অমুসলমানদের কান্না কি শুনতে পায় কেউ?

hindu_communalতানিয়া মোর্শেদ: “উদ্বাস্তু” না “বাংলা ছাড়ো” ভাবছিলাম। দুটো কবিতাই খুবই প্রাসংগিক। দু:খজনক, তবে এটাই বাস্তবতা। আজও বাংলাদেশে রাজাকারদের আর তাদের বন্ধুদের তাণ্ডব চলে। আজও অমুসলমানদের “উদ্বাস্তু” হতে হয়। তাদের দেশ ছাড়বার হার বেড়েই চলে। কজনে এই বিষয়ে সত্যিকারভাবে সচেতন, প্রতিবাদী?! যখন বাংলা অনুষ্ঠানে “উদ্বাস্তু” আবৃত্তি করছিলাম তখন বাংলাদেশে সকাল হয়েছে। ভোট শুরু হয়েছে (৫-ই জানুয়ারী)।

সব দেশের মতই “বেটার ইভিলকেই” ভোট দিতে হয়, হবে। (দলকানাদের বলছি, ১৯৭১-এর আওয়ামী লীগ আর ২০১৪-এর আওয়ামী লীগ এক নয়, অন্ততপক্ষে আমার কাছে।) ভোট নিয়ে চিন্তা করিনি, করেছি ক’জন মানুষ মরবে, পুড়বে তা নিয়ে। আশংকা করেছি, করছি অমুসলমানদের নিরাপত্তা নিয়ে।

“ধর্ম নিরপেক্ষতা” অনেক অনেক আগেই নির্বাসনে গেছে। যে কোনো দেশেই সংখ্যালঘুদের (যে কোনো অর্থেই) বেঁচে থাকা অন্যদের থেকে অন্য রকম। আমি বাংলাদেশেই ছোটবেলা থেকেই তা বুঝেছি। নিজের বোধ দিয়ে। একটু বড় হবার পর থেকে “মেয়ে” হয়ে জন্মাবার কারণে। ৯/১১ -এর পর অনেক মুসলমান এটা না কি বুঝেছেন। আবার মুসলমান না হয়েও অনেকে শিকার হয়েছেন। (ভারতীয়, বিশেষত শিখ সম্প্রদায়)। আমি কিছু বুঝিনি। হয়ত খুব লিবার‍্যাল মাইন্ডের মানুষদের জায়গায় বাস করেছি, করি তাই। তবে ৯/১১ পৃথিবী বদলে দিয়েছে। যদি ৯/১১-এর মত কোনো ঘটনা অন্য কোনো দেশে ঘটতো আর আমি সেখানে বাস করতাম, তবে আমিও বুঝতে বাধ্য হতাম। বাংলাদেশসহ উপমহাদেশের যে কোনো দেশে ঘটলে রক্ত গঙ্গা (বা পদ্মা, কেউ যদি অন্য লাইনে ভাবেন তাই পদ্মা লিখছি) বয়ে যেত। অন্য কোনো দেশ এমনকি ইউরোপের কোনো দেশে ঘটলেও তা হতো। ৯/১১ কিন্তু বদলাতে, ভাবাতে পারেনি বাংলাদেশের মুসলমানদের! অথচ তা কি হবার কথা ছিল না?! দিনে দিনে উল্টো পথেই চলেছে সবাই! অনেকেই স্বপ্ন দেখেন, রাজাকার মুক্ত, ধর্মান্ধ মুক্ত বাংলাদেশের (আমিও দেখি)।

কিন্তু বাস্তব কি বলে? যে দেশে আজও শুধুমাত্র ধর্মের (বা নাস্তিকতার কারণে) মানুষ প্রতিবেশীকেও খুন করে, ধর্ষণ করে, বাড়ীতে আগুন দেয় সে দেশে কয়জনকে জেলে পুরবে? কয়জনের বিরুদ্ধে মামলা হবে? মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় কি ধর্ম নিরপেক্ষতা ছিল না? রাষ্ট্র ধর্ম ইসলাম রেখে কিভাবে তা সম্ভব? ধর্মের কার্ড, নাস্তিকতার কার্ড সবাই ব্যবহার করে যে দেশে, সেখানে স্বপ্ন আর বাস্তবতার ফারাক কতটা তা কী বুঝতে কারো অসুবিধা হয়!

