ক্রিকেট বিশ্বে আফগানিস্তানের শুভ সূচনা

Afganistanউইমেন চ্যাপ্টার: এশিয়া কাপে নতুন ক্রিকেট খেলতে এসেই বিশ্ব ক্রিকেটে নজর কেড়ে নিয়েছে যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ আফগানিস্তান। প্রথম ম্যাচে শক্তিধর পাকিস্তানকে প্রথমেই চাপের মুখে ফেলে মাঠে তাদের সরব উপস্থিতি জানান দেয় দেশটি। পরের ম্যাচে স্বাগতিক দেশ বাংলাদেশের বিপক্ষে ২৫৪ রানের টার্গেট ছুঁড়ে দিয়ে এবং পরবর্তীতে ৩২ রানে জয়ী হয়ে আলোচনায় উঠে এসেছে তারা। তালেবান জঙ্গিদের অভয়ারণ্য বলে খ্যাত এই দেশটির ক্রিকেটারদের শারীরিক গঠন এবং স্পিরিট ক্রিকেট ভক্তদের নতুন করে ভাবতে শেখাচ্ছে। গতকাল শনিবার বাংলাদেশ হেরে যাওয়ার পর বাংলাদেশি ক্রিকেটপ্রেমীদের অধিকাংশই মুষড়ে পড়েন, এবং তারা নিজেদের দলের ক্রিকেটার এবং বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের সিদ্ধান্তের সমালোচনায় মুখর হয়ে উঠেন।

কিন্তু গতকালের বাংলাদেশ টিমের অবস্থাও ছিল নড়বড়ে। চোটের কারণে খেলতে পারেননি পেসার মাশরাফি বিন মুর্তজা, তামিম ইকবালও নেই। ডাকসাইটে দুজন ক্রিকেটারের অনুপস্থিতিতে এমনিতেই দল ছিল ভঙ্গুরপ্রায়। অধিনায়ক মুশফিকুর রহমান অসুস্থ থাকলেও শুধুমাত্র দলের প্রয়োজনেই তিনি কাল মাঠে নেমেছিলেন। তবে সবার ক্ষোভের কারণ ছিল সাকিব আল হাসানের ওপর বিসিবির নিষেধাজ্ঞা। অসদাচরণের অভিযোগে বিশ্বখ্যাত অলরাউন্ডার সাকিব আল হাসানকে তিন ম্যাচে নিষিদ্ধ করার জন্য অনেকেই বিসিবি কর্তৃপক্ষকে গালিগালাজ করতেও ছাড়েন না। অনেকেই সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম ফেসবুকে লেখেন যে, বাংলা হলো তালেবান, আফগানিস্তানের ক্রিকেটারদের কাছে বাংলাদেশিদের শেখার আছে অনেক কিছুই, ইত্যাদি মন্তব্য। এরই মাঝে কিছু কিছু মন্তব্য ছিল আফগানিস্তানের পক্ষে।

অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট আরিফ জেবতিক ফেসবুকে লেখেন, আমাদের জন্য আরো দশটা আশাহত পরাজয়ের চাইতে বেশি কিছু নয়, হয়তো আন্ডারডগের কাছে হারার জন্য মনটা একটু বেশিই খারাপ হবে।
ওদিকে বিশ্বের মানচিত্রে আফগানিস্তান পরিচিত একটি বিধ্বস্ত, ধ্বংসপ্রাপ্ত, পরাজিত রাষ্ট্র। আফগানিস্তানের জন্য এই জয়টা তাই বিশাল ব্যাপার। একটা জাতির মানসিক শক্তি ফিরে পাওয়ার জন্য, একটু আনন্দের জন্য, খানিকটা আশাবাদী হওয়ার জন্য এই জয়টা একটা বড় ভুমিকা রাখবে হয়তো। আজকে হয়তো কাবুলের রাস্তায় চিৎকার করে আনন্দ করা কোনো কিশোরের চোখে নিজের দেশের জন্য একটু হলেও আশাবাদ জন্মাবে।
খেলাধুলার বড় শক্তি এখানেই।
বাংলাদেশের একটা পরাজয় যদি আফগানিস্তানের জন্য সেই লগ্ন এনে দেয়, তবে খারাপ কী? বড় বড় টেস্ট খেলুড়ে দলের কাছে হারার চাইতে আফগানিস্তানের কাছে হারার এটাই একমাত্র সান্ত্বনা।
অভিনন্দন আফগানিস্তান। আর বাংলাদেশ টিমকে অনেক শুভেচ্ছা। খারাপ দিন তো খারাপ দিনই।

