“রাঙ্গিয়ে দিয়ে যাও যাও…………………”

Ritu
প্রভাতী দাস

প্রভাতী দাস: ‘দোল পূর্ণিমা’ বা ‘হোলি’ হিন্দুদের এক পবিত্র উৎসব । নানান রীতিতে বাংলা এবং ভারতের সর্বত্র এই উৎসব পালিত হয়। হোলি উৎসবের পেছনে বিভিন্ন পৌরাণিক ও লোককাহিনী প্রচলিত আছে এর মধ্যে প্রধান ‘হোলিকা দহন’ কাহিনী ।

দৈত্যরাজ হিরণ্যকশিপু  ব্রহ্মার বরে বলীয়ান হয়ে দেবলোক আক্রমণ করে, দেবলোক তার পরম শত্রু । কিন্তু হিরণ্যকশিপুরই পুত্র প্রহ্লাদ ভগবান বিষ্ণুর পরম ভক্ত, তাকে হত্যা করার নানান ষড়যন্ত্র করে পিতা হিরণ্যকশিপু ।ব্যার্থ  হয় সব বিষ্ণুর আশীর্বাদে। হিরণ্যকশিপুর ভগ্নী হোলিকাও ছিল বর প্রাপ্ত যে, অগ্নি তাকে বধ করতে পারবেনা । সুতরাং হিরণ্যকশিপু হোলিকার কোলে বালক প্রহ্লাদকে বসিয়ে আগুন লাগিয়ে দিল। দাউদাউ অগ্নিশিখার মধ্যে প্রহ্লাদ ভগবান বিষ্ণুকে স্মরণ করেন। বিষ্ণুর কৃপায় প্রহ্লাদ অগ্নিকুণ্ড থেকেও অক্ষত থেকে যায় আর হোলিকা পুড়ে নিঃশেষ হয়ে যায়। এই থেকেই হোলি কথাটির উৎপত্তি ।

বাংলায় আমরা বলি ‘দোলযাত্রা’ আর পশ্চিম ও মধ্যভারতে ‘হোলি’। আমাদের অনেক ধর্মীয় উৎসবেই আঞ্চলিক লোক-সংস্কৃতি ও রীতির প্রভাব দেখা যায়, হোলিও তার ব্যতিক্রম নয়। বাংলার দোলযাত্রায় গৌড়ীয় বৈষ্ণব রীতির প্রাধান্য, এখানে মুলতঃ রাধা-কৃষ্ণের প্রেম লীলার বার্তাই সঞ্চারিত হয় । আর্য যুগ থেকে এ উৎসব চলে আসছে বলে শোনা যায়। তবে এর উদযাপনের রীতিনীতি পালটেছে সময়ের সাথে সাথে।  বিবাহিত নারীরা পুরাকালে তার পরিবারের মঙ্গল কামনায় রাকা পূর্ণিমায় রঙের এই উৎসব করতেন ।

এখনও অনেক অঞ্চলে রঙ উৎসবের আগের দিন ‘হোলিকা দহন’ হয় অত্যন্ত ধুমধাম করে। শুকনো গাছের ডাল ,কাঠ, পাতা ইত্যাদি দাহ্য-বস্তু অনেক আগে থেকে সংগ্রহ করে তাতে আগুন ধরিয়ে দিয়ে ‘হোলিকা দহন’ হয়, অসুরত্ব আর অমঙ্গল বিনাশের মধ্য দিয়ে । পরের দিন সত্য, প্রেম আর মঙ্গলের উৎসব,  রঙের খেলা । দোল আমাদের ঋতুচক্রের শেষ উৎসব, পাতা-ঝরার সময়ে, বৈশাখের প্রতীক্ষায়। এই সময় পড়ে থাকা গাছের শুকনো পাতা, তার ডালপালা একত্রিত করে জ্বালিয়ে দেওয়ার মধ্যে এক সামাজিক তাৎপর্য খুঁজে পাওয়া যায়। পুরনো বছরের আবর্জনা পুড়িয়ে ফেলে নতুন বছরের জন্য পথের আলো খুঁজে নেবার প্রত্যাশায়, কবি গুরুর সেই গানের মত, 

