সাহেরা কথা-০৮

Leena Haqলীনা হক: খুব জরুরি মিটিং এর জন্য গত সপ্তাহে কাঠমান্ডু যেতে হয়েছিলো। একদিন যাওয়া, পরের দিন সারাদিন মিটিং,তারপরের দিন সকালে মিটিং শেষে বিকালের ফ্লাইটে সন্ধ্যের মধ্যে ঢাকায় ফেরত আসা। ফিরেই আবার পরদিন সকালের ফ্লাইটেই সৈয়দপুর হয়ে রংপুর যেতে হবে পুরো এক সপ্তাহের জন্য।

ফোন করলাম সাহেরাকে যাতে আমি পৌঁছার পরেরদিন সে একটু তাড়াতাড়ি আসে, কারণ আমার কোন কিছু গোছানো নাই রংপুর যাওয়ার জন্য। রংপুরে এখনও বেশ ঠাণ্ডা, গরম কাপড় নিতে হবে, সাত দিনের মতন কাপড়, চরে যেতে হবে তার জন্য জুতো, ছাতা ইত্যাদির প্রস্তুতি। সাহেরার সহযোগিতা ছাড়া বেশ কষ্ট।

সাধারণত আমি বাইরে কোথাও থেকে ফোন করলে সাহেরা খুব উত্তেজিত থাকে। ভাল আছি কিনা, খাচ্ছি কিনা ঠিকমতো, গাছগুলোর জন্য যেন চিন্তা না করি, সাবধানে যেন থাকি ইত্যাদি কত কথা এক নিঃশ্বাসে সে বলে। ফিরে আসার পরেও সাহেরা খুব আগ্রহী হয়ে নানা কথা জানতে চায়, তার বা তার মেয়ের জন্য সব সময়ই কিছু না কিছু উপহার থাকে, সেইগুলো নিয়ে উচ্ছ্বসিত হয়। কিন্তু এইবার ফোনের অন্যপ্রান্তে সাহেরার কণ্ঠ ম্লান শোনায়। লং ডিসটান্স কল এ বেশি কিছু জিজ্ঞ্যেস করি না, কিন্তু মনের মধ্যে ব্যাপারটা থেকে যায়।

ওর স্বামীটি সাহেরার নিজের ভাষায় ‘ ভাদাম্যা’- রোজগার তো তেমন কিছু করে না, উল্টা আরও নানাধরনের যন্ত্রণা তৈরি করে সাহেরার জন্য। ভাত দেয়ার ভাতার নয় কিল মারার গোঁসাই ধরনের। সেই কিছু করলো কিনা আবার! সাহেরার দুটি মেয়ের মধ্যে বড়টি থাকে তার মায়ের কাছে- বাচ্চাটির কোন সমস্যা হল নাকি! সাহেরা আমাকে বাড়ীর কাজে সহায়তা করে, কিন্তু সে আসলে আমার পরিবারের একজন।

সাহেরার যে কোন সমস্যা, কষ্ট আমাকে ব্যথিত করে, ভাবায়। কাঠমান্ডু ফ্লাইট যদিও সময় মতো ছিল, ইমিগ্রেশনে কোন লাইন না থাকাতে খুব তাড়াতাড়ি হয়ে গেল সব, কিন্তু আমার লাগেজ আর আসে না। লাগেজ বলতে রিজিওনাল অফিস থেকে প্রচুর কাগজপত্র যা একটি কার্টুনে ভরে নিয়ে এসেছি, সেই কার্টুন উপস্থিত হল সবার শেষে। বাসায় পৌঁছুতে পৌঁছুতে সন্ধ্যে উৎরে রাত নেমেছে ঢাকায়।

সাহেরাকে আবার ফোন করলাম, সে আমাকে চিন্তা না করতে বলে জানালো, সাড়ে সাতটার মধ্যে সে চলে আসবে। সোয়া সাতটায় সাহেরা উপস্থিত। মলিন চেহারা। বললাম, আগে চা বানাও দুজনের জন্য তারপরে গোছানোর কাজ। চা হলে জিজ্ঞেশ করলাম কি হয়েছে তার? ‘তেমন কিছু নোয়ায় (নয়) আফা’! তো চেহারা এমন কেন, দুদিন আগেই তো সব ঠিক ছিল! আমার কাছে ছাড়াও সে কাজ করে অন্য আরেকটি বাসায়। সব সময়ই ওখানে কাজ একটু বেশি, হিসাবের কাজের বাইরেও অনেক কাজ করতে হয়, দীর্ঘ সময় থাকতে হয়, আমার কাছে সাপ্তাহিক ছুটি পেলেও অন্য বাসা থেকে দেয় না।

