একাত্তরের নারীসত্ত্বা: অগ্নিশিখা ও অশ্রুবিন্দু(পর্ব-৪)

women 71মারুফ রসূল: আগেই বলেছি, পাকিস্তানের আধিপত্যবাদনীতি বাঙালী মেনে নিতে পারেনি। অর্থনৈতিক বৈষম্য, সামরিক ও শিক্ষাক্ষেত্রে বৈষম্য বাঙালিকে উদ্বুদ্ধ করেছিলো মুক্তিযুদ্ধে। কিন্তু এটাও ভুলে গেলে চলবে না, পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে বাঙালী প্রথম আন্দোলন করে তার ভাষার প্রশ্নে, অর্থাৎ স্বতন্ত্র বাঙালী জাতীয়তাবাদের প্রশ্নে।

সাতচল্লিশ পরবর্তী সময়ে পাকিস্তানের বিরোধিতা করতে বাঙালী সময় নেয়নি। ১৯৪৮ সালের ২১ মার্চ প্রথম জিন্নাহর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ, তারপর তো সে-এক ভিসুভিয়াসের গল্প। অতএব, বাঙালীর কাছে পাকিস্তানি শোষণ নীতি পরিস্কার হয়েছে আরও পরে, প্রথমেই তার কাছে মুখ্য ছিল এটাই যে- তার ভাষা ও সংস্কৃতিকে দূরে ঠেলে দেবার জোর ষড়যন্ত্র চলছে পাকিস্তান বর্বরদের মাঝে।

তাই ছয় দফা যদি বাঙালীর মুক্তির সনদ হয়, সত্তরের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের বিজয় যদি বাঙালির মুক্তির ইতিহাসের মাইলফলক হয়- তবে স্বীকার করতেই হবে, এ দুইটি পর্বতসম অর্জনের পেছনে ১৯৬১ সালে রবীন্দ্র জন্মশতবর্ষ উদযাপনের দৃঢ় প্রত্যয় ভূমিকা রেখেছিলো; নীরব না সরব- সেটা আলোচনায় বোঝা যাবে।

আজকের প্রেক্ষাপটে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ যদি হয় কেবল অস্ত্রহাতে সম্মুখ সমরে যুদ্ধ করা, তবে নারীর অংশগ্রহণ নিয়ে অনেকেই অনুসন্ধানের পরামর্শ দিতে পারেন। এক্ষেত্রে আমি তাদের কথাসাহিত্যিক সেলিনা হোসেনের ‘যুদ্ধ’ উপন্যাসটি পড়তে বলবো। সেই উপন্যাসেই প্রথম একাত্তরে নারীর মুক্তিযোদ্ধা পরিচয়টি উঠে এসেছে। উপন্যাসের চরিত্রের কয়েকটি সংলাপ তুলে ধরছি-

–      ‘যুদ্ধ?’ মাখন বিষন্ন দৃষ্টিতে নিজের পায়ের দিকে তাকায়।

–      কি ভাবছো? পায়ের কথা?

–      যুদ্ধে আমি পা হারালাম।

–      তাতে কি হয়েছে? যুদ্ধ এমনই। মেয়েরা তো যুদ্ধক্ষেত্রে না গিয়েও অঙ্গ হারায়।

–      কিভাবে?

–      ধর্ষিত হলে ওদের গর্ভ হয়। সেটা মাতৃত্বের গর্ভ না। সেটা জরায়ুর জখম।

বেনু বলে, ভালো কইরে দেখো হামাক। তুমহি দেছো পা। হামি দিছি জরায়ু। তোমার পায়ের ঘা শুকায়ে গেছে। কয়দিন পর হামারও জরায়ুর ঘা শুকায় যাবে।.. ..স্বাধীনতা কি সোজা কথা?

অতএব একাত্তরে নারীর মুক্তিযুদ্ধের অবদানকে খাটো করে দেখার যে খোঁড়া যুক্তি অনেকেই তোলেন, তা ঠিক নয়। কারণ ইতিহাস পরবর্তীতে লিপিবদ্ধ হয় ইতিহাস চর্চা এবং তার রক্ষণাবেক্ষণের মাধ্যমে। তবে ইতিহাস যদি পুরুষতান্ত্রিকতায় আক্রান্ত হয়; ঝামেলা তখনই শুরু হয়। বাতেলা বুদ্ধিজীবীরা এ কাজই করে আসছেন এতোদিন ধরে। এই কথা যারা মানতে চাইবেন না, তাদের বলছি- জোন কেলি তাঁর ‘দ্যা সোশ্যাল রিলেশন অব দ্যা সেক্সেস: ম্যাথোডোলজিক্যাল ইম্পিøকেশনস অব উইমেনস হিস্ট্রি’ প্রবন্ধে বলেছেন-

    নারীর ইতিহাস প্রত্যয়টির দুইটি লক্ষ্যমাত্রা আছে, যথা:

    ক. ঐতিহাসিক পর্যালোচনায় নারীকে নিয়ে আসা

    খ. আমাদের ইতিহাস রচনাকে নারীর কাছে নিয়ে যাওয়া।

আফসোস, দুইটির কোনোটাই বাঙালী নারীর কপালে জোটেনি। যাও জুটেছে- তা-ও হাজার সমালোচনায় বিদ্ধ।