“ব্যর্থ প্রাণের আবর্জনা পুড়িয়ে ফেলে, আগুন জ্বালো, আগুন জ্বালো………।”

দেশ ছাড়ার পর অনেক বছর গেছে এইরকম অনেক উৎসবের দিন মনেও আসত না। কিন্তু আজকাল ফেসবুক আর নেটের কল্যাণে সব কিছু জানতে হয়, জানা হয়ে যায়। আর আমার মত স্মৃতি কাতর মানুষের জন্য নির্ধারিত হয়ে যায় আরেকটি ডুবসাঁতার, অতীতে!

আমরা ছোটবেলা কাটিয়েছি গ্রামের বাড়িতে এবং মফঃস্বলে, তখন দেশে হোলি কোন বিশাল উৎসব ছিল না। হিন্দি সিনেমার কল্যাণে আজ যেভাবে আমরা সবাই হোলি খেলা দেখি, আমাদের উদযাপন ছিল তার চেয়ে অনেক ভিন্ন। মনে আছে দোলের পূর্ণিমা আসবার আগেই বাড়ীর উঠোনে তুলশী তলার পাশে মাটি দিয়ে দোলের মঠ বানান হতো। আঠালো মাটি জোগাড় করে বাড়ীতে সময় থাকতে আনানো নিয়ে ঠাম্মা (ঠাকুরমা) সবসময় উদ্বিগ্ন থাকতেন, অনেক  ঘুষ-ঘাষ দিয়ে একে ওকে ধরে কাজটি করিয়ে নিতেন তিনি। এরপর শুরু হত মাটি ভিজিয়ে মঠ বানানোর পালা, আর আমাদের আনন্দের শুরু……। 

বালতি বালতি জল দিয়ে মাটি নরম করে মাখানোর সময় ছোট ভাই আর আমি ছিলাম ঠাম্মার অপরিহার্য সঙ্গী, মাটি মেখে নিজেদের চেহারাটা দেখার মত হত, পুরোই মাটির পুতুল! কিন্তু তাতে কি? মায়ের বকুনি সামলাতে ঠাম্মা ত ছিলেনই, আমারা মহানন্দে চালিয়ে যেতাম। তুলশী তলায় সন্ধ্যা প্রদীপ জ্বালানোর ঠিক আগে আগে, ভাই আর আমাকে উঠোনের কলের পাড়ে স্নান করিয়ে তবে মা ঘরে নিতেন! পরদিন দুপুরের পরে আবার শুরু হত আমাদের মাটি মাখার উৎসব। প্রথমে গুলান মাটি দিয়ে পাঁচ বা সাত ধাপের একটা মঠ বানান হত, একটু শুকোলে তারপর আস্তে আস্তে ছুড়ি দিয়ে চেঁছে তাকে ছিমছাম সুন্দর করা হত।  আস্তে আস্তে মঠ শুকিয়ে এলে গুলানো মাটিতে লেপে মুছে তাকে আরও তীক্ষ্ণ সুন্দর করে তুলতেন মা-ঠাম্মা। ভাই আর আমার খেলার দিন ফুরিয়ে যেত মঠের কাঠামো টা হয়ে গেলেই। বাকিটা ছিল মা-ঠাম্মার কাজ। আমাদের তাই সবসময় উদ্দেশ্য থাকত মঠকে বড় বানানোর, কোন কোন বছর হত কোন কোন বছর ঠাম্মার শরীরে না কুলালে ছোট মঠ নিয়েই খুশী থাকতে হত। মঠের চূড়ায় ছোট্ট তুলশী গাছ লাগান হত। আর দোলের আগে আগে বাজার থেকে কিনে আনা হত বিভিন্ন রঙের আবীর; লাল, হলুদ, কমলা, গোলাপি, নীল,বেগুনী, সবুজ।

