ধর্ম নিরপেক্ষতা-কেবলই একটি শব্দ

Hindu 3তানিয়া মোর্শেদ: এক বন্ধু ফেইসবুক মেসেজে একটি লেখার (নিজের নয় অন্য একজনের) লিংক দিয়েছে। নিজে পোস্ট না করে কিছু মানুষকে মেসেজে দিয়েছে। তাকে বলা হয়েছে যে, ফেইসবুকে এসব থেকে দূরে থাকতে! তার বাবার বাড়ীতে ঢিল ছুঁড়ে কাঁচ ভেঙ্গেছে, কিছুদিন আগে। না আমি কিছুই বলতে পারিনি তাকে! কি বলবো আমি!? তার পোস্টটি শেয়ার করেছি।

সেখানে দেখছি যে, শত্রু সম্পত্তি আইন (এ নাম আজও আছে? পাকিস্তানের ভূত এখনও ঘাড়ে চেপে আছে?) অপব্যবহার করে হিন্দুদের সম্পত্তি দখলকারীদের % হচ্ছে, আওয়ামীলীগ ৪৪.২%, বি,এন,পি ৩১,৭%, জাতীয় পার্ট ৫.৮, জামাত ৪.৮%, অন্যান্য ১৩.৫%! কেউ কি আশ্চর্য্য হচ্ছেন না?? হ্যাঁ কম বেশী সবাই জানি যে (স্বীকার করি বা না করি), হিন্দুদের সম্পত্তি দখল করার জন্য অনেকেই সুযোগ খোঁজেন, রাজনৈতিক ভাবে যে দলেরই হোক না কেন। জামাত নিয়ে বলবার আছে কিছু? তারা তো অমুসলমানদের মানুষই মনে করে না। বিএনপিও তাই। সবচেয়ে বড় ধাক্কা লেগেছে আওয়ামী লীগের মানুষদের অংশগ্রহণের হার দেখে!

আমি জানতে চেয়েছিলাম মানুষের মতামত এ বিষয়ে, আমার বন্ধুতালিকার কিছুজনের কাছে। না আমি কোনো সেলিব্রিটি নই যে মানুষ হুমড়ি খেয়ে মন্তব্য করে খুশী হবে। কিন্তু একজনও মন্তব্য না করায় মনে হচ্ছে যে, এটা একটি অস্বস্ত্বিদায়ক প্রশ্ন, মানুষ এখন বাধ্য না হলে মৌনতায় বিশ্বাসী হয়েছেন! অথবা কেউ কি ভাবছেন যে এ আবার কার টাকা খেয়ে এসব শুরু করলো?

আজকাল কেউ কিছু বললেই কোনো না কোনো দলের, মতের ট্যাগ দেওয়া নিয়মিত ব্যাপার হয়েছে। তবে আমি ভাবছি না যে আমার ফ্রেন্ডলিস্টের কেউ তা ভাববেন। সবাই আমাকে চেনেন, জানেন এ দাবী করছিনা। আমার মত অতি সাধারণ, অপরিচিত মানুষরা কারো টাকা খায় না। প্রসঙ্গে আসি। যতটা বুঝছি যে, “ধর্ম নিরপেক্ষতা” শব্দটির অনেক ব্যবহার হলেও এর প্রকৃত অর্থ বা রুপ খুব কম মানুষ ধারণ করেণ। বোঝেন কম বলে কাউকে অপমানিত করছি না।

আমি অনেক সময় শুনেছি বাংলাদেশী মুসলমানরা বলছেন যে, বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি অন্য অনেক দেশের থেকে ভালো! আমার কথা হচ্ছে যে, যে কোনো দেশে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি কেমন, বা ধর্মীয় সংখ্যালঘুরা কেমন আছেন, থাকেন তা তারাই বলবেন। সংখ্যাগরিষ্ঠরা কি ভাবে তা বলেন?! ধর্ম নিরপেক্ষতায় বিশ্বাসী মানুষ হলেও সংখ্যালঘুর যাতনা পরিপূর্ণ ভাবে ধারণ করা কী সবার পক্ষে সম্ভব! কারো জুতোয় না হাঁটা পর্যন্ত অধিকাংশ মানুষ বোঝে না সেই মানুষের কষ্ট!

