেঁজেছিল বসন্তের জয়ডঙ্কা, আজ বাতাসে বাঁজছে শীতের উল্লসিত কীচক। তাপমাত্রা সকালে ছিল হিমাঙ্কের নিচে, কিন্তু তারচেয়েও বেশী হোল শো শো বাতাস, হিম-শীতল এবং বেশ শক্তিশালী। বাড়িঘর উড়িয়ে নিয়ে যাবে বলে মনে হয়েছে সারারাত। সকালের ড্রাইভে আমার স্বভাবসুলভ হাইস্পিড তুলতে তো পারিনি-ই, তারপরও আবার দুই হাতে শক্ত করে স্টিয়ারিং ধরে রাখতে হচ্ছিল, নাহলে লেন ঠিক রাখা কঠিন হয়ে পড়ছিল। হাসপাতালের থেকে অফিসের ফিরতি পথটা খুব নিরিবিলি, দুইপাশে দীর্ঘকায় সব গাছের সারি। এখনো পাতা নেই। হাওয়ার শো শো আওয়াজ এড়াতে প্লেয়ারে গান বাঁজাতেই শ্রীকান্ত' দরাজ গলায় গেয়ে উঠলেন, "এই উদাসী হাওয়ার পথে পথে মুকুলগুলি ঝরেআমি কুড়িয়ে নিয়েছি, তোমার চরণে দিয়েছি--লহো লহো করুণ করে..."মনে পড়ল, দেশে এখন চৈত্র মাস। আমের মুকুল ঝরে পড়ছে পথে পথে চৈতালি হাওয়ায়..., আমার পথের দুই ধারে পত্রহীন বৃক্ষরাজি। শ্রীকান্ত গেয়ে চলেন, "যখন যাব চলে ওরা ফুটবে তোমার কোলে,তোমার মালা গাঁথার আঙুলগুলি মধুর বেদনভরেযেন আমায় স্মরণ করে"ফাগুনের কৃষ্ণচূড়া, পলাশ, শিমুল...! এখানে চেরী ফুটতে আরো বেশ দেরী আছে। চৈত্রের বকুল কুড়িয়ে মালা কেউ গাঁথে না এখানে, যদিও মধুর বেদনভরে স্মৃতির মালা গাঁথা হয় অনেক-ই ...। যাহ, মন খারাপ হতে শুরু করেছে...। গান বেজে চলছে, শ্রীকান্ত দ্বিতীয় অন্তরা শুরু করেন..."বউকথাকও তন্দ্রাহারা বিফল ব্যথায় ডাক দিয়ে হয় সারাআজি বিভোর রাতে।দুজনের কানাকানি কথা দুজনের মিলন বিহ্বলতা,জ্যোৎস্না ধারায় যায় ভেসে যায় দোলের পূর্ণিমাতে।এই আভাসগুলি পড়বে মালায় গাঁথা কালকে দিনের তরেতোমার অলস দ্বিপ্রহরে" এ দেশে বউকথাকও নেই, আমি নিশ্চিত। তবে হ্যাঁ, দোল পূর্ণিমা তো আসবেই; হয়তো অন্য কোন নামে। মনে পড়ল মার্চের পূর্ণ চাঁদকে এরা বলে, ওয়ার্ম মুন। এসময়ে তাপমাত্রা বাড়তে শুরু করে, ভূমি কেঁচোর খেপ ফিরে আসে, ফিরে আসে রবিন তার মোহনীয় আভিজাত্যে। ওয়ার্ম মুন শুনতে একটুও ভালো লাগছে না। খুঁজে দেখি আরো নাম আছে, ক্রো মুন (কাকেরা শীতের শেষে