রৌমারীতে নৌকায় ভোট না দেওয়ায় অবরুদ্ধ বেহুলার চরবাসী

Roumari Kurigramসালেহা ইয়াসমিন লাইলী, কুড়িগ্রাম: কুড়িগ্রামের রৌমারীতে নৌকায় ভোট না দেয়ায় ৫ তারিখের পর থেকে অবরুদ্ধ হয়ে পড়েছেন বেহুলার চরবাসী। চরের বাইরে বের হতে না পেরে তারা একদিকে যেমন কর্মহীন হয়ে পড়েছেন, অন্যদিকে নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্যসামগ্রী ও চিকিৎসার অভাবে মানবেতর জীবন যাপন করছেন। তার উপর হামলার আতঙ্কে তারা নির্ঘুম রাত্রি যাপন করছেন। চরের বাইরে বের হতে না পেয়ে প্রশাসনের সহায়তার জন্যও কোন লিখিত আবেদনও করতে পারেননি। মোবাইল ফোন  বার বার সহায়তা চেয়েও কোন সাড়া পাননি তারা।

রৌমারী থেকে ১৩ কিলোমিটার দুরে বেহুলার চর। চরের প্রায় ৩৫০ পরিবারের ১৮ শত ৮১ জন ভোটার। এই ভোটারদের প্রায় ১ হাজার ভোটার ভোট দিয়েছে নির্বাচনে। তার মধ্যে নৌকা মার্কা পেয়েছে মাত্র ২১১ ভোট। নিশ্চিত পরাজয় বুঝতে পেরে জাকির হোসেনের লোকজন ভোট গণনার পর কেন্দ্রে হামলা চালিয়ে ব্যালট পেপার লুট করার চেষ্টা করলে চরবাসীর প্রতিরোধের মুখে ব্যর্থ হয়। ভোটে হেরে তখন থেকেই তারা হুমকি দিয়ে চরবাসীর একমাত্র সংযোগ সড়কের মুখে প্রতিশোধ নেয়ার জন্য মরিয়া হয়ে ওঠে।

পরে  সীমান্তঘেঁষা এই চরের পূর্বে ভারতের আসাম রাজ্য। চরটির সাথে একমাত্র সড়ক যোগাযোগ পশ্চিমের ফকিরপাড়া হয়ে রৌমারী। আর এই ফকিরপাড়া গ্রামেই জাকির হোসেনের এলাকা। বিভিন্ন হুমকির মুখে এই এলাকার রাস্তায় প্রবেশ করার সাহস পাচ্ছে না চরের মানুষ। কর্মহীন হয়ে পড়েছে কেউ কেউ। আবার শিক্ষার জন্য স্কুল কলেজে, নিত্য প্রয়োাজনীয় পন্যেও জন্য হাটবাজার ও চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে যেতে না পেওে মানবিক বিপর্যয় দেখা দিয়েছে।

কুড়িগ্রাম ৪ আসনে নবম সংসদের সাংসদ ছিলেন আওয়ামীলীগের জাকির হোসেন। দীর্ঘ ৫ বছর মেয়াদে তার অনিয়ম অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে ওঠে। বিভিন্ন গনমাধ্যমে তার অনিয়মের অনেক খবর প্রচারিত হয়। ১০ম সংসদ নির্বাচনে জনগন তার প্রতিদ্বন্দ্বি প্রার্থী জেপি(মঞ্জু) প্রার্থী রুহুল আমিনকে ভোট দেয়।

