নবজাতকের জন্য মাত্র ৬০ সেকেন্ড সময়ই অনেক মূল্যবান

ma o sisu উইমেন চ্যাপ্টার ডেস্ক (জুন ৭): একটি সন্তানের জন্ম হচ্ছে পুরো নয় মাসের পরিকল্পনার চূড়ান্ত পর্যায়। সেইসাথে বিশাল আনন্দেরও। সম্ভবত এটি হচ্ছে একটি মেয়ের জীবনে সবচেয়ে আনন্দময় এক অভিজ্ঞতা এবং জীবনের অন্যতম বড় একটি উৎসব। তবে প্রসবের পর মূহূর্তে নি:শ্বাস নিতে না পেরে যখন একটি শিশুর মৃত্যু হয় তখন সেই আনন্দময় মূহূর্ত ছেয়ে যায় বিষাদে। বাবা-মাকে তাদের পরম কাঙ্খিত শিশুকে স্বাগত জানানোর পরিবর্তে বিদায় বলতে হয়।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) হিসাব মতে, প্রতি বছর ১০ লাখ শিশু মারা যায় জন্মের অব্যবহিত পরে নি:শ্বাস নিতে না পেরে, একে বলে জন্মকালীন শ্বাসরোধ। বাংলাদেশে পাঁচ বছরের নিচের বয়সী যেসব শিশুর মৃত্যু হয় তার শতকরা প্রায় ৫৭ ভাগ অথবা প্রায় ১ লাখ ১৩ হাজার শিশুই মারা যায় জন্মের চার সপ্তাহের মধ্যেই। এদের মধ্যে আবার এক চতুর্থাংশ শিশুর মৃত্যু হয় জন্মকালীন শ্বাসরোধের কারণে। তবে এ নিয়ে হতাশ হওয়ার কিছু নেই।

বিভিন্ন সাক্ষ্যপ্রমাণে দেখা গেছে যে, প্রসবের সময় এবং তার পরের সপ্তাহগুলোতে বাড়ি অথবা স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোতে খুব সহজ এবং কম খরচসম্পন্ন পদ্ধতি ব্যবহার করে নবজাতক শিশু মৃত্যুর একটি বড় অংশ এবং অসুস্থতা এড়ানো সম্ভব। উদাহরণস্বরূপ, একটি সহজ ও তাৎক্ষণিক উপায় হচ্ছে, শিশুকে উষ্ণ ও শুষ্ক রাখা এবং স্পর্শের মাধ্যমে উদ্দীপনা তৈরি করা হচ্ছে নবজাতকদের রক্ষায় প্রথম পদক্ষেপ।

শিশুদের একটি ছোট্ট অংশ জন্মের সময় শ্বাস নিতে পারে না। তাদের জন্য প্রয়োজন হয় কৃত্রিমভাবে শ্বাস-প্রশ্বাসের ব্যবস্থা করা। শিশুকে শ্বাস-প্রশ্বাসে সহায়তা বা হেল্পিং বেবিজ ব্রেথ (এইচবিবি) হচ্ছে সীমিত ব্যবস্থাসম্পন্ন এলাকায় নবজাতকের জীবন রক্ষাকারী কৌশল শেখাতে খুবই সক্রিয় শিক্ষামূলক একটি কর্মসূচি। এইচবিবি হচ্ছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, ইউএসএইড, সেভিং নিউবর্ন লাইভস, দ্য ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব চাইল্ড হেলথ এন্ড ডেভেলপমেন্ট এবং বিশ্বের আরও বেশ কিছু সংখ্যক স্বাস্থ্য সংস্থার সাথে যৌথ সহযোগিতায় আমেরিকান একাডেমি অব পেডিয়াট্রিকস (এএপি) এর একটি উদ্যোগ।