আমার আবৃত্তির পর এক বন্ধু বলেছে, আমি খুব খেয়াল করে শুনেছি। না সে মুসলমান নয়। আমি বলেছি যে আমি কখনো কখনো প্রচ্ছন্ন ভাবেও বুঝিয়ে দেই। তবে কজন তা বোঝে?! গতরাতে দীপ্তর সাথে কথার এক পর্যায়ে আমি বলেছিলাম যে, আমি দিনে দিনে একা থেকে আরও একা হয়ে যাচ্ছি। ও বলেছিল, তোমার মটোটা মনে করো। আমি বললাম, “যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে তবে একলা চল রে?” ও বললো, “হ্যাঁ।”

বাংলা অনুষ্ঠান শেষে দীপ্ত জিজ্ঞাসা করেছিল যে আমার আবৃত্তি করা (উদ্বাস্তু) কবিতাটির বিষয় বস্তু কি ছিল? আমি বুঝিয়ে বললাম। না আমি লজ্জা পাইনি। কিছুদিন ধরেই আমি বাংলাদেশীদের খারাপ দিকগুলো ওকে বলা শুরু করেছি। ছোট্ট থেকে ভালো বিষয়গুলো জেনেছে। এখন সময় এসেছে খারাপ, ভুলগুলো জানবার। কিছুদিন আগে ও বাবাকে বলেছে যে, এদেশে সংখ্যালঘু হবার জন্য সময় সময় মন খারাপ হয়। হয়ত কারো কথায়, আচরণে। ধর্ম নিয়ে বাইরের কারো সাথে কথা বলা নিষেধ ওর। আর ধর্ম বিষয়ে কোনো জ্ঞানও নেই। শুধুমাত্র সব ধর্মের প্রাথমিক বিষয়ের সামান্য ধারণা আছে।

আমাদের বসবাস এমন জায়গায় যেখানে সত্যিকার অর্থে ধর্ম বা রেইস দিয়ে বৈষম্য খুব কম দেখতে হয়। যেটুকুই দেখেছে তাতেই মন খারাপ করা স্বাভাবিক। মানুষের পরিচয় কর্মে আর কিছুতে নয় এই বিশ্বাসে বড় হচ্ছে, খারাপ তো লাগবেই! ওর বাবার কাছে থেকে সেদিন ওর মন খারাপের কথা শুনে ভেবেছি যে, এবার বাংলাদেশেই শুধুমাত্র ধর্মের কারণে কি ভাবে মানুষ অত্যাচারিত হয় তা ভালো ভাবেই বলবো। সব কিছু এক হওয়া সত্ত্বেও কি ভাবে শুধুমাত্র ধর্ম মানুষকে আলাদা করে তা জানবার বয়স হয়েছে ওর। ও আমার মতই একা হয়ে যাবে তা জানি। ওর এক বন্ধু না কি কোনো একটি ভালো কাজ করেছে, সে বলেছে যে ধর্মে আছে ভালো কাজের পুরষ্কার পাওয়া যায়।

আমাকে দীপ্ত জিজ্ঞাসা করেছিল যে, আমার কি মনে হয় না যে সেই বন্ধুটি স্বার্থপর বা লোভীর মত ভাবছে? ভাল কাজ তো এমনিই করতে হয়, কোনো কিছু পাবার আশায় নয়। বাংলাদেশে তো ধার্মিক মানুষের ছড়াছড়ি। তারা কি নিজেরদের “সোয়াবের” আশায় ভাল কাজ করতে পারেন না? লোভী হয়েই না হয় নিজের প্রতিবেশী অন্য ধর্মের মানুষদের পাশে দাঁড়ালেন? না কি অমুসলমানদের সাহায্য করবার “সোয়াব” খুবই সামান্য? না কি নেই? কাউকে ধর্মান্তরিত বা “ধর্মের পথে” আনবার “সোয়াব” যে অনেক তা বুঝেছি, অনেকের আচরণেই। এরাই আবার মহা খ্যাপা মিশনারীজদের উপর। ধর্মান্তরিত করবার অভিযোগে! সমাজ, লোকালয়, রাষ্ট্র যে মানুষদের ধূলিকণার মত দেখে তাদের পাশে যারা দাঁড়ায়, বুকে টেনে নেয় সেই ধর্মের প্রতি যদি অবহেলিত মানুষগুলো ঝুঁকেই যায় তাতে কার কি??

ধর্ম তো আশ্রয়। যার যেখানে ইচ্ছে আশ্রয় নিলে অন্যের কি? না নিলেই বা কি? অমুসলমানদের কান্না কি কম শোনা যায়? কম দেখা যায়? কম ছুঁয়ে যায়? কম কাঁদায়? কম ভাবায়? কম “পাপী” করে? তাই কি পৃথিবীর কোন প্রান্তে কোন মুসলমানকে কে মারলো, প্রতিবাদের ঝড় ওঠে ফেইসবুকে, রাস্তায়, মিছিলে, মিটিং-এ, টিভিতে, অনেক সময় রাষ্ট্রীয় ভাবেও! আর নিজের দেশে অমুসলমানদের মারলে, কাটলে, হত্যা করলে, ধর্ষণ করলে, নিঃস্ব করলে উট পাখীর মত বালিতে মুখ গুঁজে থাকা! ব্যক্তি থেকে রাষ্ট্রের!!

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.