আমরা যারা একলা থাকি-৮

imp 1উইমেন চ্যাপ্টার: বছরের শেষের কদিন ছুটি ছিল কিন্তু অবরোধ থাকায় প্রায় অখণ্ড অবসর এই সময়টাতে কোথাও বেড়াতে যেতে পারছিলাম না। শেষে প্রিয় বন্ধুকে নিয়ে এলাম আমাদের সাথে দু তিন দিন থাকতে। আমার মেয়ের প্রিয় খালামনি এই বন্ধুটি। এর অন্যতম কারণ হল মা যে সব জিনিসে রাজী হয় না খালামনি তাতে সায় দেয়।

মেয়ের ভাষায় ‘শি ইজ র‌্যাদার কুল’। যাই হোক, দুই বন্ধু মিলে বাজার করি, রান্না করি,খাই দাই, টিভি দেখি আর গল্প করি। সকালে নাশতার টেবিলে বসে গল্প করি, দুপুরে খাওয়ার পরে সন্ধ্যে নামা পর্যন্ত গল্প করি, রাত গভীর হয়ে যায় তবু আমাদের গল্প ফুরায় না। মেয়ে হাসে, এত কি গল্প করো তোমরা! কখনো সেও এসে যোগ দেয়। আমাদের এই সময়টাকে মেয়ে নাম দিলো ‘এক্সক্লুসিভ গার্লস টাইম’!

আমার বন্ধুটিও একলা থাকে। জীবনের অনেক ঘাত প্রতিঘাত পার হয়ে আজকে একটি অবস্থানে এসেছে সে। জীবনের ঝঞ্ঝা মুখর সময়ে চেনা মানুষের চেহারা কিভাবে বদলে যায়, আবার অপ্রত্যাশিত সহযোগিতা কিভাবে বেঁচে থাকার আকাংখাকে উজ্জীবিত করে সেই গল্পই ঘুরে ঘুরে আসে।

আমার বন্ধুটি যখন একলা থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল সে আজ থেকে প্রায় দুই যুগেরও বেশী সময়। আমাদের সামাজিক পরিমণ্ডল আর পারিপার্শ্বিকতাও তখন আরও অনেকটাই রক্ষণশীল আর কঠিন ছিল। একটি মেয়ে যখন অচল বিয়েকে বাতিল করতে চাইলো তখন মেয়েটির কষ্ট, বেদনা, অপমানের চাইতেও বড় হয়ে দাঁড়িয়েছিল ‘লোকে কি বলবে! আমাদের পরিবারে এমন ঘটনা আর কখনো ঘটে নাই! মানুষকে কি উত্তর দিবো!’

একজন নারীর আত্মসন্মান বোধ, তার তিলে তিলে ধ্বংস হয়ে যাওয়া ইত্যাদির চাইতেও বড় ছিল বিবাহ নামের দলিলটি সংরক্ষিত রাখার চেষ্টা। কিন্তু জীবনের সত্যিকার প্রতিকূল সময়ের মুখোমুখি হলো আমার বন্ধুটি যখন সে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর চেষ্টা করতে শুরু করলো। আবারো সেই প্রবাদ, নাকি প্রলাপ ‘ আমাদের পরিবারের মেয়েরা ডাক্তার অথবা শিক্ষকতা ছাড়া আর কোন পেশায় যায় না।‘ বাণিজ্যে ডিগ্রীধারী আমার বন্ধুটি কাজ শুরু করলো প্রাইভেট সেক্টরে।

নুতন চাকরিতে যোগ দেয়ার পরে ব্যাঙ্কে অ্যাকাউন্ট খুলতে গিয়ে ফরমে পিতার নাম লেখার সাথে সাথে জিজ্ঞাসিত হলো, সে কি অবিবাহিত? আমার বন্ধুটি বলে, জীবনের সেই সব দিনে সাহসও কম ছিল, তাই ‘আমি ডিভোর্সড’ এই কথাটি বলতে ভয়, শংকা, লজ্জা কাজ করতো। যে অফিসার তার ফর্ম পূরণ করলো, পরেরদিন বাসায় ফোন, বন্ধুটি ফোন ধরলে বলা হল এটা ফর্মালিটি ঠিকানা চেক করার জন্য। দু দিন পরেই আবার অফিসে ফোন, সেই ব্যাঙ্কের লোকটি।‘

আজ বিকেলে অফিসের থেকে একটু আগে বের হয়ে চলে আসুন, আমার মোটর বাইকের পিছনে করে আপনাকে নিয়ে ঘুরতে বের হব!” বন্ধুটি হতবাক হয়ে বলল’ আপনাকে চিনি না, জানি না, বেড়াতে যাব কেন?’ উত্তরে তার আক্কেল গুড়ুম “দু বার ব্যাঙ্কে দেখা হয়েছে আর এখন বেড়াতে বের হলেই চেনা জানা হয়ে যাবে!” ভয়ে আমার বন্ধুটি লাঞ্চ টাইমে ছুটি নিয়ে বাড়ি ফিরে এলো, কি জানি লোকটি আবার যদি অফিসে এসে হানা দেয়!

