সুপ্রভাত!!

Religion n Cultureতানিয়া মোর্শেদ: কয়েকদিন আগে চ্যানেল আই-তে গানে গানে সকাল শুরু নামের অনুষ্ঠানটি দেখছিলাম। শিল্পী একজন প্রবাসী। খুব সুন্দর গান গাইছিলেন। প্রধানত উচ্চাঙ্গ ও নজরুল সঙ্গীত শিল্পী। এক পর্যায়ে বললেন যে, প্রতিদিন তাঁর সকাল শুরু হয় “আমি অকৃতি অধম … ” এই গানটি দিয়ে। এই গানটি তাঁর কাছে প্রার্থনা। খুব দরদ দিয়ে গাইলেন।

কিছুক্ষণ পর একজন দর্শক-শ্রোতা ফোন করলেন। উপস্থাপক খুব অল্প বয়স্ক, নিজেও গায়ক। “শুভ সকাল” বলে দর্শক-শ্রোতাকে সম্ভাষণ করলেন। মহিলা অ্যামেরিকা প্রবাসী, তা জানালেন। তারপর কথা বললেন যে, ভালো যে উপস্থাপক ‘শুভ সকাল’ বলছেন কিন্তু প্রথমে কেন “সালাম” দেননি? তারপর বললেন, “আমরা তো মুসলমান। প্রথমে সালাম দিয়ে শুরু করবেন।” উপস্থাপক বললেন যে, যে কোনো ধর্মের মানুষই তো ফোন করতে পারেন, ইত্যাদি।

শিল্পী সুন্দর করে বললেন যে, শুভ সকাল তো প্রতিটি বাংগালীর। আমার জিজ্ঞাসা করতে ইচ্ছে করছিল সেই নারীকে, “অ্যামেরিকাতে কি বলে সম্ভাষণ করে?” আরেকটি গানের পর এক পুরুষ দর্শক শ্রোতা ফোন করলেন। প্রথমেই উপস্থাপকের নাম জানতে চাইলেন। খুব সুন্দর বাংলা নাম। হ্যাঁ বুঝবার উপায় নেই কোন “ধর্মের” মানুষ সে। নাম শুনে সেই পুরুষটি বললেন, “আপনি তো মুসলমান, তাই না?” ছেলেটি হ্যাঁ বা না কিছু বলেনি, জিজ্ঞাসা করছিল যে কোনো গানের অনুরোধ আছে কিনা? সেই ধর্মান্ধ পুরুষটি তখন সালাম দেওয়া মুসলমানের কত বড় কর্তব্য ইত্যাদি বলা শুরু করতেই লাইন কেটে গেল (সম্ভবত কেটে দিয়েছে)।

ইতিমধ্যে আমার মাথা গরম হয়ে গেছে। একজন লেখক এরমধ্যে ফোন করে শিল্পীর (পূর্ব পরিচিত তাঁর) গানের প্রশংসা করলেন কিন্তু “সালাম দেওয়া” বিষয়ে কিছু বললেন না! একজন নিয়মিত দর্শক-শ্রোতা (৭০+ বয়স্ক নারী, প্রবাসী তিনিও। পেশায় শিক্ষক ছিলেন) শিল্পী ও উপস্থাপকের প্রশংসা করে বললেন যে, “শুভ সকাল” বা “সুপ্রভাত” বা “সালাম” বলার মাধ্যমে মানুষ মানুষকে সম্ভাষণ করেন। কে কি বললো সেটা বড় কথা নয়, ইত্যাদি। আমার মাথা গরম হলেও ফোন করবার চেষ্টাও করতে পারিনি। পজ দিয়ে রেখে পরে অনুষ্ঠান দেখছিলাম। না আমি কখনো ফোন করিনা। কিন্তু মনে হচ্ছিল কিছু কথা বলা দরকার ছিল। এই ঘটনার পর থেকে উপস্থাপক সবার ফোনে “সালাম” বলা শুরু করলো!

আমার মায়ের থেকে বয়স্ক নারীর (শেষের দর্শক) চিন্তা ভাবনা যত স্বচ্ছ ঠিক সেই পরিমাণে আমার সমান বয়স্ক (হয়ত কিছু বেশি বা কম হতে পারে, কিন্তু আমার প্রজন্মের) প্রথম নারীটি ও পুরুষটি ততটাই অন্ধকারের জীব! ব্যর্থতা কার? আমাদের পূর্বসুরীরা যতটা অসাম্প্রদায়িক, ধর্ম নিরপেক্ষ, প্রগতিশীল ছিলেন (পরাধীন দেশের নাগরিক ছিলেন) আমার প্রজন্ম ঠিক সেই পরিমাণেই ধর্মান্ধ, সাম্প্রদায়িক, অন্ধকারের জীব! হ্যাঁ আমরা বেড়ে উঠেছি ইতিহাস না জেনে। ইতিহাসকে আটকে রেখে, আড়াল করে, বিকৃত করে একটি প্রজন্মকে বড় করলে কী হয় তা এখন পুরো জাতি বুঝছে! এর শেষ কোথায়?

বর্তমান প্রজন্মকে নিয়ে আশাবাদী হতে মন চাইলেও সেখানেও ধাক্কা খেতে হয় অনেক সময়! আমি বেশ কিছু বৎসর ধরে খেয়াল করছি যে, আমাদের কিছু ধারণা প্রশ্নের সম্মুখীন। ধারণা করা হয় যে যারা শিল্প চর্চা করেণ, যে কোনো শাখায়, তারা চিন্তায়-চেতনায় স্বচ্ছ হোন। কথাটা পুরো সত্যি নয়! আমি বেশ কিছু নারী-পুরুষকে দেখেছি, দেখছি ভালো গান, সঙ্গীত করেণ অথচ চিন্তায়-ভাবনায় অস্বচ্ছ, সাম্প্রদায়িক, ধর্মান্ধ! আজ কারো পোশাক, পেশা, শিল্প চর্চা দিয়ে কিন্তু ধরে নেওয়া যাবে না যে সে আসলেই চিন্তায়-চেতনায়-মননে কি অবস্থানে আছেন! এরকম মানুষদের দেখি (অনেক দেখি) আর ভাবি মেধার কী অপচয়! আমি ঠিক করেছি যে, সন্তানকে “গুড মর্নিং”, “গুড ইভিনিং” বা “সুপ্রভাত”, “শুভ সন্ধ্যা” বলতে বলবো। এখানে সবাই উঠতে বসতে (নিজের পরিবারের সদস্যদেরও) একাধিক বার “সালাম” দেন। এর সাথে “সোয়াবের” ব্যাপার আছে মনে হচ্ছে! আপনার উপর শান্তি বর্ষিত হোক বললেও চলবে। বা শুধুই “শান্তি” (পিস)।

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.