রোজ নামচা-০৭

women abstractলীনা হক: মার্চ ২ সংখ্যায় প্রকাশিত আমার রোজ নামচার টুকরো কথা পড়ে অনেক কজন পাঠক আমার সাথে ফেস বুকে যোগাযোগ করেছেন, ফোন নাম্বার দিয়েছেন, আমারটা নিয়েছেন। অনেকেই চাকরিজীবী নারী, বলা যায় বেশীরভাগই ছোট সন্তানের মা।

সবার একই কথা, ‘আপা, লেখাটা পড়ে এতো কষ্ট লেগেছে’, কেউ আবার বলছে,’ ভয় লাগে আপা, আমার জীবনেও কি এমন হবে যে বাচ্চাদের বড় হওয়ার সময়টাতে কাছে থাকতে পারব না, পরে আফসোস হবে? এমনই কি হয়?”!

এক বাবা ফোন করেছেন কান্নাভেজা গলায়,’ আমিও তো আমার সন্তানদের বড় হয়ে ওঠা দেখতে পারি নাই চাকরির ছুটাছুটির কারণে। কিন্তু আমি তো সে কথা প্রকাশও করতে পারছি না কিন্তু কষ্ট তো আমার কোন মায়ের চাইতে কম নয়!’

অনেকে মন্তব্য করেছেন কিভাবে এই ধরনের পরিস্থিতি সামাল দেয়া যায়। সেই সব প্রিয় পাঠক এবং আমার উত্তরসূরিদের জন্য আজকের এই কটা লাইন।

আমার রোজ নামচায় লেখা প্রতিটা কথাই সত্যি, সেটা আমার জন্য সত্যি। কিন্তু তাই বলে সবার বেলায় যে সেকথা একইভাবে সত্যি হবে তাতো নয়। সন্তানের বড় ওঠার সময়টাতে মা বাবা দুজনের সঙ্গই সন্তানের প্রয়োজন। আমাদের দেশে বা হয়তো সারা পৃথিবীতেই সন্তানের লালন-পালনের দায়িত্ব মূলত মায়ের- এই ধারনার একটা প্রচলন আছে। কিন্তু আমি দেখেছি কিভাবে মায়ের ব্যস্ত সরকারি চাকরির ছুটোছুটির সময়টাতে কলেজ শিক্ষক বাবা সন্তানকে আগলে রেখেছেন, তার বড় হওয়ার সময়ের নানা পরিবর্তনের সাথে তাল মেলাতে সহায়তা করেছেন। আজকের পরিবর্তিত এবং দৌড়ে চলা পৃথিবীতে নারী-পুরুষ সবাইকে যেকোনো অর্থনৈতিক কার্যক্রমের সাথে যুক্ত হতে হয়। মেয়েরা অনেক বেশী বাড়ীর বাইরে থাকছে, নানা ধরনের চ্যালেঞ্জিং পেশাকে বেছে নিচ্ছে।

আর কেনই বা না? পৃথিবী এগিয়ে যাচ্ছে নারীরাই বা পিছিয়ে থাকবে কেন! এখন নারীরা প্রথাগত কিছু চাকরির বাইরেও আরও নানা ধরনের কাজ করছে। কাজের সময় ধরা বাঁধা থাকছে না, কর্মসূত্রে নারী কর্মীকে বিভিন্ন জায়গায় যেতে হচ্ছে। পরিবার-সন্তানকে ছেড়ে থাকতে হচ্ছে অনেকটা সময়। তবে মূল সমস্যা অন্য জায়গায়। যে হারে নারীরা বাইরের কাজে এগিয়ে এসেছে সেই আনুপাতিক হারে প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যবস্থাপনায় নিয়োজিতদের কর্মী মঙ্গল (staff welfare) বা কর্মী উন্নয়ন (staff development) বিষয়ে তেমন কোন ধারণা কাজ করছে না। যেটুকু আছে তা প্রথাগত কিছু বিষয় যেমন নানাধরনের অর্থনৈতিক সুবিধা বা কিছু ট্রেনিং এর ব্যবস্থা করা, এতেই যেন প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব শেষ। অনেক প্রতিষ্ঠানেই মানবসম্পদ উন্নয়নের দায়িত্তপ্রাপ্ত হয় administration and finance বিভাগ। তাদের না থাকে প্রয়োজনীয় জ্ঞান বা দক্ষতা। বেশীরভাগ ক্ষেত্রেই পেশাজীবনটাকে দেখা হয় অত্যন্ত অপেশাদারভাবে (নারী পুরুষ উভয়ের জন্য প্রযোজ্য, নারী ভুক্তভোগী বেশী মাত্রায়)। প্রায় কোন প্রতিষ্ঠানই তার কর্মীর পেশাজীবন আর ব্যক্তিজীবনের ব্যালান্স সমন্বয় করবার কোন ব্যবস্থা রাখে না। আর আমরা কর্মীরাও বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই পেশাগত কাজের অত্যধিক চাপের কারনে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের কথা অফিসে বলতে পারি না।