আবার ডাকাডাকি শুরু করে বলে), ক্রাস্ট মুন( দিনের গরম তাপমাত্রায় তুষার গলে যায়, আবার রাতে তাপমাত্রা নেমে গেলে জল জমে বরফ হয়ে যায় বলে) এবং স্যাপ মুন( ম্যাপেল গাছ থেকে এই সময় রস সংগ্রহ করা শুরু হয় বলে)। নাহ, একটি নামও ঠিক পছন্দ হোল না, হৃদয় ছোঁয়ার প্রশ্নই উঠে না! 'দোল পূর্ণিমা' কি অনন্য একটি নাম। এদিন দেশে দোল পূজা, হোলি রঙে রঙে রাঙিয়ে দেয়া সবাইকে। ভাবতে না চাইলেও ভাবনায় বারবার ফিরে আসে হোলির সেই অকৃত্রিম আনন্দের দিনগুলির কথা, দেখতে না চাইলেও চোখের সামনে ভেসে ওঠে দোলের পাঁচ বা সাত সোপানের মঠ যার মাথায় ছোট্ট তুলশী চারা, মঠের কোনায় কোনায় উড়ছে লাল-নীল-হলুদ-সবুজ-নীল-গোলাপী ত্রিকোনা কাগজের পতাকা। আর সোপানে সোপানে ছড়ানো নানা রঙের আবীর আর ভাঁটফুল, মঠের তলায় পূজার সব উপকরণ, চাল-কলা, ফল-মিষ্টি, নারকেল; ঘটের উপড়ে আমের পল্লব, হরিতকী, কলা, ফুল, পাশে কাসার বাটায় গুলানো চন্দন, কর্পূর, তিল, ফুল, জল। পিছনে সবাই অধীর আগ্রহে পূজা শেষ হবার অপেক্ষায়, সাথে বালতি ভরা গুলানো আবীর আর বাঁশের পিচকিরি, কারো কারো হাতে গুড়ো আবীর....., কে কাকে আগে রাঙিয়ে দিতে পারে, তার কি তীব্র প্রতিযোগিতা! সেই উচ্ছ্বাস, সেই আনন্দ কেবল দোল পূর্ণিমাতেই সম্ভব, ক্রো মুন, ক্রাস্ট মুন, স্যাপ মুন........., নাহ, কিছুতেই না। আমি বরং গানে মন দেই...,"দুজনের কানাকানি কথা দুজনের মিলনবিহ্বলতা,জ্যোৎস্নাধারায় যায় ভেসে যায় দোলের পূর্ণিমাতে।এই আভাসগুলি পড়বে মালায় গাঁথা কালকে দিনের তরেতোমার অলস দ্বিপ্রহরে"কাল দেশে ধরিত্রী যখন দোলের পূর্ণিমায় ভেসে যাবে, আমার তো তখন দ্বিপ্রহর-ই থাকবে, হয়তো অলস নয়, আপাত গুরুত্বপূর্ণ সব কাজে ঠাঁসা। আবার আমার আকাশে জ্যোৎস্না ফুটতে ফুটতে দেশে রাত্রির আয়ুষ্কাল সমাপ্ত...।একই পৃথিবীতে বাস করেও প্রিয় সময়, প্রিয় উৎসব, প্রিয় মানুষদের সাথে দিন আর রাতের ব্যবধানে তৈরি হওয়া বেদনাদায়ক দূরত্বকে অতিক্রম করে সবাইকে জানাই দোল পূর্ণিমার শুভেচ্ছা... হ্যাপি হোলি... H A P P Y H O L I...

