একজন সুচিত্রা সেন

Suchitra Senপ্রভাতী দাস: একজন রমা দাশগুপ্তা কে তেমন করে জানা হয়নি। তিনি পাপারাৎজি আর ভক্তকুলের অতি উৎসুক চোখের আড়ালে নিজেকে দিব্যি গুটিয়ে প্রাইভেট রাখতে পেরেছিলেন। কিন্তু সুচিত্রা সেন, জীবন নামক কানাগলির মোড়ে মোড়ে আপনার সাথে বার বার দেখা হয়ে গেছে, ইচ্ছেতে তো বটেই, কখনো কখনো আবার ঘোর অনিচ্ছাতেও।

অভিনেত্রী হতে চাইনি কোনদিনও, কিন্তু আপনার নিমিত্তেই জানা হয়েছে, জীবনের নাট্যশালায় নারী আর অভিনেত্রী শব্দ দুটো আসলেই প্রায় সমার্থক। জাতীয় বা আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির অপেক্ষায় তাকে নিয়ত মেক আপ, দৃশ্য পট আর কলাকুশলী বদলিয়ে অভিনয় করে যেতে হয় আপাত প্রায় অনন্ত মনে হওয়া পূর্ণ দৈর্ঘের রোমান্টিক কমেডিতে। ট্র্যাজিক্যালি, চিত্রায়নের শেষে পরিচালকের নির্দেশনা এবং সম্পাদকের এডিটিং এর নিষ্ঠুর কাটা ছেড়ায় ‘নারী জীবন’ পূর্ণ দৈর্ঘে মুক্তি পায় না কোন প্রেক্ষাগৃহে, স্বল্প বাজেটের স্বল্প দৈর্ঘে চলচ্চিত্রটি প্রদর্শিত হয় অখ্যাত কোন আর্ট গ্যালারীর স্বল্প কিছু দর্শক উপস্থিতিতে। তারপর প্যাঁচানো ফিতার রোল হোয়ে পড়ে থাকে, কোন কালে কোন এক সংবেদনশীল ফিল্ম ক্রিটিক এর ক্রিটিক্যাল রিভিউ’র অপেক্ষায়। তিনি অনাকাঙ্ক্ষিত বিস্ময়ে আবিষ্কার করেন কাটা ছেড়ায় বাদ পড়ে গেছে অনেক সম্ভাব্য অস্কার বিজয়ী অভিনয় দৃশ্য। তখন ড্রয়ারের এক কোনায় দুমড়ে মুচড়ে পড়ে থাকা প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণের আবেদন পত্র খুঁজে পাওয়া গেলেও, ততদিনে সে বহুকালের মেয়াদ উত্তীর্ণ। নিঃশ্বাসে অক্সিজেনের অভাব তাই সময় সময় সব নারীর-ই হয়, ফুসফুসে বাতাস ভরে থাকে, বাতাস মানেই তো আর অক্সিজেন নয়। গত কয়েকদিন অক্সিজেন খুঁজছি খুউব আমি-ও, সুচিত্রা সেন।

প্রথম দেখায় আমরা অনিবার্য প্রতিপক্ষ। বাঙালি বালিকার চির নির্ধারিত প্রেম অপু, শেখর; রবি, শরত। তারপর হেমন্ত আর হ্যাঁ, আপনার উত্তম কুমার। জন্মের আগেই উত্তম কুমার সুচিত্রা সেন এর হোয়ে গেছেন, হতাশ বালিকা বিনা যুদ্ধে নাহি দেবে ভালবাসার বিত্ত বেসাত। উত্তমের কালে জন্ম হয়নি বলেই কি তাঁর প্রেমে পড়তে নেই? নাহয় সিনেমার স্ক্রিপ্টে আপনি তাঁর স্বপ্নে দেখা রাজকন্যা, কিন্তু জীবনের কাল্পনিক খাতায় আমার নাম থাকতে বাধা কই! বালিকা নির্বোধ, লোকচক্ষুর অন্তরালে যাদুর আয়নাকে বার বার জিজ্ঞেস করে উত্তমের বিপরীতে সুচিত্রা না আমি, কাকে ভালো মানায়। মিথ্যেবাদী আয়না যতবারই আপনার নাম বলুক না কেন, মানতে তার ঢের বয়ে গেছে। “এই মধু রাত শুধু ফুল-পাপিয়ার, এই মায়া রাত শুধু তোমার আমার”…, ঠোঁট উল্টে বলেছিলাম, যাদুকর উত্তমের সাক্ষাৎ পেলে সুচিত্রা সবাই হতে পারেন, যাদু সুচিত্রায় নেই।

হারানো সুর, পথে হোল দেরি, শিল্পী, সাত পাকে বাঁধা, উত্তর ফাল্গুনী দেখতে দেখতে একদিন বুঝতে পারি, দিনের আকাশে সূর্যের প্রখরতায় উত্তম থাকলেও; একপাশে চাঁদের স্নিগ্ধ নীরব উপস্থিতিতে সুচিত্রাকে ঠিক ঠিক পাওয়া যায়। রাতের আঁধারে সূর্য যখন আকাশ ছাড়া বেদনার অশ্রু আড়াল করতে তখনো থাকে শুধু চাঁদেরই আলো। মেনে নিতে হয়, উত্তমের জন্য সুচিত্রা নয় বোধহয় সুচিত্রার জন্যই উত্তমের জন্ম। আমি হার মানি, উত্তম আসলে আপনার-ই। আপনি ছাড়া উত্তম কুমারে যাদু নেই কোন।