ধর্ম নিরপেক্ষতা বাংলাদেশে কেন নেই তা ভাববার সময় অনেক আগেই ফেলে এসেছি! একজনের লেখায় কিছু তথ্য আছে যা তুলে দিচ্ছি,  “ওআইসিতে বাংলাদেশকে অন্তর্ভূক্তকরণ,ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা, কাকরাইল মসজিদের জন্য অতিরিক্ত জায়গা প্রদান, বাংলাদেশ মাদ্রাসা শিক্ষাবোর্ড পুনর্গঠন, টঙ্গীতে বিশ্ব ইজতেমার জন্য স্থান নির্ধারণ, বেতার ও টিভিতে কোরআন শরিফের তেলাওয়াত সম্প্রচার, হাজিদের জন্য ভ্রমণকর বাতিল করা, রাষ্ট্রীয়ভাবে ঈদে মিলাদুন্নবী পালন”।

“গেল মেয়াদেই শেখ হাসিনা সংবিধানে বিসমিল্লাহ’কে বৈধ ঘোষণা করেছেন, রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে ইসলামকে জারি রেখেছেন। সরকারের শেষ সময়ে পাশ হলো ইসলামী আরবি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিল। পাশাপাশি কওমি মাদ্রাসার শিক্ষা সনদের মান উন্নীত করে সমমান করা হয়েছে। বাংলা ভাষা সর্বস্তরে প্রতিষ্ঠার দাবিকে পদদলিত করে দেশে ইসলামী আরবি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা”।

তার আনা অভিযোগগুলো আওয়ামীলীগের সরকারের (প্রাক্তন ও বর্তমান) বিরুদ্ধে। আমি এই লেখাটি শেয়ার করেছিলাম, কারণ জানতে চেয়েছিলাম যে এগুলো কাউকে ভাবায় কিনা? একজনই মন্তব্য করেছেন। লেখকের রাজনৈতিক মতবাদে বিরোধীতা থাকতে পারে কিন্তু অপছন্দের কথা বললেই টাকা খাওয়ার অভিযোগ! আমি শুধু জানতে চেয়েছিলাম যে অভিযোগ কি ভুল? আমার ব্যক্তিগত মতামত হচ্ছে যে, ধর্ম নিরপেক্ষ হতে হলে রাষ্ট্রকে ধর্মীয় যে কোনো বিষয় থেকে দূরে থাকতে হবে। হোক তা ৯০% মানুষের ধর্ম। আর যদি কোনো অনুষ্ঠান শুরু করতে কোরাণ পাঠ করা হয়, তবে  অন্যান্য সব ধর্ম গ্রন্থ থেকেও পাঠ করতে হবে। মনে আছে, আমার বর্তমান বসবাসের জায়গায় প্রথম বাংলা অনুষ্ঠানের সময় কেউ কেউ বলেছিলেন যে কোরাণ পাঠ দিয়ে শুরু করতে হবে। (শুনেছি যে এই অনুষ্ঠানের প্রায় দশ বৎসর আগে শেষ বাংলা অনুষ্ঠান হয়েছিল! এটা হুজুরদের জায়গা নামে অন্যান্য জায়গায় পরিচিত)।

না কোরান পাঠ হয়নি। কারণ দেখানো হয়েছিল যে, অন্যান্য সব ধর্মের মানুষ নেই যারা ধর্ম গ্রন্থ পাঠ করবেন। সংবিধানে “বিসমিল্লাহ”, রাষ্ট্র ধর্ম “ইসলাম” রেখে ধর্ম নিরপেক্ষ রাষ্ট্র কী ভাবে সম্ভব তা আমাকে কেউ বোঝাবেন কি?! অন্য একটি লেখায় দেখলাম যে, ১৯৪৭-এ পূর্ব পাকিস্তানে (বর্তমান বাংলাদেশে) ২৮% হিন্দু ছিলেন। আজ তা কমতে কমতে ৮% এ এসে দাঁড়িয়েছে!

মানুষ তো সামনের দিকে এগোয়! আর কতকাল বাংলাদেশীরা ভাববে যে, হিন্দুদের ভোটে আওয়ামীলীগ জেতে! আর কতকাল হিন্দুদের ভোট দেবার ছবি ছাপিয়ে উস্কানী দেওয়া হবে? প্রথম আলো হিন্দু নারীদের ভোট দেবার ছবি ছাপিয়ে ভুল নয়, অপরাধ করেছে। যেখানে মানুষ ভোট দেয়নি বলছে সেখানে হিন্দু নারীদের (ফটোশপের কথা যদি নাও বলি!) ছবি ছাপানো কি বোঝায় তা বুঝবার মত মানুষ এখনও আছে। আর ছবির নীচের নোংরা সাম্প্রদায়িক মন্তব্যগুলো কেন রাখা হয়েছে?

মন্তব্যগুলো পড়লে বোঝা যায় যে, কেন হিন্দুদের সংখ্যা ২৮% থেকে আজ ৮%-এ এসেছে!! না এই ছবি একক ভাবে দায়ী নয় হিন্দুদের উপর আক্রমণের। তবে উস্কানী যে দিয়েছে তা বুঝতে হবে। যেমন বুঝতে হবে, কেন “ধর্ম নিরপেক্ষতা” একটি শব্দ ছাড়া কিছুই নয় বাংলাদেশে!

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.