আবারও ধর্ষকের সঙ্গে বিয়ে!

Rape protest
ফাইল ছবি

উইমেন চ্যাপ্টার: আবারও ধর্ষকের সঙ্গে ধর্ষিতার বিয়ের ঘটনা ঘটেছে। তবে এবার এই বিয়ের মধ্যস্থতা করেছে কোন গ্রাম্য সালিশী নয়, খোদ পুলিশ। ঘটনাটি ঘটেছে ভারতের পশ্চিমবঙ্গে। ধর্ষিতা নাবালিকার সঙ্গে ধষর্কের বিয়ে দিয়ে দিয়েছে পুলিশ, এমন অভিযোগে নিজের দুই মেয়েকে বাঁচাতে হাইকোর্টের দ্বারস্থ হয়েছেন মা।

উত্তর ২৪ পরগনার দত্তপুকুরের বাসিন্দা ওই মা অভিযোগ করেছেন, তাঁর নাবালিকা ছোট মেয়েটি আগেই ধর্ষণের শিকার। পুলিশের হস্তক্ষেপে নাবালিকা ওই মেয়ের বিয়ে দেওয়া হয়েছে অভিযুক্তের সঙ্গে। কিন্তু এখন ওই যুবকের নজর গিয়ে পড়েছে তাঁর অন্য মেয়ের উপরে। দিদিকে পাওয়ার জন্য নাবালিকা স্ত্রীর উপরে সে অত্যাচার চালাচ্ছে বলে জানান ওই মা। বিয়ের ছ’মাস পরে মেয়েটি নিজেই থানায় এই অভিযোগ দায়ের করেছে স্বামীর বিরুদ্ধে।

এ ঘটনায় নড়েচড়ে বসেছেন বিচারকরা। হাইকোর্টের বিচারপতি দীপঙ্কর দত্তের প্রতিক্রিয়া, “এ এক ভয়াবহ ঘটনা। শুধু ভয়াবহই নয়। এই মামলা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণও বটে।” বিচারপতি দত্ত সংশ্লিষ্ট ম্যারেজ রেজিস্ট্রারকেও মামলায় জড়িয়ে নিয়েছেন। নাবালিকার দিদির মোবাইলে অভিযুক্ত যে সব বার্তা পাঠিয়েছে তার সিডি আদালতে পেশ করার নির্দেশ দিয়েছেন। ১৯ মার্চ মামলাটির পরবর্তী শুনানি হবে। উত্তর ২৪ পরগনার পুলিশ সুপার তন্ময় রায়চৌধুরী বলছেন, “পুলিশ বিয়ে দিতে যায়নি। তবুও অভিযোগটি আমরা খতিয়ে দেখছি।”

জানা গেছে, আবেদনকারী ওই মায়ের ছোট মেয়েটির বয়স এখন ১৬। ২০১৩ সালের ৮ জুলাই সে কম্পিউটার ক্লাস করে বাড়ি ফিরছিল। এমন সময়ে ভিক্টর রায় বলে স্থানীয় এক যুবক মোটরবাইকে চেপে তার পথ আটকায়। মেয়েটিকে মোটরবাইকে তুলে উধাও হয়ে যায় সে। বাড়ি ফেরার সময় পেরিয়ে যাওয়ার বেশ কিছুক্ষণ পরে মেয়েটি ফেরে এবং মাকে চিঠি লিখে জানায়, সে ধর্ষণের শিকার। নিজের মুখে মাকে ঘটনাটা জানাতে সে কুণ্ঠা বোধ করেছিল।

এই ঘটনার পর মেয়েকে নিয়ে বারাসত থানায় যান মা। কিন্তু বারাসত থানা অভিযোগ না নিয়ে তাঁদের দত্তপুকুর ফাঁড়িতে পাঠিয়ে দেয়। সেখানে অভিযুক্ত ভিক্টরকে ডেকে পাঠানো হয়। ভিক্টরের এক আত্মীয় কলকাতা পুলিশে চাকরি করেন। তাঁরই মধ্যস্থতায় পুলিশ নাবালিকা ওই কিশোরীর সঙ্গে ভিক্টরের বিয়ের চেষ্টা চালায় বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়। সেই রাতেই দত্তপুকুর ফাঁড়িতে বসে বিয়ে ঠিক হয়ে যায়। ২৪ জুলাই সামাজিক মতে এবং রেজিস্ট্রি করে বিয়ে হয়।

তবে পুলিশ সুপার বলেছেন, বিয়ের রেজিস্ট্রিতে মেয়ের বাবা-মায়ের স্বাক্ষর রয়েছে। এর জবাবে মেয়ের বাবা-মা জানান, পুলিশি চাপের কাছে নতিস্বীকার করতে তারা বাধ্য হয়েছিলেন।

