রোজ নামচা-০৮

women abstractস্বপ্ন কুঁড়ির মালা

লীনা হক: আন্তর্জাতিক নারীদিবস উপলক্ষে বিভিন্ন পণ্যে ছাড় ঘোষণা করা হয়েছে। হীরার গহনা থেকে শুরু করে কাপড় কাচার সাবান কিছুই বাদ নাই।নারীদের বিউটি পার্লার গুলোতেও দেয়া হচ্ছে মুল্য ছাড়! মুল্য ছাড়ের সুযোগ নিয়ে নিজের সৌন্দর্য জাদুমন্ত্রের মত বৃদ্ধি করার মানসে আমিও ছুটলাম ঘরের কাছের পার্লারটিতে। নামকরা পার্লার। তিনটি তলা জুড়ে কাজ চলছে। টাকা পয়সা দিয়ে বুকিং দিয়ে বসে রইলাম কখন আমার ডাক আসে। সৌন্দর্য পিয়াসী নারীকুলের কিচির মিচিরে মুখরিত অপেক্ষা করার লাউঞ্জটি। বিভিন্ন বয়সের নারী- টিন এজ থেকে শুরু করে আমার বয়সী বা আমার থেকে বেশীরাও আছেন।

কেউ চুল কাটাবেন, কেউ হাত পায়ের যত্ন করাতে এসেছেন, মেক আপের সেকশন আলাদা। চুলের পরিচর্যা হচ্ছে এক খানে। মেহেদী লাগানো হচ্ছে। বিশাল এক কর্মযজ্ঞ পরিচালিত হচ্ছে শুধুই নারীদের দ্বারা। সুপারভাইজার তরুনীরা চমৎকার অফিস ড্রেসে খুবই কনফিডেনট। মনটা কেমন গর্বে ভরে উঠতে লাগলো। বুকিং এর সময় আমাকে জিজ্ঞেশ করা হল আমার পছন্দের কোন কর্মী আছে কিনা- মানে অনেকই আছেন যারা নিয়মিত ক্লায়েন্ট, নিজের পছন্দমত কর্মীর হাতে কাজ করান। আমি একটু বোকা বোকা ভাবে কাউনটারে বসা সুশ্রী অল্পবয়স্ক মেয়েটি হেসে ফেলে, সে বুঝতে পেরেছে আমি নিতান্তই নাদান এই ব্যাপারে। এক সময় ভিতর থেকে ডাক এলো আমার।

রেখা নামের ২৩/২৪ বছরের একটি মিষ্টি চেহারার আদিবাসী মেয়ে এসে আমাকে ডেকে নিয়ে গেল। মেয়েটি ব্যস্ত হয়ে পড়ে আমার সৌন্দর্য বৃদ্ধি (?) করার নানা উপাদান প্রয়োগে আর আমি গল্প জুড়ে দেই মেয়েটির সাথে। নাম দিয়ে শুরু, বাড়ী ইত্যাদির কথাও আসে। তার বাড়ী হালুয়াঘাট উপজেলায় বলার সাথে সাথে আমি জানাই আমি ময়মনসিংহের মেয়ে।

প্রাথমিক আলাপের সময় একটু ফরমাল কাঠ কাঠ হয়ে থাকা তরুণীটি মুহূর্তেই আমাকে আপন ভেবে ফেলে। আলাপ হয়ে ওঠে আন্তরিক। রেখা তজু। গারো পাহাড়ের পাদদেশে মেঘারকান্দা গ্রামে তার বাড়ী। এস এস সি পাশ করতে পারে নাই, অংকে ফেল করার কারনে। তারপরে আর পড়া হয় নাই, ঢাকায় এসে বিউটি পারলারে কাজ নেয় সে। রেখার বিয়ে হয়েছে ৪ বছর আগে আশিস রংমা নামে আরেক গারো যুবকের সাথে। আশিস এস এস সি পাশ করে একটি বায়িং হাউসে কাজ করে। আদিত্য নামে দু বছরের একটি ছেলে আছে তাদের। আদর করে তারা শিশুটিকে দাকে ‘ জাজং’ বলে- মান্দি ভাষায় এর অর্থ ‘চাঁদ’!

কালাচানপুরে গারো সম্প্রদায়ের মানুষের সাথে এক পাড়ায় থাকে তারা, তাদের কাছেই ছেলেকে রেখে আসে সে। মাতৃতান্ত্রিক পরিবার প্রথায় বিয়ের পরে রেখা তার স্বামীকে তাদের বাড়ীতে নিয়ে এসেছে। জিজ্ঞেশ করি, স্বামী কি স্ত্রীর পদবী ধারন করেছে? রেখা হাসে, ‘না ম্যাডাম, ওই রকম না। পদবী বদলানো মুসলমান আর হিন্দুরা করে। গারোরা করে না!’ জানতে চাই কেমন লাগে তার এই কাজ। চমকে দিয়ে উত্তর দেয়,’ এটা একটা সেবা মুলক কাজ ম্যাডাম! প্রথম প্রথম ভাললাগত না। এখন ভালই লাগে। কেউ কেউ তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করেন কিন্তু বেশির ভাগ মানুষই ভালো আচরণ করেন।‘

