পুরুষের পৌরুষ থাকে যৌনক্ষমতায়!

Leeসালেহা ইয়াসমিন লাইলী: বিস্মিত হলাম শুনে যে, মানুষ ডায়াবেটিস এর মতো একটা অসুখকে গোপন করে সমাজের কাছে। আগে জানতাম সামাজিক কারণে মানুষ এইডসকে গোপন করে । তারপর একদিন এক কলেজ পড়ুয়া মেয়ে আমার কাছে এসে কথা প্রসংগে বলেছিল, তার এইডস রোগ আছে। প্রথমে আমি তার এমন নির্লিপ্ত স্বীকারোক্তি বিশ্বাস করতে পারিনি। ভেবেছিলাম হয়তো সে না বুঝেই এই এইডস এর মতো একটা ভয়াবহ রোগের বোঝা নিজের কাঁধে নিচ্ছে।

বলেছিলাম, তুমি কি জান এইডস কি? মেয়েটি বলল, আমার মায়ের এই রোগ ছিল। অনেক আগেই তিনি মারা গেছেন। আমি এখনও বেঁচে আছি।

সে যেভাবে জবাব দিয়েছিল আমি তাতে নিশ্চিন্ত না হযে পারলাম না। সেদিনও আমি বিস্মিত হয়েছিলাম মেয়েটির অকারণ অকপট এমন স্বীকারোক্তি দেখে। পরে আমার অনেক খারাপ লাগা কাজ করছিল মেয়েটির জন্য। তার ফোন নম্বরটা রেখে দিয়েছিলাম। বলেছিলাম, পারলে তাকে কোন সহায়তা করব। একদিন এক সংগঠনের সহায়তার আশ্বাস পেয়ে তার নম্বরে ফোন দিয়েছিলাম।

জবাবে মেয়েটি বলেছিল, সে অন্য কোন প্রতিষ্ঠানের সহায়তায় চিকিৎসাধীন আছে। আমাকে ধন্যবাদ জানিয়ে বলেছিল তার আর কোন সহায়তার প্রয়োজন নাই, জীবনঘাতি এই ভয়ঙ্কর অসুখটি ছায়ার মতো সঙ্গ নিলেও সে অনেক ভাল আছে।

মেয়েটার প্রতি আমার অসম্ভব এক ভালবাসা ও শ্রদ্ধাবোধ কাজ করেছে সেদিন। আজও সেটা আছে। কিন্তু ফোন নম্বরটা ফোনের সাথে হারিয়ে ফেলে মেয়েটিকেও হারিয়ে ফেলেছি।মাঝে মাঝেই মেয়েটির কথা মনে হয়। খুব জানতে ইচ্ছে করে, কেমন আছে মেয়েটি।নম্বরটি হারিয়ে ফেলার জন্য অসম্ভব এক অপরাধবোধ কাজ করে।তবুও আশ্বস্ত করি নিজেকে এমন একজন সাহসী মেয়ের কাছে এইডস কি এমন হিম্মত রাখে?

কিন্ত যখন শুনি ডায়াবেটিস হলেও মানুষ অসুখটা গোপন করে, তখন অবাক না হয়ে কিছু করার থাকে না। ডায়াবেটিস নিয়ে কুড়িগ্রামের এক জেলা প্রশাসকের একটা ঘটনা এমন। তিনি দীর্ঘদিন ধরে ডায়াবেটিসে ভুগে পাশের বড় শহরে ডাক্তার দেখাতে গেছেন। সাধারণ রোগীর লাইনে দাঁড়াতে হয়েছে তাকেও। লাইনে অপেক্ষা করতে করতে কাতর হয়ে পড়েছেন। পরিচিত এক সাংবাদিক তার অবস্থা দেখে বললেন, আপনি তো অফিসিয়ালী সিরিয়াল নিতে পারতেন! তখন এত কষ্ট করে অপেক্ষা করতে হত না ।