ভারতের পুনেতে পড়তে যাওয়া বাংলাদেশি ছাত্রী শুচিস্মিতা সীমন্তি লিখেছেন, Don’t lose heart Bangladesh; you are one of the good teams in Cricket World which has the record of defeating the BEST of the BEST. One failure is not the end of the world. Bigger challenges are yet to come. Cheer up tigers and focus on the next! Well played Afghanistan. Despite being relatively new in the world of Cricket, you guys played really well, which shows your potential in near future.
Best wishes. :-))

একজন লিখেছেন, সব পরাজয় আসলে পরাজয় নয়, কিছু কিছু পরাজয়ের মাঝেই জয়ের আনন্দ থাকে। যেমন আফগানিস্তানের কাছে আজ আমার দেশের পরাজয়। আমি একে পরাজয় বলতে নারাজ। এর আগে বাংলাদেশ বিশ্বের বাঘা দেশগুলোর কাছে হেরেছে, তাতে আমরা দু:খ-কষ্ট পেয়েছি, আশাহত হয়েছি, আবারও নতুন করে জয়ের নেশায় দিন গুণেছি।
…অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট আরিফ জেবতিক এর কাছ থেকে কথা ধার নিয়ে বলতে ইচ্ছে করছে, যুদ্ধবিধ্বস্ত একটা দেশ, অথচ কী তার ইতিহাস, কী তার ঐতিহ্য, সবই ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে পরিকল্পিতভাবে, সেই দেশটার কি একটিবারও ভাল থাকতে ইচ্ছে করে না? স্বপ্ন দেখতে ইচ্ছে করে না? যে দেশটা একসময় সংস্কৃতির দিক থেকে এগিয়ে ছিল প্রাচ্যে, সেই দেশের সংস্কৃতিতে যদি আজকের এই জয় ন্যূনতম প্রভাবও ফেলে, কাবুলের রাস্তায় সব আত্মঘাতী বোমা হামলার আশংকা এড়িয়ে যদি একটি কিশোরও তার দেশের পতাকা উড়ায় আনন্দে, সেটা কি অনেক বড় কিছু নয়?
…অবশ্যই বড়। প্রথমদিন খেলা দেখেই আমার ভাল লেগেছে নতুন এই দলটিকে, আজও ভাল লাগছে। …’ইনহাস্ত ওয়াতানাম’…এই শব্দটি তো আমরা এইদেশের গল্প থেকেই শিখেছিলাম, নয় কী? তখন সৈয়দ মুজতবা আলীর দেশে-বিদেশে পড়ে একটা স্বপ্নও এঁকেছিলাম দেশটাকে নিয়ে, সেই যে পেঁজা তুলোর মতো বরফ, যেন চাক্ষুষ দেখেছিলাম, আর ভালবেসেছিলাম আবদুর রহমানকে আর তার ‘রান্নাঘরে আরও আছে-বাক্যকে। কাবুলীওয়ালাকেও কি আমরা কেউ কম ভালবেসেছিলাম? বাসিনি। মেয়ের জন্য তাঁর আকুতি আমাদের মনেও দাগ কেটে গিয়েছিল, সংস্কৃতিগতভাবে ওদের সাথে আমাদের নাড়ির টান কিন্তু বহু পুরনো।
…আর দেশের জন্য সব ভালবাসা তো আগেই দিয়ে রেখেছি, সেখানে টান পড়ে এমন আশংকা নেই। মজুত আমার অফুরন্ত। ভাণ্ডারে আমার বিবিধ ভালবাসা এই বঙ্গভূমির জন্য….জয় হোক ক্রিকেটের..।

