রোজ নামচা-১০

Black womenলীনা হক: প্রতি বছর আমাদের অফিসে ডেনমার্ক থেকে স্টুডেন্ট ইন্টার্নরা অভিজ্ঞতা অর্জন করতে আসে তিন মাস থেকে শুরু করে এক বছর মেয়াদী সময়ের জন্য। অনেকদিন আমি কোন ইন্টার্ন নেই নাই। একে তো এদের জন্য কাজ খুঁজে বের করা এক যন্ত্রণা, তার ওপরে এদেরকে সেই কাজ শেখাতে শেখাতে তাদের মেয়াদ শেষ হয়ে যায়।

কিন্তু এই বছর আর ফেরানোর উপায় নেই। হেড অফিস থেকে জানানো হল ইন্টার্ন নিতে হবে। সিভি ও পাঠিয়ে দিলো প্রায় গোটা সাতেক। এর মধ্যে থেকে বাছাই করে তিনজনের নাম পাঠালাম। দুটি মেয়ে আর একটি ছেলে। তাদের ইন্টারভিউ নেয়া হল, দুইজন কে নিব বলে ঠিক হল- একজন নেপাল আর ইন্ডিয়া অফিসে কাজ করবে আর একজন বাংলাদেশে। আমি মেয়েটিকে নিতে চাইলাম। ছেলে-মেয়ে দুজনেই কোপেনহেগেন ইউনিভার্সিটিতে মাস্টার্স করছে। ছয় মাস তারা কোন এনজিও তে কাজ করবে- এই ছয়মাস তাদের কোর্সের মূল সময়ের সাথে যুক্ত হবে।

শেষ মুহূর্তে মেয়েটি আসতে না পারায়, শুধু একজন ইন্টার্নই এই বছর বরাদ্দ হল- দিল্লী, কাঠমান্ডু আর ঢাকা অফিসে ঘুরে ঘুরে কাজ শিখবে সে। জয়েন করলো ছেলেটি কাঠমান্ডুতে। পঁচিশ বছর বয়সী তরুণ এই ইন্টার্ন এর নাম রাজেশ। রাজেশ হপার। রাজেশ ভারতীয় বংশোদ্ভূত ডেনিশ নাগরিক। ইন্টারনাশ্যনাল ডেভেলপমেনট স্টাডিজের ছাত্র।

এইবার আমি রুটিন মাফিক কাঠমান্ডুতে এসেছি, সেই সাথে যুক্ত হয়েছে রাজেশের ইনডাকসন (সংস্থার কার্যক্রমের সাথে পরিচিত করা ইত্যাদি), আমার সাথে সে দিল্লী যাবে আর তারপরে ঢাকায়। কাঠমান্ডু অফিসে ঢুকবার মুখেই লম্বা শ্যামলা চশমা চোখের তরুণ এগিয়ে এলো- “আমি রাজেশ, তোমার জন্য অপেক্ষা করছি সেই কখন থেকে!”

তাকে জড়িয়ে ধরে মুহূর্তের জন্য মনে হল আমার ছেলেকেই আলিঙ্গন করছি। কাঠমান্ডু অফিসে আমার বসার জন্য ছোট্ট একটি অফিস আছে, আমার টেবিলের পাশেই আরেকটি ছোট টেবিল দেয়া হয়েছে রাজেশের জন্য। কাজের কথার ফাঁকে ফাঁকে গল্প করি রাজেশের সাথে।

ডেনমার্কে তার পরিবারের গল্প, ইউনিভার্সিটির গল্প ইত্যাদি। আমার পরিবারের গল্পও করি তার সাথে। আমার কাছ থেকে নিজের আর বোনেদের নামের অর্থ জেনে নিয়ে খুব উত্তেজিত বোধ করে সে। বিশেষ করে যখন তাকে বলি তার নামে ছিলেন একজন বিখ্যাত সিনেমা তারকা! স্নেহ বোধ করি রাজেশের জন্য। আমার ছেলের বয়সী সে। এমনিতে হাসি খুশি, সব কিছুতে তার অসীম আগ্রহ কিন্তু কোথায় যেন একটু বিষণ্ণতা আছে তার চোখের তারায়।