আমাদের আনন্দ দ্যাখে কে!! ভাইরা ওদের বন্ধুদের নিয়ে বাঁশের আগা কেটে পিচকিরি বানাত রঙ ছিটানোর জন্য। ছোট ছোট ঘটি এবং বালতি যোগাড় করা হতো রঙ গুলানোর জন্য।

দোল পূর্ণিমার দিন পুজো হত মঠের উপর, মা-ঠাম্মা উপোস করে দুপুরের মধ্যে পুজো শেষ করতেন। আমাদের মন থাকত না পুজোতে সেদিন, পুজোর হাজার রকমের প্রসাদের প্রলোভনের চেয়েও হোলিতে বড় হয়ে দাঁড়াত আবীর ছড়ানো, রঙ মাখানো, অধৈর্য অপেক্ষা চলত বড়দের হাঁ সূচক ইঙ্গিতের!  ত্ররপর আর আমাদের পায় কে? আবীর ছড়ানো শুরু হতো; শুরু হত বন্ধু, সমবয়সী অথবা দিদা-ঠাম্মাদের খুঁজে বেড়ানোর পালা। কত জন যে কত জায়গাই লুকোতেন সেদিন; খাটের তলায়, আলনার পিছনে, অহিন্দু বন্ধুদের বাড়ীতে……। খুঁজে বের করে রাঙ্গিয়ে দেবার আনন্দটা পুরোই আলাদা…! 

আমার বাবা অফিস থেকে ফিরতেন দেরি করে যাতে তাকে কেউ না পায়, কিন্তু ধরা ঠিকই পরতেন কারো না কারো হাতে। চলত রঙের খেলা; মুঠো মুঠো করে শুকনো ঝুরো আবীরের সাথে সাথে গুলানো রঙের ছড়াছড়ি পিচকিরি অথবা বালতি দিয়ে, দিনের শেষে সবাই রঙিন আবীরের আভরণে!

সেই আনন্দের দিনগুলি, বর্ণনা করি কি করে, আমার ভাষার সাধ্য কই!!  শুধু কানে ভেসে আসে সেই বাঁধ ভাঙা হাসি-আনন্দের কলতান, চোখ বন্ধ করলেই দেখি ছড়িয়ে যাওয়া লাল-নীল-সবুজ-হলুদ আবীরে তৈরি হওয়া আশ্চর্য সেই রঙের চাদর আর নিঃশ্বাসে খুঁজে পাই ধুপ-কর্পূর-তুলশী পাতার সেই মোহময়ী ঘ্রাণ…………………। দিনের শেষে আবারো কলের পাড়ে দাঁড়িয়ে লাইন ধরে স্নানের জন্য অপেক্ষা।। হায় শৈশব…….., সোনালী শৈশব………!

শেষ করি গুরুদেবের গানটা দিয়ে,

“রাঙ্গিয়ে দিয়ে যাও যাও যাওগো এবার যাবার আগে 

তোমার আপন রাগে, তোমার গোপন রাগে, 

তোমার তরুণ হাসির অরুণ রাগে,

অশ্রুজলের করুণ রাগে……. 

মেঘের বুকে যেমন মেঘের মন্দ্র জাগে

বিশ্ব নাচের কেন্দ্রে যেমন ছন্দ জাগে,

তেমনি আমায় দোল দিয়ে যাও 

যাবার পথে আগিয়ে দিয়ে

কাঁদন-বাঁধন ভাগিয়ে দিয়ে” ।।”

…………সবাইকে দোল পূর্ণিমার শুভেচ্ছা, মন রাঙিয়ে নিন লাল-নীল-সবুজ-হলুদ-গোলাপি আবীরে। 

(লেখক যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী চিকিৎসক)

 

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.