উল্লেখ্য, কুড়িগ্রাম ৪ (রাজীবপুর-রৌমারী ও চিলমারী-উলিপুর আংশিক) আসনে মোট ভোটার ৪ লাখ ৪০ হাজার। ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে রুহুল আমিন (সাইকেল) পেয়েছেন ৩০ হাজার ৫৪৪ ভোট। অন্যদিকে জাকির হোসেন (নৌকা) পেয়েছেন ২৩ হাজার ৯৬৬ ভোট। এতে নৌকার চেয়ে সাইকেল মার্কা ৬ হাজার ৫৭৮ ভোটে এগিয়ে রয়েছেন। নির্বাচনের দিনই রৌমারী কেরামতিয়া ইসলামিয়া মাদ্রাসা ও কুটিরচর উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্র স্থগিত করা হয়েছে। ওই দুই কেন্দ্রের ভোটার সংখ্যা ৭ হাজার ২৫৭। গত ১৬ জানুয়ারি কেন্দ্র দুটিতে নির্বাচন হওয়ার কথা থাকলেও জাকির হোসেন আরো ৬ টি কেন্দ্রে পুণঃ ভোটের আবেদন করে হাই কোর্টে রীট করলে ভোগ গ্রহন ৪ সপ্তাহের জন্য স্থগিত হয়ে যায়। পরবর্তিতে হাইকোর্ট আবেদন খারিজ করে দেয়। এই কেন্দ্রে আবারো নির্বাচনের তারিখ নির্ধারিত হয়েছে ২৩ জানুয়ারী, বৃহস্পতিবার।

বেহুলার চর গ্রামের বাসিন্দা সাইদুর রহমান বলেন, ভোট গণনার পর নৌকা মার্কা ভোট কম দেখে জাকির হোসেনের সমর্থকরা ভোটারদেও উপর হামলা চালায়।’

একই গ্রামের মোহাম্মদ আলী অভিযোগ করে বলেন, ‘গ্রামের বাইরে যাই কেমনে? ফকিরপাড়া গ্রামে এমপির লোকজন লাঠি নিয়ে বসে আছে। আমরা গেলেই মারধর করবে। তা ছাড়া রৌমারী বাজারেও নাকি এমপির ক্যাডাররা আমাদের গ্রামের মানুষকে খুঁজে বেড়ায়। এ অবস্থায় আপাতত আমরা বের হচ্ছি না।’ গ্রামের আবু বক্কর নামের এক দিনমজুর বলেন, ‘আমার পোলাডার খুব অসুখ। তাগরে ভয়ে হাসপাতালে ডাক্তারের কাছে নিয়া যাবার পাইছি না। বাজারে গেলেই নাকি আমগর মারবো।’

হাফিজুর রহমান, আমজাদ হোসেন, জাহিদুল ইসলাম, শাহজাহান মিয়া, আব্বাস আলী, শামীম হোসেন, আব্দুস সালাম, আব্দুস সামাদ ও ইউসুফ আলী এই গ্রামের ব্যবসায়ী। রৌমারী বাজারে তাঁদের দোকান রয়েছে। গত ৫ জানুয়ারি নির্বাচনের পরের দিন থেকে তাঁরা দোকানপাট খুলতে পারছেন না।

নির্বাচনে ভোটে এগিয়ে থাকা জাতীয় পার্টির (জেপি) প্রার্থী রুহুল আমিন সাংবাদিকদের কাছে অভিযোগ করেন, ‘বেহুলার চর গ্রামের মানুষ নৌকায় ভোট না দেওয়ার কারণে জীবননাশের হুমকি দেওয়া হচ্ছে। তাদের রৌমারী বাজারে আসতে দেওয়া হচ্ছে না। বিষয়টি থানা পুলিশ এবং কুড়িগ্রাম পুলিশ সুপারকে জানানো হয়েছে। কিন্তু পুলিশ কোনো উদ্যোগ গ্রহণ করেনি।’

অভিযুক্ত আওয়ামী লীগ প্রার্থী জাকির হোসেন তার বিরুদ্ধে সকল অভিযোগ অম্বীকার করেন।  রৌমারী থানার ওসি মোখলেছুর রহমান বলেন, ‘খবরটি লোকমুখে শুনেছি। কিন্তু কোনো আজো কোন লিখিত অভিযোগ পাইনি। তাই ব্যবস্থা নেয়া যায়নি।’

রির্টানিং অফিসার ও জেলা প্রশাসক এবিএম আজাদ জানান, খবরটি আমরা জেনেছি। নির্বাচনী ব্যস্ততা এখন না কাটায় ব্যবস্থা নেয়া যায়নি। খুব জলদি  সমস্যার সমাধান করা হবে।

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.