মুক্তিযুদ্ধের নারী- এমন গর্ব দ্বিতীয়টি নেই

মুক্তিযুদ্ধ পর্যায় থেকে আলোচনা শুরু করলেও, নারীর গর্বিত অবদান আছে বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনেও। তবে মুক্তিযুদ্ধকালীন প্রেক্ষাপটেই এ আলোচনা সীমাবদ্ধ রাখবো। উনসত্তরের গণ-আন্দোলনে ও অভ্যুত্থানে এদেশের নারী সমাজ সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছেন। ১৯৬৯ সালের ১৯ জানুয়ারি গণ-আন্দোলনের মিছিলে লাঠিচার্জ করে পুলিশ। ২০ জানুয়ারি পুলিশের গুলিতে শহিদ হন ছাত্রনেতা আসাদুজ্জামান। শিবপুর গ্রামের বাড়ি থেকে আসাদের মা ছাত্রনেতাদের কাছে বাণী পাঠালেন-

আমার আসাদের মৃত্যু হয়নি। আমার আসাদ বলতো ‘মা আগামী দশ বছরের মধ্যে এই মাতৃভূমি নতুন জীবন পাবে। আমার আসাদের এই স্বপ্ন তোমরা সার্থক করো।

এখন প্রশ্ন পাঠকের কাছে, আসাদের মা কি মুক্তিযোদ্ধা নন?

১৯৬৯ সালেই চট্টগ্রামে কালো দিবস পালন করেন নারী শিক্ষার্থীরা। বিশাল মিছিল করেন তাঁরা। জেএম সেন হলের নারী শিক্ষার্থীরা সভা করেন খালেদা খানমের নেতৃত্বে। বক্তব্য রাখেন তাসমিন আরা, রাশেদা খানম, হান্নানা বেগম, মমতাজ বেগম, নাজমা আরা বেগম, রওশন আরা বেগম, শিরিন কামাল প্রমুখ।

বাংলাদেশের সামাজিক-অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপট পুরুষ-নির্ভর। তবুও সব বাধা-আশঙ্কা তুচ্ছ করে ছাত্র রাজনীতিবিদরা যখন লাখে লাখে সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়েন, তখন ঘরে ঘরে নারীরাই হাল ধরেন সবকিছুর। ১৯৭০ সালের নির্বাচনের তারিখ পেছানো হয় ১১ নভেম্বর প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড়ের কারণে। সে-ই সময়েও নারীরা হাল ধরেন তাঁদের সর্বস্ব নিয়ে। অধ্যাপক সুলতানা জামানের উদ্যোগে সুফিয়া কামালের নেতৃত্বে দেশের নারী সমাজ, ডাক্তার, সংস্কৃতিকর্মীরা ঐক্যবদ্ধভাবে ত্রাণকার্যে ঝাঁপিয়ে পড়েন। তাছাড়া সত্তরের নির্বাচনে নারী ভোটারদের মাঝে কাজ করার জন্যে নারী সদস্যরা অনেক পরিশ্রম করেছেন; কিন্তু উল্লেখ্য, নারীর মর্যাদা, রাজনৈতিক-সামাজিক সমঅধিকারের বিষয়টি কোনো রাজনৈতিক দলের ইশতেহারে ছিলো না; শুধু তাই নয়, কোনো নারীপ্রার্থীকে মনোনয়ন দেয়নি কোনো রাজনৈতিক দল।

বঙ্গবন্ধুর সাতই মার্চের ভাষণে সেদিনের রেসকোর্স ছিলো উত্তাল, নিবিড় স্বপ্নের সাতকাহনে পূর্ণ। অধ্যাপক মুনতাসীর মামুন তাঁর ‘সেই সব দিন’ বইয়ে লিখেছেন-

.. ..এই সভায় অসংখ্য মহিলা এসেছেন বাঁশের লাঠি নিয়ে। বহুলোক এসেছেন তীর ধনুক নিয়ে যেনো যুদ্ধ আসন্ন। দেখা গেলো মেয়েদের ভিড়ে একজন অশিক্ষিত মেয়ে মনোয়ারা বিবি নিজের রচিত গান গাইছে: মরি হায় হায়, দুঃখের সীমা নাই, সোনার বাংলা শ্মশান হইলো, পরান ফাইডা যায়। দেশাত্মবোধক ভাটিয়ালী গানও শোনায় মনোয়ারা বিবি।

বঙ্গবন্ধুর সাতই মার্চের ভাষণেও তিনি নারীর কথা উল্লেখ করেছেন। সেই আহবানে ছিলো আবেগ ও অঙ্গীকার। তিনি বলেন-

Maruf Rasul
মারুফ রসূল

আমি আগেই বলে দিয়েছি কোনো গোলটেবিল বৈঠক হবে না,.. ..যারা আমার মা বোনের কোল শূন্য করেছে, তাদের সাথে বসবো আমি গোলটেবিল বৈঠকে? যদি একটি গুলি চলে, তাহলে বাংলার ঘরে ঘরে দূর্গ গড়ে তোলো.. ..

ঐতিহাসিক সে ভাষণে বঙ্গবন্ধু নারীসমাজের সংগ্রামী অংশগ্রহণের স্বীকৃতি দিয়ে প্রথমবারের মতো মুক্তিযুদ্ধে তাঁদের ভূমিকাকে দৃশ্যমান করে তোলেন। সমাজ ও রাষ্ট্রের নাগরিক সমাজের অর্ধাংশ নারী গণ-আন্দোলন ও অসহযোগ আন্দোলনের সময় সার্বিক ভূমিকা পালনে সক্রিয় ও দৃশ্যমান হয়ে ওঠার প্রেক্ষাপটে বঙ্গবন্ধু তাদেরকে প্রথম এই আহবান জানান।

(চলবে)

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.