তিনটি কারণে সীমান্তে ৮০ ভাগ মেয়ের বাল্যবিবাহ!

0
Black womenউইমেন চ্যাপ্টার : বাংলাদেশের সর্বদক্ষিণের সীমান্তবর্তী জেলা সাতক্ষীরা সদরে বাল্যবিবাহের হার ৮০ ভাগেরও বেশি। জেলা সদরের বাঁশদহে শিক্ষার হার ৭০ ভাগের কাছাকাছি। তবে এর মধ্যে নারীর অংশীদারিত্ব সর্বোচ্চ ১৫ ভাগ। নারীরা এখানে বাল্যবিবাহ ছাড়া আর কোনো সূচকে এগোয়নি! সারা দেশের যে কোনো অঞ্চলের সঙ্গে তুলনা করলে দেখা যাবে সাতক্ষীরায় বাল্যবিবাহের হার অতি উচ্চ। ৮০ ভাগেরও বেশি। সরেজমিন অনুসন্ধানে দেখা যায়, ৩ কারণ এ অবস্থার জন্য দায়ী। মূলত ধর্মীয় মৌলবাদ, সীমান্তবর্তী চোরাচালান ও পাচারই নারীদের এই পরিস্থিতির জন্য দায়ী। এর সঙ্গে যুক্ত গরিব কৃষকের অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা।

ধর্মীয় মৌলবাদ সাতক্ষীরার অন্যান্য এলাকার মতোই বাঁশদহেও প্রবল। বাঁশদহের হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের দেয়া তথ্যানুযায়ী, এই অঞ্চলের হিন্দুদের সংখ্যা ক্রমশ কমছে। ধুঁকে ধুঁকে এখনও কিছু হিন্দু ধর্মাবলম্বী পরিবার এখানে টিকে আছে। তারা এলাকার মোট জনসংখ্যার প্রায় ২০ ভাগ। সংখ্যালঘু হিসেবেই তারা জীবন যাপন করে। নানা প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে তাদের বেঁচে থাকতে হয়। জীবনের নিরাপত্তা নেই। এবার প্রশাসনের কঠোর অবস্থানের ফলে বড় দূর্ঘটনা না ঘটলেও সাধারণত দেশের কোথাও কিছু হলে তার প্রভাব পড়ে এই এলাকার হিন্দুদের ওপর। তাদের ঘর বাড়ি ভাঙচুর হয়। মেয়েরা ধর্ষণের শিকার হয়। পুরুষদের জীবন যায়। এই পরিস্থিতির কারণে হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা তাদের মেয়েদের স্কুলে পাঠায় না। অল্প বয়সে বিয়ে দিয়ে পিতারা নিশ্চিন্ত হতে চায়।

ধর্মীয় মৌলবাদের প্রভাব শুধু হিন্দু নারীদের ওপরেই পড়ছে, তা না। মুসলিম নারীরাও এর স্বীকার হচ্ছেন। অধিকাংশ মুসলিম পরিবারের পিতারা মনে করেন, দ্রুত মেয়েদের বিয়ে দেয়াটা তাদের কর্তব্য। এটাকে ধর্মীয় নির্দেশনা হিসেবেও প্রচার করা হয়। এলাকার ইমাম, মৌলভি, ধর্মীয় রাজনৈতিক নেতারা এসব প্রচার প্রচারণা চালান। যে দু একজন মেয়েদের অল্প বয়সে বিয়ে দিতে চান না, তারাও সামাজিকভাবে অপদস্থ হওয়ার ভয়ে পিছিয়ে আসেন। ফলে অধিকাংশ মেয়েকেই ১৫ বছর বয়সের মধ্যে অচেনা অজানা পুরুষের সঙ্গী হতে হয়। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই মেয়ের সঙ্গে তার বরের বয়সের ব্যবধান ১০ থেকে ১৫ বছরের কাছাকাছি। যা মেয়েটির ওপরে পারিবারিক নির্যাতন চালানোর জন্য সহায়ক ভূমিকা পালন করে।

দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সীমান্তবর্তী এলাকা এই বাঁশদহ। নিকটেই তেলিগাতি সীমান্ত। সীমান্তবর্তী চোরাচালান এই অঞ্চলের অর্থনীতির ভিত্তি হলেও নারীদের জন্য এটা বিরাট বিপদ বয়ে এনেছে। চোরাচালানের কাজের সঙ্গে এখানে যুক্ত প্রচুর মানুষ। প্রায়ই এসব লোক জেলে যায় বা পুলিশের হাতে ধরা পড়ে। এসব পরিবারের মেয়েদেরও কম বয়সে বিয়ে দিয়ে দেয়া হয়। সামাজিক সম্মান ক্ষুণ্ণ হওয়ার আগেই মেয়েকে ভালো বাড়িতে বিয়ে দেয়ার একটা চেষ্টা থাকে। আবার চোরাচালানের মাধ্যমে আসা অবৈধ পণ্যের কারবারীরাও সাধারণত তাদের মেয়েদের ঘরে রাখতে চান না। দ্রুত বিয়ে দিয়ে দেন।

সাতক্ষীরার অধিকাংশ স্থানের মেয়েরাই পাচার আতঙ্কে জীবন কাটায়। বাঁশদহের মেয়েরাও তাই। জীবনে যে ক’দিন তারা বেঁচে থাকে, তার প্রতি মুহূর্তেই তাদের ওপর ভর করে থাকে পাচারের আতঙ্ক। দালালের মাধ্যমে মেয়েরা ভারতে পাচারের শিকার হয়। প্রেমে ফেলে, বিয়ের প্রলোভন দিয়ে, চাকরি বা সুযোগ সুবিধার প্রস্তাব, কিংবা অপহরণ, অজ্ঞান করে, রাস্তা থেকে তুলে নিয়ে, ঘুমের ওষুধ খাইয়ে, এ রকম আরও অনেক পদ্ধতিতে মেয়েদের পাচার করে দেয়া হয়। পাচার চক্র এর মাধ্যমে বিরাট মুনাফা করে। থানা, পুলিশও তাই অনেক ক্ষেত্রে তাদের অংশীদার। সোমত্ত বা পূর্ণবয়স্ক মেয়েরা তাই এখানে পুরুষ বা বেশি লোকজন ছাড়া বাড়ি থেকে দূরে কোথাও যায় না। মেয়ে বড় হলে, বিয়ের যোগ্য হলে পাচারকারীদের হাতে পড়তে পারে, তাই আগে ভাগে অল্প বয়সেই মেয়েকে বিয়ে দিয়ে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে চায় অনেক পিতা। ফলে বাল্যবিবাহের বলি হতে হয় মেয়েদের।

আবার গরিব কৃষকেরা অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণেও মেয়েদের দ্রুত বিয়ে দিচ্ছে। এসব নানা সমস্যা প্রত্যক্ষভাবে এই অঞ্চলের মেয়েদের পিছিয়ে থাকার পেছনে ভূমিকা রাখছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নারীর ক্ষমতায়ন না ঘটা ও অর্থনৈতিক অস্বচ্ছলতা। সারা দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে মেয়েদের যতটা শ্রমে বা বিভিন্ন পেশায় যুক্ত হতে দেখা যায়, তার তুলনায় সাতক্ষীরায় মেয়েরা বলতে গেলে ঘরকুনো। ওপরের সমস্যাগুলোর কারণে তারা এই বৃত্ত ভেঙে বেরিয়েও আসতে পারছে না। সরকারেরও এক্ষেত্রে তেমন কোনো বিশেষ উদ্যোগ নেই। যে কারণে বাল্যবিবাহের অভিশাপ বয়ে বেড়াতে হচ্ছে এই অঞ্চলের ৮০ ভাগ নারীকেই। যা তাদের ঠেলে দিচ্ছে অকাল মৃত্যু, সীমাহীন নিপীড়ন ও চিরকালের অনিশ্চয়তার বৃত্তে।

(মুক্তকথা থেকে গৃহীত)

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

লেখাটি ১২ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.