সুদূর অস্ট্রেলিয়ায় বসে নিজের দেশের জয় কামনা করে খেলা দেখছিলেন নাদেরা সুলতানা নদী। খেলা শেষে পরাজয়ের গ্লানি তাকে কিছুটা পেয়ে বসলেও সামলে নিয়েছেন নিজের উচ্চতাতেই। তাই তিনি লেখেন, আজ যারা শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশ-আফগান ম্যাচ দেখেছেন, জানি তাদের ৯৯% এর অন্তত খেলা নিয়ে মনের ভাব এই মুহুর্তে ব্যাক্ত করার মত সবটুকু সতেজ অনুভুতি অবশিষ্ট নাই; ইনফ্যাক্ট নাই আমারও!!! তারপরও অনেক শক্তি সঞ্চয় করে ফেসবুকে বসলাম ছোট্ট করে হলেও কিছু বলতে চাই…. স্বাভাবিক ভাবেই আজ খেলা শুরুতেই অনেক বেশি ”উত্সাহ” আর ”আনন্দময়” একটা অনুভুতি ছিল, আশা ছিল আজই আমরা আবার জয়ের ধারায় ফিরতে পারব এমন প্রত্যাশায়!!! শুরুতেই ব্যাটিং বিপর্যয়; তারপরও কন্ঠে ছিল গান ”শেষ করোনা; শুরুতে খেলা; না ভেঙ্গনা”!!! তারপর যখন আমাদের ”মুশি কান্ডারী” নাই হয়ে গেল, তখন হঠাতই মনে পড়ে গেল ”কচ্ছপ-খরগোশের” গল্প; আমাদের যেন অনেক এগিয়ে আবার শুরু থেকে শুরু করতে হচ্ছে!!! এতে কোন সন্দেহ নাই ”আফগান” অনেক লড়াই করে জয় ছিনিয়ে নিয়েছে, আজ ওদের ঈদ-আনন্দ। যেমনটি আমাদের সেই প্রথম প্রথম ”ইংল্যান্ড” ”ইন্ডিয়া” ”পাকি” ”নিউজিল্যান্ড” কে প্রথম হারানোর পর হত!!! ”বাংলাদেশ” দল অনেক চড়াই উতরাই নিন্দা পার হয়ে আজকের এই জায়গায়!!! আহা ”ক্রিকেট এবং আমাদের ক্রিকেটার”দের ঘিরে কি সীমাহীন ভালোবাসাই না আমাদের; নিশ্চিত হেরে যাচ্ছি জেনেও কিছু মানুষ মাঠে দাড়িঁয়ে চিত্কার করে বাংলাদেশের পতাকাটা সর্বশক্তি দিয়ে উপরে তুলে ধরে বলে উঠে ”উই লাভ ইউ টাইগার”… এ যেন ”টাইটানিক ডুবে যাওয়ার সময় মিউজিশিয়ানরা যেমন করুন সুরে তাদের ভায়োলীন বাজিয়েই যাচ্ছিলো, তারই প্রতিচ্ছবি!!! ‘তীব্র ভালোবাসা” এবং ”স্বপ্ন ভঙ্গের” কষ্ট সব মিলে মিশে খুব বেশিই আজকের এই রাত, তারপরও পরশুই হয়তো আবার সব হতাশা’কে বাক্সবন্দী করে বলে উঠবো ”গো টাইগার গো” জানিনা কিচ্ছু জানিনা, এই মুহুর্তে এটাও জানিনা যে ১১ টা মানুষকে ঘিরে কোটি মানুষের এতটা আবেগ উচ্ছাস তার কনা মাত্রও কি তাদের সবাইকে স্পর্শ করে!!! ???!!!???[আর যে কথাটা না বললেই নয়, যে ক’জন আফগান নারী বাংলাদেশের মাঠে দাড়িয়ে তাদের ”ক্রিকেট” কে অভিনন্দিত করছিল তাদের কে আমার অনেক শুভেচ্ছা, ওরাও স্বপ্ন দেখুক সেই শুভকামনা]