এইচবিবির উদ্দেশ্য হচ্ছে দক্ষ প্রসব সহায়তাকারীদের প্রশিক্ষণ দেওয়া। আর এসব সহায়তাকারী হচ্ছেন বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোতে নবজাতকের জীবন রক্ষায় অত্যাবশ্যকীয় দক্ষতা বিষয়ে বাড়তি প্রশিক্ষণ ও সার্টিফিকেট পাওয়া প্রচলিত প্রসব সহায়তাকারী বা ধাত্রী। পাশাপাশি এইচবিবির লক্ষ্য হচ্ছে অন্তত একজনকে খুঁজে পাওয়া যিনি যেকোনো নবজাতকের জীবনরক্ষায় বেশ দক্ষতাসম্পন্ন।

এইচবিবির মূল ধারণা হচ্ছে দ্য গোল্ডেন মিনিট। অর্থাৎ জন্মের এক মিনিটের মধ্যেই একটি শিশুর ভালভাবে নি:শ্বাস নেওয়ার কথা, অন্যথায় ব্যাগ ও মাস্ক এর সাহায্যে তাকে কৃত্রিমভাবে শ্বাস-প্রশ্বাসে সহায়তা করতে হবে। দ্য গোল্ডেন মিনিট সেই পদক্ষেপগুলো চিহ্নিত করে, যা একটি শিশুর জন্মের সাথে সাথেই তাকে পর্যবেক্ষণ করা এবং শ্বাস-প্রশ্বাসে সহায়তা দিতে একজন প্রসব সহায়তাকারীর অবশ্যই নেওয়া উচিত। এইচবিবি অনুশীলনসমূহের ওপর দৃষ্টিপাত করে, যাতে করে জন্মের সময় শিশুর দেখভালকারীরা যেন স্বাস্থ্যবান শিশুর কীভাবে যতœ নিতে হয় অথবা যেসব শিশু নিজে থেকে নি:শ্বাস নিতে পারে না, তাদেরকে কীভাবে সহায়তা দিতে হয়, তা শিখতে পারেন।

২০১০ সালে বাংলাদেশের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল ইউনিভার্সিটিতে এইচবিবি বিষয়ে একটি পাইলট গবেষণা চালানো এতে সহযোগিতা করেছিল ইউএসএইড আর অর্থায়ন করেছিল মেটারনাল এন্ড চাইল্ড হেলথ ইমপ্লিমেন্টেশন প্রোগ্রাম (এমসিএইচআইডি)। এই গবেষণায় দেখা গেছে যে, এইচবিবি প্রটোকল কমিউনিটি এবং স্বাস্থ্যকেন্দ্র সব পর্যায়ে দক্ষ প্রসব সহায়তাকারীদের (এসবিএ) জন্য কার্যকর।

এমসিএইচআইপির মাধ্যমে ২০১১ সালের এপ্রিলে শুরু হওয়া জাতীয় এইচবিবি সম্প্রসারণের পরিকল্পনায় সহায়তা দিতে ইউএসএইড অঙ্গীকারাবদ্ধ। এই সম্প্রসারণ পরিকল্পনায় আছে সরকারি স্বাস্থ্য খাতে প্রায় ২০ হাজার দক্ষ প্রসব সহায়তাকারীকে প্রশিক্ষণ দেওয়া এবং কমিউনিটি পর্যায়ে তাদের ব্যাগ ও মাস্ক উপকরণ দেওয়ার পাশাপাশি সরকারি স্বাস্থ্য কেন্দ্রগুলোকে সমৃদ্ধ করা।

বাংলাদেশে এইচবিবির সম্প্রসারণ উদ্যোগ এরই মধ্যে চিকিৎসক, নার্স ও প্যারামেডিক এবং পরিবার কল্যাণ স্বেচ্ছাসেবক এবং কমিউনিটি পর্যায়ে দক্ষ প্রসব সহায়তাকারীসহ প্রায় সাত হাজার ২০০ জনকে প্রশিক্ষণ দিয়েছে। মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, জেলা হাসপাতাল, মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্র, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রসহ সব সরকারি স্বাস্থ্য কেন্দ্র এবং কমপক্ষে ১৯০০ কমিউনিটি দক্ষ প্রসব সহায়তাকারীকে এরই মধ্যে নবজাতকের জীবনরক্ষাকারী বিভিন্ন উপকরণ দেওয়া হয়েছে।

লেখক: ড. সৈয়দ/সাঈদ রুবায়েত (সংগৃহীত)

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.