কেন নারীরা নারীর প্রেমে পড়ে?

women abstractজাহানারা নূরী: প্রেম কি জিনিস, ‘ আপনি ওর সাথে নিজস্ব লুকুনো আকাশের দিকে ‍উড়ে যাবেন, প্রতিমুহূর্তে ডানার ঝটপটানিতে খসতে থাকবে মানুষের প্রতি পরতের পর্দা, শুরুতে জীবন ভুলে, চূড়ান্ত সময়ে পদশূণ্য আপনার পদক্ষেপ জীবনের বাইরে।’
কিছু বন্ধু নারীর জন্য নারীর প্রেম ঘটিত বিষয়ে জানার কৌতুহল প্রকাশ করেছেন। সে কারণেই ঈষৎ  আলোকপাত করা যেতে পারে।

যেসব পাঠক প্রথাগত যৌন সম্পর্কের বাইরে মানুষকে নিয়ে ভাবতে পারেন না-লিবিডো নানা জেণ্ডারে আসা যাওয়া করতে পারে এ বিষয়টি-ঐসব পাঠককে কনফিউশনে ফেলে দিতে পারে এবং তারা আক্রান্ত এমন অনুভূতি তাদের মধ্যে জাগিয়ে তুলতে পারে। সুতরাং তারা এ লেখাটি না পড়লেই বাধিত হবো। আর যদি পড়তে চান, কোনওভাবেই আমাকে দায়ী করবেন না যে আমি আপনার মস্তিষ্কের বা আবেগের কোনও ক্ষতি করেছি।

টিভি শো নয়, এটা বাস্তব যে পুরুষ শব্দটির বাইরে গিয়ে নারীরা পরস্পরের প্রেমে পড়ে। মানুষ এবং প্রাণীজগতে এটা স্বাভাবিক। বিজ্ঞানীদের মতে প্রাণী ও মানুষের যৌনতা, আমরা যেমন প্রথা মাফিক যেমন ধরে নিই, তেমন জড় নয়। লিবিডো প্রবাহ আমাদের চিন্তার চেয়ে বেশি বহুধামুখী। যৌনতার রসায়ন জটিলতর। ‘ক্যাচ’ আর আগে এটা উপলব্ধিত হয় না। নারী পুরুষের রিলেশন পাওয়ার রিলেশন এ গড়ানোর আগ ইস্তক ‘ক্যাচ’ সহনীয় পর্যায়ে থাকে। নারী যখন তার ব্যক্তিগত মুক্তির অভিযানে বেরোয়, প্রথমেই তার ভেতর কি ধরণের পার্টনার তিনি চান সে বিষয়ে একটা যৌক্তিক ভাবনা কাজ করতে শুরু করে। মূলতঃ সম্পর্কটি নারীর মেধা ও বুদ্ধিবৃত্তিক আকাঙ্ক্ষার সাথেও মিললে তা নারীর জন্য গ্রহণযোগ্য হয়,যে ঘটনাটা প্রথাগত নারী-পুরুষ প্রেমে অধিকাংশ ক্ষেত্রে ঘটেনা।পুরুষ প্রেমিকগণ এ বিষয়টি গুরুত্ব দেন না, মূল্য দেন না।

ভালোবাসার পাত্র মানুষ নিজে পছন্দ করে নেয় না। তা ঘটে যায় বলেই সে ভালোবাসে।যদি পাত্র নারী হয় তো নারীর নার্ভাস হবার দশা। এত নার্ভাস তিনি পুরুষের প্রেমে পড়লে হন না। নারী প্রেমে পড়ার আগে কি কারণে অনুভূতিগুলো পাল্টে যাচ্ছে, তা নিয়ে গভীর ভাবনার বিষয় ঘটে। কারণ নিজের কাছে জাস্টিফাই করার ব্যাপার থাকে। পুরুষ নারীর প্রেমে এটি উপর লেভেলে কিন্ত্ত নারীর প্রেমে পড়লে তা অত্যন্ত সুক্ষ্ম অনুভূতির ভেতর উপলব্ধিত হয় কারণ ট্রাডিশনের বাইরে গিয়ে নারীকে তা নিজের কাছে জাস্টিফাই করতে হয়। একজন নারী আরেকজন নারীর প্রেমে পড়েন তখনই যখন তিনি দেখেন যে তাকে ঐ ধরণের মনোযোগ আরেকজন নারী দিচ্ছেন যা তিনি তার পুরুষটির কাছে বা কোনও পুরুষের কাছেই পান না। এটা এক সযত্ন ভালোবাসার অনুভূতি যা নারীর একাকীত্বকে দূর করে দেয় বেশিগুণে। তরুণ বয়সে আমার বন্ধুদের মধ্যে কেউ কেউ ছিলেন গে এবং লেসবিয়ান। তাদের কেউ কেউ এখনও আমার বন্ধু যদিও তারা ভিনদেশী। কোনও নারী যখন জানেন যে তিনি একজন পুরুষকে বিয়ে করতে চান বা একজন পুরুষেরই প্রেমে পড়তে চান, অবশ্যই নারীর নয়, তখন তিনি পুরুষ-নারী সম্পর্কের বাইরে গিয়ে গে কিম্বা লেসবিয়ানদের সাথে নিখাদ বন্ধুত্ব গড়তে পারেন সহজেই। এ সম্পর্কটি ভীষণ নিরাপদ হয়ে ওঠে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে কারণ এরা কেউ লিবিডোর কারণে ত্যাক্ত করবে না। বন্ধু হলে লিবিডো তাড়িত না হয়েও খাঁটি বন্ধু হবে।