লেখক অদিতি ফাল্গুনী লিখেন, আফগানিস্তান বলতেই রবীন্দ্রনাথের ‘কাবুলিওয়ালা।’ এই দেশের আর এক নাম গান্ধার। স্বাত দেশও বলা হয় এই দেশকে। সৈয়দ মুজতবা আলীর ‘শবনম’ উপন্যাসে আফগানিস্থানে বিংশ শতকের শুরুতে মহা আধুনিক এক আফগান তরুণী শবনমকে নায়ক বিয়ের রাতে বলছে, ‘আমার দেশের রাজকুমার ধৃতরাষ্ট্র তোমার দেশের রাজকুমারী গান্ধারীকে বিয়ে করেছিলেন।’ কাহিনীর শেষটা বিয়োগান্তক। সংস্কারপন্থী, ধর্মনিরপেক্ষ বাদশা কাঠমোল্লাদের হাতে পরাজিত হয়ে দেশ ছাড়ছেন, সেই গোলযোগে শবনমের আধুনিক বাবা ও শবনমও মৃত বা নিখোঁজ। নায়ক সেসময়টা কাবুল ছিলেন না। ভারত এসেছিলেন কোন কাজে। আহারে…ইন্টার লাইফে অমন গল্প পড়লে কেমন যে লাগে! ১৯৮৭ সালে ঢাকার কাবুল দূতাবাসে গিয়ে আমার ভাই খুব অবাক হয়েছিল। মেয়েরা সব স্কার্ট পরা। তখনো কম্যুনিস্ট শাসন চলছে। পরের ইতিহাস আমরা জানি। বছর দুই আগে ঢাকার আইডিবি ভবনে ইউএনডিপি অফিসে ওঠার সময় লিফটে দারুণ সুন্দরী এক তরুণীকে দেখে ভাবছি সে কোন্ দেশের হতে পারে? বাঙালী মেয়েরা গড়ে এতটা লম্বা আর গৌরী হয় না। পাকিস্থানী কি? সে কি এমন শার্ট আর জিন্স পরা থাকবে? ভারতীয়ই হবে! প্রশ্ন করায় হাসতে লাগলো, ‘ইউ গেস?’ আমি পৃথিবীর বেশ কয়েকটি দেশের নাম বলে ফেললাম। শেষে সে হাসলো, ‘আই এ্যাম ফ্রম কাবুল।’ চোখ বড় করলাম, ‘তোমাদের দেশে তোমার মত মেয়ে আছে?’ ‘আমরা তোমাদের চেয়ে একটা সময় হাজার গুণে অগ্রসর ছিলাম। কি ভাবো আমাদের?’ সে ঠোঁট বাঁকায়। তবে আফগানিস্থান থেকে আসা কাবুলিওয়ালাদের বিষয়ে সেরা গল্পটা…উঁহু…রবীন্দ্রনাথ নয়…আমার বাবার কাছ থেকে শুনেছি। ফরিদপুরের ফুলবাড়ি গ্রামে বাবারা যখন শিশু, প্রতি শীতে কলকাতা থেকে এক কাবুলিঅলা আসতো। সে আসা মানেই গ্রামের দেনাগ্রস্ত পুরুষরা দৌড়ে কেউ গ্রাম ছাড়ছে, কেউ ঘরে গিয়ে শেকল দিচ্ছে। নিত্য বালা নামে একজন ছিল যে কখনোই ধার শোধ দিতে পারত না। এক শীত, দুই শীত…তৃতীয় শীতে কাবুলিঅলার রাগ সপ্তমে। ‘নিত্য বালা’ সে বলতে পারে না। কাজেই হাতে একটা ছুরি নিয়ে চোখ রাঙিয়ে বললো, ‘এ নেতাবালি…মুঝকো রুপেয়া জরুর দেনে পড়েগা!’

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.