এইগুলো তো জানি, নতুন কি হলো? সাহেরা গত কয়েক সপ্তাহ থেকে একটু অসুস্থ ছিল। তার ডান হাতে ব্যথা হচ্ছিলো। নরমাল পেইন কিলারে ভাল না হলে নিয়ে গেছিলাম তাকে ডাক্তারের কাছে, সিভিয়ার মাসল পুল হয়েছে তার, ডাক্তার ওষুধপত্র দেয়ার সাথে সাথে দুই সপ্তাহ বিশ্রাম নেয়ার কথা বললেন। কোন ভারী কাজ করতে মানা করলেন এই দুই সপ্তাহ। লিখিয়ে আনলাম বিশ্রামের কথা যাতে তার অন্য কাজের জায়গাটিতে বোঝাতে সমস্যা না হয়। ছুটি দিলাম তাকে আর বললাম প্রেসক্রিপশনটা অন্য বাসায় দেখাতে। বিকালে ফোন করে জেনে নিলাম যে ছুটি পেতে সমস্যা হয়েছে কিনা?

জানিয়েছিল, অন্য বাসার ম্যাডাম বলেছেন এক সপ্তাহ পরে কাজে যোগ দিতে। শুনে খারাপ লাগলেও বললাম, অন্তত এই এক সপ্তাহ যেন সে ঠিকমতো বিশ্রাম নেয়। ওই বাড়িতে বুঝিয়ে যেন বলে ছুটিটা একটু বিবেচনা করতে। আর একান্ত না হলে যেন ভারী কাজগুলো থেকে তাকে একটু বিশ্রাম দেয়। এর মধ্যে এক সপ্তাহ বিশ্রাম শেষে সাহেরা কাজে যোগ দিয়েছে, আমার বাসায়ও সে কাজ করতে আসছে এই যুক্তিতে যে আরেকটি বাসায় কাজ যেহেতু তাকে করতেই হচ্ছে, আমার এখানে কাজ বরং হালকা।

কিন্তু মুশকিল হলো, আরেক বাসায় তাকে ঘর-মোছা আর কাপড়-কাচা সবই করতে হচ্ছে। হাতের ব্যথা পুরো ভাল হচ্ছে না। সাহেরার জন্য মন খারাপ হলেও বাস্তবতা মেনে নিতেই হয়। এর মধ্যে আমি গেলাম কাঠমান্ডু। আমার কাছে সাহেরার ছুটি। কি এমন হলো, এর মধ্যে! মলিন মুখে সাহেরা জানালো, যেদিন আমি যাই, সেই দিন থেকেই তার শরীর বেশ খারাপ করে, হাতের ব্যথার সাথে সাথে জ্বরও এসেছিল। সাহেরা তার কাজের বাসায় ফোন করে জানিয়েছিল, শরীর খারাপের কথা আর সে কাজে যেতে পারছে সেটাও।

সাহেরার ভাষায়, ‘সাইঞ্ঝাবেলা’ ওই ম্যাডাম ফোন করলে তার স্বামী ফোন ধরেছিল, জানিয়েছিল সাহেরার অনেক জ্বর, সে ফোন ধরতে পারছে না। তারপর ম্যাডাম বেশ কয়েকবার ফোন করেন, রাগও হন যে মিছেমিছি শরীর খারাপের অজুহাতে সাহেরা কাজে কামাই করছে। বাচ্চা নিয়ে তার খুবই অসুবিধা হচ্ছে, সাহেরা যদি পরদিন কাজে না যায় তবে তিনি তার বেতন থেকে কেটে রাখবেন। সাহেরা পরদিন কাজে যায় গায়ে জ্বর আর হাতে ব্যাথা নিয়ে। অনুরোধ করেছিল যেন তাকে জল ঘাঁটার কাজ না করানো হয়। কিন্তু ঘর মোছা মাফ হলেও কাপড় কাচতে হয় তাকে। বাড়ী ফেরার পরে কাঁপিয়ে জ্বর এলো তার সেই সাথে হাত আর নাড়াতে পারছে না।

পরদিন সকালে সে ফোন করেছে যে কাজে যেতে পারছে না, বাসার ম্যাডাম অত্যন্ত রাগ করে বলেছেন সাহেরা যে এরকম করবে সেটা তাঁর জানা, আর এজন্যই তিনি পুরো মাসের মাইনা একবারে দেন না! এই পর্যন্ত শুনে আমি তো হতবাক, সাহেরা যে ওখানে মাসের মাইনা যে একবারে পায় না সেকথা আমাকে কোনদিন বলে নাই! সাহেরা গতকাল গিয়ে বলে এসেছে সে নিজেই আর এই কাজটি করতে পারবে না, কারণ তার শরীর এত ভারী কাজের পরিশ্রম নিতে পারছে না।