চেন্নাইয়ের একটি অনাথালয় থেকে রাজেশ এবং তার বোন বাসন্তী যথাক্রমে পাঁচ আর আট বছর বয়সে দত্তক পরিবারে চলে যায় ডেনমার্কে। রাজেশের নিজের বোন (তার ভাষায় বায়লজিক্যাল সিস্টার) বাসন্তী ছাড়াও দিব্যা নামে আরেকটি বোন আছে, সেই মেয়েটি ও একই অনাথালয়ে ছিল। বাসন্তী এবং দিব্যা দুজনেই বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ ডিগ্রী নিয়ে ভাল জব করছে। রাজেশের ডেনিশ বাবা সাইকলজিসট আর মা স্কুল শিক্ষক। রাজেশরা তিন ভাই বোন এখনো বাবা মায়ের সাথে একসাথে থাকে, যা কিনা ডেনমার্কে বিরল ঘটনা যে ১৮ বছরের পরে ছেলে মেয়ে বাবা মায়ের সাথে থাকে!

দিব্যা বিয়ে করবে এই বছর শরতকালে। বাসন্তী চেষ্টা করছে কোন এনজিওতে বা জাতিসংঘে চাকরী নিয়ে বাইরের কোন দেশে কিছুদিন বসবাস করে আসতে। জিজ্ঞেশ করি রাজেশের ভবিষ্যৎ প্ল্যান কি। আমাকে অবাক করে দিয়ে সে বলে, বাবা মা বের করে না দিলে সে তাঁদের সাথেই থাকবে যতদিন সম্ভব। মাকে বড্ড ভালবাসে সে। মা ও রাজেশ অন্ত প্রাণ। বোনেরা এই নিয়ে খেপায় তাকে।

নেপালে আসার পরে প্রতিদিন সে একবার মায়ের সাথে কথা বলে। নিজে থেকেই বলে রাজেশ, সে খুঁজে পেয়েছে সেই অনাথালয়ের নাম ঠিকানা, চেষ্টা করেছে তার বায়োলজিক্যাল বাবা মায়ের সন্ধান পেতে। চেন্নাইয়ের উপকূলের গ্রামের জেলে পরিবারের কেউই বেঁচে নেই। ২০০৪ এর সুনামীতে ভেসে গেছে সেই গ্রাম। তবু রাজেশ একবার যেতে চায় সেই গ্রামে যেখানে তার জন্ম।

কিছু বলতে পারি না, কেমন যেন করে আমার বুকের মধ্যে। নিজের থেকেই রাজেশ বলে, কিভাবে আমরা অনাথয়ালয়ে এলাম জানিনা, perhaps we were abandoned ! আমার বুকের মধ্যে শেলের মতো বেঁধে abandoned শব্দটি। উত্তরে বলি রাজেশ, বসে বসে কোমর ধরে গেছে, চলো নীচে দুই রাউনড ব্যাডমিন্টন খেলে আসি। রাজেশ থাকছে ওআইএম সি এ ডরমিটরিতে। সে রান্না করতে শিখছে। আমার কাছ থেকেও সে দুটো রেসিপি লিখে নিলো- খিচুড়ি আর বেগুন ভাজা।

Leena with Rajesh
রাজেশের সাথে লেখক

আমার নিজের ছেলের কথা মনে পড়ে যায়, তার রান্না করা মাংসের কারি কালো রঙ হয়ে যায় সেই নিয়ে চিন্তিত সে মাকে বলে রেসিপিটা লিখে পাঠাতে। প্রতিদিন শেষ বিকেলে অফিস ফেরত আমাকে হোটেল পর্যন্ত সঙ্গ দেয় রাজেশ। নিজে থেকেই এই দায়িত্ব সে নিয়ে নিয়েছে। দুজনে হেঁটে আসি আমার হোটেল পর্যন্ত, তারপরে সে চলে যায় তার ডরমিটরিতে। প্রথম দিনের পর থেকেই অফিস থেকে নীচে নেমেই সে আমার ব্যাকপ্যাকটা নিজের কাঁধে নিয়ে নেয়, কারণ আমার পিঠের ব্যাথার কথাটা সে জেনে গেছে। তার এই মমতাভরা আচরণে বুকের মধ্যে মুচড়ে ওঠে।