প্রভাতী দাস: প্রকৃতির মতিগতি আন্দাজ করা সবসময়-ই কঠিন, তার মধ্যে ঋতু বদলের সময় হলে তো কথাই নেই। এখানে এখন চলছে তেমন একটা সময়, শীতের চলে যাবার সময় এলো প্রায়। কিন্তু তিনি এই দীর্ঘ চারমাস ধরে প্রবল অধিকারে রাখা ধরিত্রী’কে প্রায় আসন্ন বসন্তের প্রযত্নে রেখে চলে যেতে ঠিক রাজী নন। আবার বসন্ত-ই বা তার প্রাপ্য এখতিয়ার ছাড়বেন কেন? এই দুজনের অধিকার প্রতিষ্ঠার লড়াই চলছে নিত্য; আজ শীত জয়ী তো কাল বসন্ত। তাই আবহাওয়ায় চলছে নিত্য অদলবদল। গতকাল চারদিকে বেজেছিল বসন্তের জয়ডঙ্কা, আজ বাতাসে বাজছে শীতের উল্লসিত কীচক।

তাপমাত্রা সকালে ছিল হিমাঙ্কের নিচে, কিন্তু তার চেয়েও বেশী হলো শো শো বাতাস, হিম-শীতল এবং বেশ শক্তিশালী। বাড়িঘর উড়িয়ে নিয়ে যাবে বলে মনে হয়েছে সারারাত। সকালের ড্রাইভে আমার স্বভাবসুলভ হাইস্পিড তুলতে তো পারিনি-ই, তারপরও আবার দুই হাতে শক্ত করে স্টিয়ারিং ধরে রাখতে হচ্ছিল, নাহলে লেন ঠিক রাখা কঠিন হয়ে পড়ছিল। হাসপাতালের থেকে অফিসের ফিরতি পথটা খুব নিরিবিলি, দুইপাশে দীর্ঘকায় সব গাছের সারি। এখনো পাতা নেই। হাওয়ার শো শো আওয়াজ এড়াতে প্লেয়ারে গান বাজাতেই শ্রীকান্ত’ দরাজ গলায় গেয়ে উঠলেন,

“এই উদাসী হাওয়ার পথে পথে মুকুলগুলি ঝরে
আমি কুড়িয়ে নিয়েছি, তোমার চরণে দিয়েছি–
লহো লহো করুণ করে…”

মনে পড়ল, দেশে এখন চৈত্র মাস। আমের মুকুল ঝরে পড়ছে পথে পথে চৈতালি হাওয়ায়…, আমার পথের দুই ধারে পত্রহীন বৃক্ষরাজি। শ্রীকান্ত গেয়ে চলেন,

“যখন যাব চলে ওরা ফুটবে তোমার কোলে,

তোমার মালা গাঁথার আঙুলগুলি মধুর বেদনভরে
যেন আমায় স্মরণ করে”

ফাগুনের কৃষ্ণচূড়া, পলাশ, শিমুল…! এখানে চেরী ফুটতে আরো বেশ দেরী আছে। চৈত্রের বকুল কুড়িয়ে মালা কেউ গাঁথে না এখানে, যদিও মধুর বেদনভরে স্মৃতির মালা গাঁথা হয় অনেক-ই …। যাহ, মন খারাপ হতে শুরু করেছে…। গান বেজে চলছে, শ্রীকান্ত দ্বিতীয় অন্তরা শুরু করেন…

“বউকথাকও তন্দ্রাহারা বিফল ব্যথায় ডাক দিয়ে হয় সারা
আজি বিভোর রাতে।
দুজনের কানাকানি কথা দুজনের মিলন বিহ্বলতা,
জ্যোৎস্না ধারায় যায় ভেসে যায় দোলের পূর্ণিমাতে।
এই আভাসগুলি পড়বে মালায় গাঁথা কালকে দিনের তরে
তোমার অলস দ্বিপ্রহরে”