জানা হয় উত্তম কুমার এর জন্য যে অনুরক্তি তা নেহাত-ই মোহ, আসলে ভালোবাসি আপনাকেই। এ পর্যায়ে গৌরি দেবী বা সুপ্রিয়াকে তাই অসহ্য মনে হয়। কৃষ্ণ প্রেম যদি রাধার নাই হবে, তবে শ্রী কৃষ্ণ হৃদয় প্রেমহীন পাষাণ হোক, তিনি গৃহহীন বাউণ্ডুলে হোন। কিশোরী অর্বাচীন তখনও ঠিক, তবু বোধিবৃক্ষের সাক্ষাৎ পেতে তার খুব বেশী দেরি হয়না। সে অচিরেই জেনে যায়, চোখের সদর দরজায় পরে থাকা অনিবার্য ‘যাহা পাই তাহা চাইনা’ এড়াতেই সেলুলয়েডের প্রেম কে রুপালি পরদায় আটকে রেখে নিত্যদিনের চৌহদ্দিতে ফিরে গেছেন মিসেস সেন, একাকী। সেকথা আপনি বলেননি কোনদিন, কিন্তু নারী মাত্রেরই এ অনিবার্য মোক্ষলাভ, কালের ডাকপিয়ন সে বার্তা তার ডাক বাক্সে পৌঁছায় নিশ্চিত নির্ভরতায়। আপনাকে তাই এবারে দেখা হয় বিমোহিত মুগ্ধতায়, কখনো শিক্ষাগুরুর নিপুণ বিশ্লেষণে আবার কখনো বন্ধুর অপত্য বাৎসল্যে আপনি আমাকে পথ দেখিয়ে নিয়ে চলেন, কানাগলির গলিটারও একদিকে শেষ খুঁজে পাব আশা জন্মায়।

আচ্ছা সুচিত্রা সেন, আপনার কি কোনদিন জানতে ইচ্ছে করে রবি ঠাকুর ঘরার জল আর দিঘীর জলের ফারাক বিলেত ফেরত বাবু অমিত রায় এর পাশাপাশি কেতকী বা লাবণ্যকে জিজ্ঞেস করলে তাঁরা কি বলতেন! আমার কেন জানি মনে হয় তাঁদের বক্তব্যে ভাষার পার্থক্য থাকলেও ভাবের পার্থক্য আদৌ কিছু থাকতো না। পার্থক্য আসলেই বা কি, সে কি শুধু তারই নয় যে পার্থক্য করে। কেতকী বা লাবণ্য দুজনেই জানে তৃষ্ণা মেটাতে গিয়ে দিঘীরও কোন কোন দিন ঘড়া এমনকি আজলায় ঠাঁই নিতে হয়। নাহয় দিঘীতে নাক ডুবিয়ে জল খেতে গিয়ে বহু আনাড়ির অপমৃত্যু ঘটত। আপাত অতলান্ত জলেরও তলদেশ থাকে আবার জায়গা মত নিয়ে দেয়াল ভেঙে দিলে ঘড়ার জলেরও দিঘী হতে তেমন কিছু সময় লাগেনা, নিদেন পক্ষে বাষ্প হোয়ে আকাশে তো উড়ে যেতে পারে। বন্দি থাকা না থাকাটা কেবল ইচ্ছে আর অনিচ্ছের অযৌক্তিক খেয়াল। এ সত্য অমিত না বুঝলেও নাছোড়বান্দা শোভনলাল কিন্তু ঠিক-ই বুঝেছিল। আমিও জানি রমা দাসগুপ্তা কি করে সুচিত্রা সেন হয়ে উঠেন, আর সুচিত্রা সেনও কেন রমার কাছেই স্বেচ্ছা নির্বাসনে যান।

বলেছিলাম অভিনেত্রী হতে চাইনি, কিন্তু আসল সত্য আপনিও জানেন; আপনি, আমি আমরা সবাই এক একটি পূর্ণ বা স্বল্প দৈর্ঘের ‘দীপ জ্বেলে যাই’; প্রতিটি নারী-ই একেক জন রমা তথা সুচিত্রা সেন তথা রাধা, বিকল মনের হারানো কলকব্জা সারাতে সারাতে নিজের মনটি-ই হারিয়ে ফেলে একাকী অসহায়, তবুও কি অনিন্দ্য, কি মহিমান্বিত! সেই শত সহস্র সুচিত্রা সেন গত কয়েকদিন কি এক ঘোর আশংকায় অন্তর্বাষ্প সংবরণ করে শ্বাসনালী উন্মগ্ন করেছে বারবার। আপনার নন ইনভেসিভ ভেন্টিলেশন মেশিনে তাদের সেই ভালবাসার অক্সিজেন-এর উপস্থিতি টের পাচ্ছেন আপনি, পাচ্ছেন তো… ? অন্তত আপনি তো জানেন, অনন্তের কোন প্রস্থান নেই।

(লেখক যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী)

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.