এতো গেল একটি ছোট্ট ঘটনা, প্রতি পদে বন্ধুটি সয়েছে এই ধরনের যন্ত্রণা অফিসের বস থেকে শুরু করে সিনিয়র সহকর্মী জুনিয়র সহকর্মী,বন্ধুর স্বামী,ভাইয়ের বন্ধু,বোনের স্বামী,সম্পর্কিত মামা চাচা- সবাই কোন না কোন সময় তার একলা থাকার সুযোগ নিতে চেয়েছে। একবার আমার এই বন্ধুর এক সম্পর্কে দুলাভাই ফোন করলেন তাকে ‘ আমি অফিসের কাজে উত্তরবঙ্গে যাচ্ছি, ওই দিকে বেশ ভালো কয়েকটি দেখার জায়গা আছে, তুমি কি যাবে?’ আমার বন্ধুটি বেড়াতে ভালবাসে কাজেই প্রস্তাবে খুশি হয়ে উঠলো। কিন্তু জানতে চাইলো, বাচ্চাদের স্কুলের কি হবে, ওদের মা (বন্ধুর বোন) কিভাবে ম্যানেজ করবে? উত্তর শুনে টেলিফোন পড়ে যাচ্ছিলো তার হাত থেকে ‘ওদের মা কেন যাবে? আমি অফিসের কাজে যাচ্ছি, তুমি যাবে আমার সাথে, বেড়াবে আর আমাকে সঙ্গ দিবে! এজ সিমপল এজ ইট ইজ’! বন্ধুটি অত্যন্ত খেপে গিয়ে জানালো, সে এই কথাটি তার স্ত্রীকে বলে দিবে। দুলাভাইটি খুব সহজভাবে উত্তর দিলো যে, আমার বন্ধু যেন চিন্তা করে দেখে কথাটি সে সত্যিই তার স্ত্রীকে জানাতে চায় কিনা, কারণ যেইমাত্র স্ত্রী কথাটি লোকটিকে জিজ্ঞাসা করবে, তার উত্তর হবে একলা থাকা নারীটিই তাকে প্রলোভিত করেছে। স্বামীর কথাই বিশ্বাস করবে স্ত্রী, আর মেয়েটি আখ্যায়িত হবে নষ্ট মেয়ে হিসেবে। আমার বন্ধুটি বাস্তবতা চিন্তা করে কথাটি আর ওই লোকের স্ত্রীকে জানাতে পারেনি।

এমনকি পরিণত বয়সে এসেও নিস্তার নাই। কিছুদিন আগে জুনিয়র একটি ছেলে একই পাড়ায় থাকতো, বন্ধুটির ছোট ভাইয়ের সহপাঠী। বন্ধুটির অফিসে জয়েন করেছে। আপা আপা করে, পাড়াতুত ভাই হিসেবে অফিসের অন্য সহকর্মীর চাইতে একটু বেশী কাছের। ছেলেটি খবর আনল ভালো মুভি এসেছে, দেখতে যাবে কিনা! এর আগেও কয়েকজন মিলে গিয়েছে সিনেমা দেখতে। বন্ধুটি খুশি হয়ে রাজী, সিনেমা শুরু হওয়ার কিছু পরে বন্ধুটি খেয়াল করলো সেই ছোটভাইটির হাত তার হাতের উপরে, অসাবধানে হয়েছে ভেবে সে হাত সরিয়ে দিলো। কিছুক্ষণ পরে ছেলেটি বন্ধুর হাত মুঠো করে ধরতে চাইলে সে এবার জোরে ঠেলে সরিয়ে দিলো। বন্ধুটি আর সিনেমায় মন বসাতে পারছিল না, তার শরীর ঘেমে উঠছিল লজ্জায়! ভাবল ইন্টারভ্যালের সময় সে চলে যাবে। ভাবতে না ভাবতেই মাথায় বাজ পরা অনুভুতি নিয়ে আক্ষরিক অর্থেই স্তম্ভিত হয়ে সে দেখে ছেলেটির হাত তার উরুর উপরে।

বন্ধুটির ভাষায় ‘কেমন এক ধরনের ভয় মিশ্রিত লজ্জা আর অপমানবোধ নিয়ে উঠে দাঁড়িয়ে বললাম আমি আর সিনেমা দেখব না, আমি যাচ্ছি।‘ সেই ছোট ভাইটিও সাথে সাথে বের হয়ে এলো, বলল ‘চলেন কোক খাই’ যেন কিছুই হয়নি! বন্ধুটি ততক্ষণে মানসিকভাবে অসুস্থ বোধ করতে শুরু করেছে। কিছুই না বলে সে চলে এলো। পরে আমি যখন বললাম ‘থাপ্পর মারলে না কেন তুমি?’ সে বলল, ‘আমার মাথা কাজ করছিল না, কেমন যেন আতংকিত বোধ করছিলাম। আর ভাবছিলাম আমার কোন আচরণে সে এমন করতে সাহস পেলো!‘

এই আতংক বোধ আর অপরাধ বোধ নিয়েই আমাদের মতন একলা থাকাদের সারাটা জীবন কাটাতে হয়। পুরুষের অকারণ অসভ্য আর অশালীন আক্রমণের আঘাতে অপমানিত আমরা নিজের দোষ খুঁজতে খুঁজতে মানসিক ভাবে ক্ষত বিক্ষত হতে থাকি! আর কতদিন এভাবে?

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.