এ দেশে বউকথাকও নেই, আমি নিশ্চিত। তবে হ্যাঁ, দোল পূর্ণিমা তো আসবেই; হয়তো অন্য কোন নামে। মনে পড়ল মার্চের পূর্ণ চাঁদকে এরা বলে, ওয়ার্ম মুন। এসময়ে তাপমাত্রা বাড়তে শুরু করে, ভূমি কেঁচোর খেপ ফিরে আসে, ফিরে আসে রবিন তার মোহনীয় আভিজাত্যে। ওয়ার্ম মুন শুনতে একটুও ভালো লাগছে না। খুঁজে দেখি আরো নাম আছে, ক্রো মুন (কাকেরা শীতের শেষে আবার ডাকাডাকি শুরু করে বলে), ক্রাস্ট মুন( দিনের গরম তাপমাত্রায় তুষার গলে যায়, আবার রাতে তাপমাত্রা নেমে গেলে জল জমে বরফ হয়ে যায় বলে) এবং স্যাপ মুন( ম্যাপেল গাছ থেকে এই সময় রস সংগ্রহ করা শুরু হয় বলে)। নাহ, একটি নামও ঠিক পছন্দ হোল না, হৃদয় ছোঁয়ার প্রশ্নই উঠে না!

‘দোল পূর্ণিমা’ কি অনন্য একটি নাম। এদিন দেশে দোল পূজা, হোলি রঙে রঙে রাঙিয়ে দেয়া সবাইকে। ভাবতে না চাইলেও ভাবনায় বারবার ফিরে আসে হোলির সেই অকৃত্রিম আনন্দের দিনগুলির কথা, দেখতে না চাইলেও চোখের সামনে ভেসে ওঠে দোলের পাঁচ বা সাত সোপানের মঠ যার মাথায় ছোট্ট তুলশী চারা, মঠের কোনায় কোনায় উড়ছে লাল-নীল-হলুদ-সবুজ-নীল-গোলাপী ত্রিকোনা কাগজের পতাকা। আর সোপানে সোপানে ছড়ানো নানা রঙের আবীর আর ভাঁটফুল, মঠের তলায় পূজার সব উপকরণ, চাল-কলা, ফল-মিষ্টি, নারকেল; ঘটের উপড়ে আমের পল্লব, হরিতকী, কলা, ফুল, পাশে কাসার বাটায় গুলানো চন্দন, কর্পূর, তিল, ফুল, জল। পিছনে সবাই অধীর আগ্রহে পূজা শেষ হবার অপেক্ষায়, সাথে বালতি ভরা গুলানো আবীর আর বাঁশের পিচকিরি, কারো কারো হাতে গুড়ো আবীর….., কে কাকে আগে রাঙিয়ে দিতে পারে, তার কি তীব্র প্রতিযোগিতা! সেই উচ্ছ্বাস, সেই আনন্দ কেবল দোল পূর্ণিমাতেই সম্ভব, ক্রো মুন, ক্রাস্ট মুন, স্যাপ মুন………, নাহ, কিছুতেই না।

আমি বরং গানে মন দেই…,

“দুজনের কানাকানি কথা দুজনের মিলনবিহ্বলতা,
জ্যোৎস্নাধারায় যায় ভেসে যায় দোলের পূর্ণিমাতে।
এই আভাসগুলি পড়বে মালায় গাঁথা কালকে দিনের তরে
তোমার অলস দ্বিপ্রহরে”

কাল দেশে ধরিত্রী যখন দোলের পূর্ণিমায় ভেসে যাবে, আমার তো তখন দ্বিপ্রহর-ই থাকবে, হয়তো অলস নয়, আপাত গুরুত্বপূর্ণ সব কাজে ঠাঁসা। আবার আমার আকাশে জ্যোৎস্না ফুটতে ফুটতে দেশে রাত্রির আয়ুষ্কাল সমাপ্ত…।

একই পৃথিবীতে বাস করেও প্রিয় সময়, প্রিয় উৎসব, প্রিয় মানুষদের সাথে দিন আর রাতের ব্যবধানে তৈরি হওয়া বেদনাদায়ক দূরত্বকে অতিক্রম করে সবাইকে জানাই দোল পূর্ণিমার শুভেচ্ছা… হ্যাপি হোলি… H A P P Y H O L I…

(লেখক যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী চিকিৎসক)

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.