কিন্ত্ত কেন নারীরা নারীর প্রেমে পড়ে তার একটা মনোজাগতিক ও সামাজিক ব্যাখ্যা দেয়ার চেষ্টা করা যায়। মেয়েরা অধিকাংশই যত্ন পায় না পরিবার থেকে না স্বামী বা প্রেমিক থেকে। গ্রাম গঞ্জে পুরুষেরা নিজের নারীটির যত্নের ব্যাপারে অযৌক্তিক ফ্যান্টাসিতে ভোগে। শহরেও। তারা মনে করে যৌনতা যত্নের পরিপূরক। কখনোই নয়। নারী দেখেন কেউ একজন তাকে বা অন্যকে তাই দিচ্ছেন যা তিনি অন্য সবাইকে দেন কিন্ত্ত পান না। কিছু গুণ আছে মেয়েরা অর্জন করেন এবং পছন্দ করেন, কিন্ত্ত সমাজের আর কারও কাছে তিনি নিজে ঐ গুণগুলো তার কাজে লাগতে দেখেন না। মেয়েরাও উদ্যোগ নেয়। ঘরে যখন উদ্যোগী হিসেবে পুরুষটির নাম তখন মেয়েটি যে উদ্যোগ গ্রহণ করে তার প্রশংসা খুব কমই মেলে। নারী যখন নারীর প্রেমে পড়ের তখন এই ব্যাপারগুলো তার মধ্যে বিকশিতরূপে দেখা যায়। এখন পাশ্চাত্য একে বলবে ‘ইটস্ জাস্ট সেক্সি।’ হেটেরোসেক্সুয়াল ফ্রেমওয়ার্কে কেউ ভাবতে পারে না ‘টেক কেয়ার’ করা, ‘পে করা’, সন্তান ও প্রিয় মানুষের ভরণ পোষণ ও পরিবার পরিচালনা পুরুষ ছাড়া আর কেউ করতে পারে। কিন্ত্ত বাস্তবে মেয়েরা তো এগুলো করে আসছে। শুধু সমাজে তা গণ্য হচ্ছে না, মূল্য দেয়া হচ্ছে না, সামাজিক শোষণমুলক সম্পর্কের রাজনীতির ভেতর নারীর এই গুণাবলী একেবারেই অমূল্যায়িত। যদিচ নারী এ নিয়ে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে আপত্তি জানায় না, কিন্ত্ত উপযুক্ত পরিবেশে অন্য কোনও নারীর ঐ সব গুণাবলি তার চোখে পড়ে। এবং সেটা তখনই যখন সে একজন নারীর প্রেমে পড়ে।