কিন্তু মেয়ে নাবালিকা জেনেও ম্যারেজ রেজিস্ট্রার বিয়ে দেয়ায় এবং বিয়ের আগে এক মাসের নোটিস না দেয়ায় সংশ্লিষ্ট ওই ম্যারেজ রেজিস্ট্রারকে এই মামলার অন্তর্ভুক্ত করতে বলেছেন বিচারপতি।

ভিক্টরদের বাড়িও দত্তপুকুরে। তার বয়স ২২। ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র সে। ক্যারাটের ব্ল্যাকবেল্ট। তার এক কাকা থাকেন দুবাইয়ে। সেই কাকার পাঠানো টাকাতেই সংসার চলে। বন্ধুবান্ধব নিয়ে মোটরবাইকে চেপে এলাকায় চক্কর মারাই ভিক্টরের নেশা।

জুলাই মাসে বিয়ে হয়ে যাওয়ার পরে এ বছর ১০ ফেব্রুয়ারি নাবালিকা মেয়েটি ফের ভিক্টরের বিরুদ্ধে দত্তপুকুর থানায় নির্যাতনের অভিযোগ দায়ের করে। তাতে বলা হয়েছে, ছ’ মাস ধরে তার উপরে দৈহিক-মানসিক অত্যাচার চালানো হয়েছে। ইতিমধ্যে মেয়েটি অন্তঃসত্ত্বাও হয়ে পড়েছে।

আদালত সূত্র জানায়, ভিক্টরের টাকাপয়সা সংক্রান্ত কোনও দাবি নেই। সে স্ত্রীর দিদির সঙ্গে দৈহিক সম্পর্কে লিপ্ত হতে চায়। সেই জন্য দিদিকে নিজের বাড়িতে এনে রাখতে চায়। দাবি পূরণ না হলে অত্যাচারের মাত্রা বাড়বে বলে মেয়েটিকে হুমকি দিয়েছে সে। মোবাইলের হোয়াটস্যাপ এবং মেসেজে বারবার বড় শ্যালিকাকে কুপ্রস্তাব পাঠিয়েছে। তাকেও জানিয়েছে, প্রস্তাবে সম্মত না হলে বোনের প্রতি অত্যাচার বাড়বে। অভিযোগ, ভিক্টর বলেছে একমাত্র দিদিই পারে বোনকে সুখে সংসার করার ব্যবস্থা করে দিতে।নির্যাতিতা কিশোরী মেয়েটি বলছিল, “আমি অনেক দিন ধরে অনেক অত্যাচার সয়েছি। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ও যখন আমার দিদির দিকে হাত বাড়াল, আমি পুলিশে অভিযোগ দায়ের করলাম।” এর পরেও ভিক্টরকে প্রথমে পুলিশ ধরেনি বলে মেয়েটি অভিযোগ করে। তখন মেয়েটির মা প্রতিবেশী এক মুহুরিকে দিয়ে বিষয়টি লিখিয়ে স্থানীয় ফাঁড়িতে জমা দেন। ভিক্টর গ্রেফতার না হওয়ায় ২০ ফেব্রুয়ারি হাইকোর্টে মামলা করেন মেয়েটির মা। বিচারপতি দত্ত ওই মুহুরিকেও মামলায় জড়িয়ে নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন।

হাইকোর্টে মামলা দায়ের হওয়ার পরে অবশ্য নড়ে বসেছিল পুলিশ। ২ মার্চ বীজপুর থানা এলাকা থেকে তাকে গ্রেফতার করে দত্তপুকুর থানার পুলিশ। সে এখন পুলিশি হেফাজতেই রয়েছে। বারাসত আদালতে পৃথক ভাবে তার মামলা চলছে।

এদিকে ভিক্টরের পরিবারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, বিষয়টি হাইকোর্টের বিচারাধীন। তাই এ নিয়ে বিস্তারিত মন্তব্য করা ঠিক হবে না। তবে আদালত যে যে নির্দেশ দিয়েছে আমরা সেই ভাবেই আমাদের পরবর্তী পদক্ষেপ করব। বারাসত আদালতে ওই নাবালিকার মায়ের আইনজীবী গৌরাঙ্গ পাল বলেন, “হাইকোর্টের এ দিনের নির্দেশের পরে আমরা বুকে বল পাচ্ছি। এই ভয়াবহ ঘটনার সঙ্গে জড়িত সবাইকে শাস্তি পেতে হবে।”

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.