মাসের বাকি মাইনাটা সাহেরা চেয়েছিল, কিন্তু তাকে বলা হয়েছে আগামী মাসের ৫ তারিখের পরে গিয়ে নিয়ে আসতে! দুটি বাসায় কাজ করে সাহেরা মাসে পায় সাড়ে ছয় হাজার টাকা। ২৫০০ টাকা ঘর ভাড়া, দেশে মেয়ের খাওয়া খরচ আর পড়ালেখার জন্য পাঠায় ১০০০ টাকা, ১৫০০ টাকা সে সঞ্চয় করে, বাকি টাকা খাওয়া, ছোট মেয়ের পড়ালেখা আর নানাবিধ দরকারে খরচ করতে হয়। স্বামীটি তো সংসারে খরচ দেয়া দূরে থাক কোন নিয়মিত আয়ও করে না, উলটে তার বিড়ি সিগারেট গাঁজার খরচ সাহেরাকে দিতে হয়। জুয়া খেলাতেও সমান পারদর্শী সে।

মলিন গলায় সাহেরা বলে, ‘ আফা, মোর তো খাটিয়াই খাওয়া নাগবে, সেই শরীর জুদিন মোর পড়ি যায় তো মোক দেইখবার কাঁইও (কেউ) নাই। ডাইন হাতখান মুই নড়াবার না পাও! হাত খানা মোর ভাল হইবে তো আফা?” চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ে তার, ‘ মোর দুই খান মাইয়া আফা, ওমার ঘরের (ওদের) পড়া, বিয়া শাদী সগি ( সবই) তো মোকই করা নাগবে আফা, বাপে তো গতরে হাওয়া নাগাই বেড়ায়!আবার বলে ফির বিয়া করবে, মোর থাকি দুইখান মাইয়া, বংশে বেটা ছইল ছাওয়া নাইগবে! এম্বায় কোন খরছাই ওমায় (সে) না দেয়, বিয়া করিলে মোক কি আর দেখিবে!’ অনাগত ভবিষ্যতের অনিশ্চিত চিত্র যেন চোখের সামনে দেখতে ভাসে সাহেরার। কি বলতে পারি আমি সাহেরাকে? শুধু বললাম, চিন্তা না করতে। ডাক্তারের কথা অনুযায়ী চললে হাত ভাল হয়ে যাবে। অফিসের কাজে রংপুরে যাচ্ছি, ফিরে এসে আবার তাকে নিয়ে যাবো ডাক্তারের কাছে। এই কয়দিন যেন সে বিশ্রাম নেয় পুরোপুরি। কাজ নিয়ে চিন্তা যেন না করে, কিছু একটা ব্যবস্থা হয়েই যাবে। সাহেরাকে আশ্বস্ত যদিও করলাম, কিন্তু মনে ভাবছিলাম, যখন আমি অত্যন্ত অসুস্থ হয়ে পরেছিলাম একবার, তখন আমারও সাহেরার মতনই মনে হয়েছিল, কি হবে যদি সুস্থ না হই? কিভাবে ছেলে মেয়ের পড়ালেখার খরচ যোগাবো!

অসুখের চাইতেও এই সব চিন্তায় অস্থির হয়ে উঠেছিলাম। সেই কঠিন অসুখ থেকে সুস্থতা যদিও পেয়েছি, মনের মধ্যে ভয়টা কাজ করে, আবার যদি কখনও এরকম অসুস্থ হয়ে যাই, যদি কাজ করতে না পারি, কিভাবে কি করবো? মেয়েটার পড়া যে পুরোটাই বাকি! বড্ড কঠিন সময় গেছে!

জীবনের বাস্তবতার কঠিন চাতালে আমি আর সাহেরা- আর্থিক, সামাজিকভাবে একই অবস্থানে নই, কিন্তু ধূসর ভবিষ্যতের অনুভবের যে শূন্যতায় সাহেরা খাবি খায়, সেই অসহায় শূন্য অনুভব আমিও ঠিক ঠিক বুঝতে পারি! সাহেরার কথা চিন্তা করি, না হয় সাহেরাকে আর একটু টাকা বাড়িয়ে দিয়ে আমার কাছেই রেখে দিবো। আমার কষ্টের সময়গুলোতে ভাই, বোন, বন্ধুরা সহযোগিতা না করলে কি এতোদূর আসতে পারতাম!

সাহেরা তো আমার পরিবারই। কালকেই বলবো সাহেরাকে কাজ নিয়ে দুশ্চিন্তা না করতে, এটুকু তো আমি সাহেরার জন্য করতেই পারি, করা আমার উচিতও। ভেবেই মনটা হালকা হয়ে ওঠে।

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.