আবার এটাও দেখা যায়, কর্মক্ষেত্রে প্রতিদ্বন্দ্বিতা/ competition এর কারণে শেষ পর্যন্ত বলি দিতে হয় পরিবারের বরাদ্দ সময়কে। ভুক্তভোগী হয় আমাদের সন্তানরা। অনেক বিদেশী অফিসে, কর্মী ব্যবস্থাপনা করা হয় অত্যন্ত দক্ষতার সাথে। আমার নিজের অফিসের কথাই বলতে পারি, বছরের শুরুতে যখন অ্যাকশন প্ল্যান করা হয়- সবার আগে দেখা হয় কর্মীদের বিশেষ করে নারী কর্মীদের সন্তানদের পরীক্ষার সময়গুলোতে যেন এমন কোন ইভেন্ট না ফেলা হয় যাতে কর্মীটির পারিবারিক জীবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়। যেমন আমাদের অফিসে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে ছয় বছর বয়সের সন্তানদের নিয়ে অফিস করার নিয়ম আছে, যদি প্রয়োজন হয়।

আর একটা জিনিস আমি নিজে থেকেই করি, আমার সন্তানের পরীক্ষা বা অন্য কোন প্রয়োজনের সময় আগে থেকেই অফিসকে জানিয়ে রেখেছি, যাতে ওই সময় আমাকে দেশের বাইরে ট্যুরে যেতে না হয়। নারী কর্মীদের নিজের থেকেই সংকোচ বাদ দিয়ে এই কাজটি করতে পারতে হবে। নিজের সমস্যার সমাধানের পথ নিজে বাতলে দিলে তার চাইতে ভালো আর কিছু নয়। নারীটির ও কোন ধরনের অপরাধবোধ কাজ করা উচিত না। কাজটা আপনি পরিবার ও দেশের জন্যই করছেন। এবং আপনার যোগ্যতা বলেই করছেন, কারও দয়ায় নয়। অন্য সহকর্মীদের সহযোগিতামূলক মনোভাবও থাকা দরকার। এই জন্য দরকার প্রতিষ্ঠান গুলোতে কর্মী ব্যবস্থাপনা বিষয়ে দক্ষতা বৃদ্ধি।

এবার আসি পরিবারে, আসলে পরিবারে অন্য যারা সদস্য আছেন, বিশেষ করে স্বামী বা শাশুড়ি, তাঁদেরকেও বুঝতে হবে যে নারীটি আনন্দ করার জন্য সন্তান রেখে ঘরের বাইরে যাচ্ছেন না। দুজনে মিলেই সংসার। কাজেই স্ত্রীর অফিসের জরুরি ব্যস্ততার সময়ে যতটুকু সম্ভব স্বামী যদি একটু বেশী সময় সন্তানদের সাথে থাকেন – তার চাইতে ভালো আর কিছু হয় না। আসলে এতো কিছুর পরও, মায়ের মনটা অস্থির থাকে সন্তানের জন্য, সন্তানের বেড়ে ওঠা দেখার স্বর্গীয় আনন্দ পাওয়ার জন্য।

কিন্তু তরুণী মায়েদের বলি, বেশী সময় আর কোয়ালিটি সময় – এই দুটোর পার্থক্য বুঝে নিন। এমন মাকে জানি, চাকরি ছেড়ে দিয়েছেন সন্তানকে মানুষ করার জন্য- কিন্তু সন্তানের সাথে সখ্যতা গড়ে তুলতে পারেন নাই। এমন মাকেও জানি, বছরের আট মাস থাকেন দেশের বাইরে, তাঁর সন্তান সব কথাই মাকে শেয়ার করে। আসলে সন্তানের জন্য মায়ের বা বাবার বুকের গভীরে যে টান, তাতো কোন নিয়ম বা সংজ্ঞায় ফেলা যাবে না। সেই টান চিরন্তন। যত করি না কেন মনে হয় আরও বেশী তো করতে পারতাম! সেই গল্পের মতন যেখানে, প্রেমাস্পদের আবদারে মায়ের কলিজা হাতে করে নিয়ে যাওয়ার সময় সন্তান হোঁচট খেলে কাটা কলিজা বলে ওঠে, আহারে বাছা আমার, ব্যথা পাসনি তো মানিক আমার! এখানে গল্পটি মিথ, কিন্তু মায়ের অনুভবটি চিরন্তন। (চলবে)

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.