জবাবে জেলা প্রশাসক বলেছিলেন, কাউকে জানাতে চাইনি এমন অসুখের কথা। তাই গোপনেই চিকিৎসা নিচ্ছিলাম। সাংবাদিক তার স্ত্রীকে নিয়ে গিয়েছিলেন সেই ডাক্তার দেখাতে। তিনি বললেন, আমার স্ত্রী তো ১৩ বছর ধরে চিকিৎসা নিচ্ছে। আমার তো লজ্জ্বা হয় না। লজ্জ্বা হবে কেন? কোন জবাব দেননি জেলা প্রশাসক। এর পর যখন সেই সাংবাদিক নিজেও ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হলেন, তখন তারও নাকি লজ্জা লাগা শুরু হয়েছিল।

পাশের বাড়ির রানু আপার স্বামী দীর্ঘদিন ধরে ডায়াবেটিসে ভুগছেন। রানু আপা শিক্ষকতা করেন। অনেক হাসিখুশি প্রাণবন্ত একজন মানুষ। একদিন তার এক নারী সহকর্মী তাকে বললেন, ‘আপা, আপনার স্বামী ডায়াবেটিসে ভুগছেন, অথচ আপনার এই প্রাণবন্ততা’। দেখে লোকজন আপনাকে সন্দেহের চোখে তাকায়।  আপনি কি বুঝতে পারেন?

অবাক হলেন রানু আপা। বললেন, তার আগে জানতাম না কেন আজকাল আমার স্বামীর বন্ধুরাও নানা ছলে আমার সাথে অতিরিক্ত সখ্যতা দেখাতে চায়। পরিচিত বন্ধু – স্বজনরাও। মাঝে মাঝে অপরিচিত নম্বর থেকে ফোন আসে। নানা ছলে খোঁজ নিতে চায়। পরিচিতরা বলেন, ডায়াবেটিস রোগের কারণে অনেকের সংসার ভেঙ্গে গেছে। তবুও রানু আপা বোঝেননি কি বোঝাতে চান এমন স্বজনরা!

রুবি রোজ সকাল-সন্ধ্যা হাঁটতে বের হন।তার স্বামী সাদেকুর রহমান ডায়াবেটিকে ভুগছেন অনেক দিন ধরে। কিন্তু তিনি হাঁটেন না। দিনে দিনে শরীর ভেঙ্গে পড়ছে। শারিরিক নানা সমস্যা বাড়ছেই। তবুও তিনি নিয়ম না মেনেই খান ও ঘুমান। রুবিকে হাঁটতে দেখলেই লোকজন জানতে চায় ডায়াবেটিক কিনা। রুবিও মিথ্যা করে জবাব দেন, তারও ডায়াবেটিস আছে। তিনি বললেন, আমার স্বামী সচেতন নয় তারও দায়ভার আমার। আমার ডায়াবেটিস নাই জানলে লোকজন আমাকে নানা ভাবে হয়রানী করবে। তা্ই মিথ্যে করে এই কথা বলি।

নুরুন্নবী খন্দকার একজন সরকারী চাকুরীজীবী। দীর্ঘদিন ধরে ডায়াবেটিসে ভূগছেন।জীবনটাকে শৃঙ্খলিত করে ফেলেছেন ডায়াবেটিসের শিকলে। কিন্তু সুস্থ আছেন। কেন মানুষ ডায়াবেটিস হলে গোপন করে জানতে চাইলে বললেন, ডায়াবেটিস হলে যৌনক্ষমতা হ্রাস পায়। তাই অনেক পুরুষ এই অসুখের কথা স্বীকার করতে চায় না। নারীদের বেলায় তেমন সমস্যা নাই।

আমি বিস্মিত হলাম আবারও। পুরুষের পৌরুষ যেন যৌনক্ষমতায়। কিন্তু কোন নারীর ডায়াবেটিস হলে তার যৌনতায় আগ্রহ থাকে কিনা সে বিষয়টি হয়তো নারীটির উপর র্নিভর করে না বলেই ওটা ‘ব্যাপার না’ টাইপের ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়। হায় পুরুষ! এইডস আক্রান্ত সেই মেয়েটিকে এবার স্যালুট করতে ইচ্ছে করল আমার।

লেখক ও সাংবাদিক

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.