জিজ্ঞেশ করি নিজের সৌন্দর্যের চর্চা সে করে কিনা! হাসে রেখা, সময় কই ম্যাডাম! সকাল ১০ টায় ডিউটি শুরু হয়ে শেষ হয় রাত সাড়ে ৮ টায়। দুপুরে খাবারের জন্য আধা ঘণ্টা ব্রেক। দুপুরের খাবার বাড়ী থেকে নিয়ে আসে। বিকেলে পার্লার থেকে নাশতা দেয়া হয়, রুটি কলা, পুরি, সিঙ্গারা এই সব। বেশিরভাগ সময় রান্না সে আগের রাতে করে রাখে। পরেরদিন তার নিজের আর স্বামীর খাবার টিফিন বাটিতে ভরে। সকালে তাড়াহুড়াতে ভালো করে নাশতা করতে পারে না। ছেলের খাবারের ব্যবস্থাও করে আসতে হয়। কালাচানপুর থেকে গুলশান ২ নম্বর পর্যন্ত হেঁটে আসতে প্রায় আধা ঘণ্টা লাগে। কাজে আসার পরে হাত মুখ ধুয়ে অফিসের দেয়া ড্রেস পড়তে হয়। মাইনা পায় সে ১৫ হাজার টাকা। বোনাস দেয়া হয় বছরে একবার এক মাসের বেতনের সমান। মুসলিমদেরকে দুই ঈদে ভাগ করে দেয়া হয়, হিন্দুরা পূজার সময় আর ক্রিশ্চিয়ানরা পায় বড়দিনের উৎসবে। সাপ্তাহিক ছুটি একদিন। সেটা একেজনের একেকদিন। রেখার স্বামীর ছুটি শুক্রবার বলে সে শুক্রবারে ছুটি নেয়।

বিয়ের আগে সে রবিবারে ছুটি নিত। জানতে চাই তার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কি! ম্যাসাজরত হাত দুখানা একটু স্লথ গতি হয়, না তাকিয়েও বুঝতে পারি রেখার চোখে স্বপ্নরা ভেসে বেড়ায়। কেমন আবেশ মাখানো স্বর কানে বেজে চলে। এই শহরে তার ভালো লাগে না। নিজের গ্রামটি একদম বুগাই নদীর তীরে। মান্দি রানী বুগাইয়ের নামে নদীটির নাম। নদীটি মেঘালয় থেকে নেমে আসা সোমেশ্বরী নদীর শাখা নদী। ওপাশেই ভারত। গর্জন গাছে ঘেরা এই আদিবাসী গ্রামটিতে ৩০ ঘর পরিবারের বাস। সবাই সবার আত্মীয়। ছোট্ট একটা গির্জা ঘর আছে। সেই গ্রামে উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া জমিতে রেখারা ঘর তুলছে। পাকা ঘর। একটু একটু করে তুলছে কারণ অত টাকা একবারে খরচ করার মতন সামর্থ্য তাদের নাই। খুব বেশী হলে আর বছর পাঁচেক পরে ফিরে যাবে মেঘারকান্দায়। আদিত্য বছর চারেকের হলে আরেকটি সন্তান নেবে তারা। মেয়ে সন্তানের শখ তাদের। ছেলে মেয়ে দুজনকেই পড়া লেখা করাবে তারা বিশেষ করে মেয়েকে যাতে তার মত কষ্ট করতে না হয়। মেয়েকে জয়রামকুড়া মিশন স্কুলে পড়াবে। মেয়ে যাতে শিক্ষক হয় সে স্বপ্ন দেখে রেখা।

যদিও আদিবাসীদের অনেক কষ্ট আর বঞ্চনা এই দেশে তবু দেশ ছেড়ে ভারতে যেতে চায় না রেখা। ‘নিজের মাটি, ম্যাডাম’! দিন কি আর সব সময় এরকম থাকবে! দিন তো বদলাবে। রেখার স্বর মেদুর হয়ে ওঠে। চোখ না খুলেও বুঝতে পারি অনাগত মেয়ে সন্তান ‘আস্কি’ (মান্দি ভাষায় এর মানে ‘তারা) বইয়ের ব্যাগ কাঁধে নীল সাদা স্কুল ড্রেসে স্কুলে যাচ্ছে ভাইয়ের হাত ধরে- রেখা তজু এই স্বপ্নে ঢুকে যাচ্ছে।

ঢাকা শহরের একটি বিউটি পার্লারের পায়রার খোপের মতন চাপা কাজের জায়গায় বসেই রেখা আসলে রয়েছে বুগাই নদীর তীরে মেঘারকান্দা গ্রামে। ঠিক যেন আমি- প্রতিদিন ঘুমুতে যাওয়ার আগে ব্রহ্মপুত্রের তীরে একটু হেঁটে আসি। স্বপ্নই বেঁচে থাকার সাহস যোগায়…রেখাকে, আমাকে, পৃথিবীর সকল সংগ্রামী নারী কে।

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.