প্রাচ্য একে সেক্সি বলবে না। জীবনের আরামদায়ক অনুভূতি নারীর জীবনে বিরল। অন্তরঙ্গতা, সুইটনেস ইত্যাদি বিরল। যখন প্রেম উভয় তরফা এবং তার সাথে ‍যুক্ত থাকে প্যাশন, তখন নারী হোক কি পুরুষ, প্রেম ঘটে যাওয়ার ব্যাপারটি ঘটে।
নারীদের মধ্যে ভগ্নিভাবাপন্ন এক ধরণের ভালোবাসাও হয়। যা এশিয়ান নারীদের ভেতর দেখা যায়। মনোবিজ্ঞানীরা একে ‘ক্রস ওভার দ্য লাইন’ বলেন।জীবন ফুরিয়ে যাবার আগে সত্যিকার যত্ন ও ভালোবাসা পাওয়ার ও দেবার আকুতি থেকে তা ঘটতে পারে। পুরণো টাবু থেকে বেরিয়ে মুক্ত হওয়ার আকাঙ্ক্ষা থেকেও নারী এ ধরণের সম্পর্কে জড়াতে পারে। বস্ত্তুতঃ আমরা এমন এক পৃথিবীতে বাস করছি যেখানে যৌনতার সব ধরণের বিকল্প বর্তমান রয়েছে।পুরুষের সাথে সম্পর্ক ও যৌনতা নারীর জন্য একাধিক ফাঁদ রচনা করে রেখেছে সমাজ;
সন্তান সম্ভাবনা ও তার নৈতিকতা অনৈতিকতার প্রশ্ন,
গৃহকর্মে জড়িয়ে থাকা ও অন্য কাজের সুযোগ কমে আসা,
সম্পদ ছিনতাই হয়ে যাওয়ার উন্মাদনা সমাজকে যেভাবে পরিবারের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে সে প্রবণতা এবং সম্পদ বন্টনের প্রাতিষ্ঠানিক নীতির বৈষম্য থেকে হতাশা ইত্যাদি নানা ফাঁদ ।
যে নারীরা নারীর প্রেমে জীবন কাটিয়েছেন তাদের অধিকাংশেরই এই যায়গায় মুক্তি যে তারা যা তাই রয়ে গেছেন, সম্পর্কের খাতিরে তাকে খোল নলচে বদলে অন্য কেউ হয়ে যেতে বাধ্য করা হয় নি।‘আমি বদলে যাই নি, আমি যা তাই ছিলাম, এবং আমি আমার ভালোবাসা ছিলাম। বহু লড়াইয়ের পর বিজ্ঞানীরা এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন যে নারীর প্রতি নারীর বা পুরুষের প্রতি পুরুষের প্রেম-জাত যৌন আচরণ ডিএনএর বাইরেও নানাবিধ ফ্যাক্টর দ্বরা পরিচালিত;পরিবেশ, দেহঘড়ি এবং জীবতাত্বিক প্রণোদনা তার তিনটিমাত্র।

লিসা ডায়মন্ড নামক জনৈক আমেরিকান মনোবিজ্ঞানী ব্যাখ্যা করেছেন যে যৌনতা বহমান একমাত্র নারী চরিত্রে। এর অর্থ হতে পারে তার ভালোবাসাও বহমান। এর ক্ষান্তি হয় না, তা দমিত থাকে। এর আরেক মানে একমাত্র নারীই প্রথার বাইরে অপ্রত্যাশিত যৌনতায় সাড়া দিতে সক্ষম, যদি কোনও বিশেষ পরিস্থিতি ও সম্পর্ক তাকে সেদিকে নিয়ে যায়। রেসপন্সে নারীর রিজিডিটি তুলনামূলকভাবে কম। তার যা কিছু রিজিডিটি তা সমাজের ও অর্থনীতির ও রাজণীতির ক্ষমতাবৃত্তের ভেতর বন্দী থাকার কারণে। গবেষক জে. মিশেলেরে মতে এই ফ্লুয়িডিটির প্রণোদনা নারীর বুদ্ধিবৃত্তির মধ্যে বাস করে, ইন্সটিংকট এ নয়।
আমার যেসব কাউপল বন্ধুরা এ ধরনের বিশ্বাসের বাইরে তাদের অনুভব বলেছেন বিভিন্ন সময়ে, তারা বলেছেন যে, তারা আকৃষ্ট মানুষটায় তার জেন্ডারে নয়-মানুষটার দয়ালু, বুদ্ধিবৃত্তিক, হাস্য রসায়ন এ জাতীয় আরও নানা গুণ যা যে কোনও মানুষের মধ্যে থাকতে পারে। তারা আবেগের সাথে কারু যুক্ত হওয়াটাকে গুরুত্ব দিচ্ছেন।এই কানেকশনটা যদি পুরুষ না হয়ে নারীর সাথে ঘটছে তো প্রথার বাইরে পা দিচ্ছেন। হাংগার ফর কানেকশন, মানুষের সকল যোগাযোগের অন্যতম উদ্দেশ্য, তাই নয় কি?কানেকশনটা যখন ঘটে নারী বা পুরুষ, মানুষ ভাবেনা এটা ভুল, সে ভাবে এটাই স্বাভাবিক। পুরুষের সাথে এই কানেকশন শুধুমাত্র পেনিট্রেশনের মধ্যে আবদ্ধ হয়ে পড়ে। মানুষের সাথে মানুষের আন্তরিক সংযুক্তির বা কানেকশনের অন্যতম লক্ষ্য নিজেকে প্রসারিত হতে দেওয়া, নারীর বেলায় সমাজ যা রুদ্ধ করে রাখে, প্রজন্ম জন্ম ও সমাজের সম্পদ ব্যবস্থাপনা এবং নারীর উৎপাদনে দেয় শ্রমের বাইরে প্রদেয় শ্রম পুনরুৎপাদন (আন্তরিকতা, সেবা মায়া দয়ার মাধ্যমে)-পুরুষের হাতে রাখার খাতিরে। এই হায়ারারকি নারী ভাঙ্গতে চায়, মনের গভীরে এটা ভাঙ্গার ইচ্ছা নারীর থেকেই যেতে পারে।