সকাল ঠিক আটটা পয়তাল্লিশে রাজেশ আমার হোটেলের লবিতে, হেঁটে আসি দুজনে অফিসে, আমার ব্যাকপ্যাক রাজেশের কাঁধে। আমাদের অফিসে চা-কফি নিজেদেরকে বানিয়ে খেতে হয়। যতবার রাজেশ চা বানাতে যায় নিজের জন্য, আমার জন্যও নিয়ে আসে এক কাপ, চিনি ছাড়া জানে সে। দুপুরে আমার পাশের চেয়ারে বসে খাবার খায় সে। প্রায় প্রতিদিন বিকেলে অফিসে কিছু না কিছু স্ন্যাক্স খাওয়া হয়, আমি বিকেলে ভারী খাবার খেতে চাই না, আমার অংশটা রাজেশের জন্য প্যাক করে দেই। অফিসে সবাই হাসে, তুমি আরেকটি ছেলে পেয়েছ!

আজকে একটু তাড়াতাড়ি মানে ৫ টার মধ্যে অফিসের কাজ শেষ করতে পেরে বললাম রাজেশ, চলো দরবার স্কয়ারে যাই। দরবার স্কয়ারের চওড়া চত্বরে বসে কবুতরের ওড়া দেখতে দেখতে আমি আর রাজেশ গল্প করি। নেপালী মাসালা চিয়া পান করি। মুড়ি মাখা খাই। সন্ধ্যা নেমে আসছে, উঠে যাবো, হাওয়া কন কনে হয়ে উঠছে, শীত লাগতে শুরু করেছে।

আর একটু বসি, রাজেশ বলে। দরবার স্কয়ারের চত্বরের উপর দিয়ে অন্ধকার আর কুয়াশার মাখামাখি দেখি চুপ চাপ। পাশে থেকে বেজে ওঠে তরুণ এই ছেলেটির স্বর, “আমি জানি যদি আমরা তামিলনাডুর গ্রামেই থাকতাম আমি হয়তো মাছ ধরার নৌকোতে কাজ করতাম, বড়জোর প্রাইমারি স্কুলে যেতে পারতাম। বাসন্তীর বিয়ে হয়ে যেত আরেকটি জেলে পরিবারে। অথবা চেন্নাইয়ের কোন কারখানায় শ্রমিক হতাম অথবা কে জানে রাস্তায় ভিক্ষা করতাম, ড্রাগস নিতাম। আমার বর্তমান জীবন সেতো প্রায় স্বপ্নের মতন। আমার বর্তমান মা-বাবার চোখের মনি আমরা তিন ভাই বোন! কোন আফসোস নাই।”

আলতো করে ছুঁই রাজেশের কনুই, চলো উঠি। বলে চলে রাজেশ,” জানো, আমার মায়ের চেহারা আমি মনে করতে পারি না। বাসন্তী একটু মনে করতে পারে, লম্বা চুলের বেণীতে ফুলের মালা আর কপালে টিপ, সবুজ শাড়ী। কিন্তু আমার ধারণা, সে এটা কল্পনা করে নিয়েছে।”

আমি কিছু বলতে পারি না। রাজেশের স্বর কি একটু ভেজা শোনায়!” আমি অন্য কোন দেশে ইন্টার্ন নিতে পারতাম, কিন্তু এখানে নিয়েছি যে আমি চেন্নাই যেতে পারবো।”

বলে চলে রাজেশ, “তোমাকে দেখার আগ পর্যন্ত একটু নার্ভাস ছিলাম, শুনেছি তুমি একটু রাগী, কিন্তু তোমাকে যখন প্রথম দেখলাম লাল সবুজ শাড়ীতে, কপালে টিপ, তুমি আমাকে জড়িয়ে ধরলে, জানো, প্রথমবারের মতন মনে হলো, বাসন্তী কল্পনা করে না, আসলেই হয়তো আমার নিজের মা এমনই হতো!”

আমি রাজেশের হাত শক্ত করে ধরি, নিজের চোখের জল দেখতে দিতে চাই না, স্বর স্বাভাবিক করে বলার চেষ্টা করি, তুমি না হয় আজ থেকে আরেকটা মা পেলে রাজেশ।”

নিজের গলার স্বর নিজের কানেই অস্পষ্ট শোনায়।

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.