যৌনতাকে জেন্ডারের সাথে যুক্ত করা থেকে বিচ্যুত হতে পারলে আমরা নারী কেন নারীর প্রেমে পড়তে পারে তার একটা ব্যাখ্যা হয়তো উপলব্ধি করতে পারি। Simone de Beauvoir তার সেকেন্ড সেক্স গ্রন্থে বলেছেন যে, নারী, নারী হয়ে ওঠেন,আসলে তিনি মানুষ হয়ে জন্মান, যে মানুষের শরীর ভিন্ন।তো এই নারী হয়ে ওঠাটা কি রকম-আমরা ক্লাসিক নারীর কথা ভাবতে পারি, যেসব ভূমিকায় সুচিত্রা অভিনয় করেছেন; লাজুক, ত্যাগী, প্রথাগত, এশিয়ান সমাজের বাইরে না গিয়ে তার চরিত্রের প্রেমের ভেতর তিনি বিচরণ করেছেন। তাকে আমরা হেটেরোসেক্সুয়াল রিলেশনে আদর্শ প্রেমিকার ভূমিকায় দেখি; প্যাসিভ, শাই, যত্নকারী-সাংস্কৃতিকভাবে প্রেমিকার নির্মিত গুণের সবক’টি তার ভেতর পুরে দিয়ে চরিত্র দাঁড় করানো হয়েছে যেখানে সুচিত্রা সেন অভিনয় করেছেন। প্রেমিকার জেন্ডার রোলস্এর চূড়ান্ত এক ইমেজ তার চরিত্রের ভেতর তৈরী হয়েছে যা নারী পুরুষ উভয়কে টেনেছে।পুরুষকে টেনেছে কারণ তার কাছে ঐ রকম সর্বত্যাগী প্রেমিকা কাঙ্ক্ষিত। বিপদে পড়লে প্রেমিকাই রক্ষা করবে এটা কে না ভাবতে চায়? নারীরাও তার প্রেমে পড়ে অনেকটা নার্সিসাস জনিত কারণে। নিজের ভেতর প্রত্যেক বাঙ্গালী নারীর ঐ রকম এক প্রেমিকা বাস করে। কিন্ত্ত যে কখনোই নিজের প্রকাশ ঘটাতে পারে না।কারণ চলচ্চিত্রে যা সম্ভব তা নিজের জীবনে প্রকাশ করা সম্ভব হয় না।তার প্রেম যখন প্রথাগত মূল্যবোধ লালিত এবং হেটেরোসেক্সুয়াল তখনও তার প্রকাশের স্থান সংকুচিত। প্রেম মানুষের চেতরা বিকাশ ঘটায়। চেতনার বিকাশের সাথে সাথে তার ভেতরের ও বাইরের স্পেস বেশি প্রয়োজন হয়।নারীর জন্য এই স্পেস বৃদ্ধি পায় না, ক্রমশঃ কমতে থাকে। সমাজের অন্য স্পেসগুলোর ভেতর নারী নিজের স্পেস খুঁজে নেবার চেষ্টা করে বাঁচার তাগিদে।

কিন্ত্ত আমি কথা এখানে শেষ করে দিতে চাই না। আমি চাই আমার নারী ফেসবুক বন্ধুরা যারা এ লেখা পড়ছেন তারা এ নিয়ে তাদের কথাগুলো বলুক এবং পুরুষ বন্ধুরা নিজেদের ধারণা প্রকাশ করুক।

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.