একাত্তরের নারীসত্ত্বা: অগ্নিশিখা ও অশ্রুবিন্দু (পর্ব-২)

Bangali nariমারুফ রসূল: একাত্তরের নারী নির্যাতনের ধরন নিয়ে বেশ কয়েকটি গবেষণা হয়েছে। তবে নারী নির্যাতনের ঘটনাগুলো বিশ্লেষণ করে নির্যাতনের ধরন, প্রকৃতি, সংখ্যা, ব্যাপকতা, কাল প্রভৃতির আলোকে গবেষণা সাজিয়েছেন ডা. এম এ হাসান। তার আলোকেই নিচের আলোচনাটুকু।

স্পট রেপ

২৫ ও ২৬ শে মার্চের গণহত্যার পরপরই পাকিস্তানি বর্বররা বিভিন্ন শহরে, সামরিক গুরুত্বপূর্ণ স্থান, স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়সহ গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ, স্বাধীনতার পক্ষের বাঙালি- বিশেষ করে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের বাড়িগুলোতে ব্যাপক হানা দেয়। এ পর্যায়ে তারা কাউকে হত্যা করে, অনেককে বেঁধে নিয়ে যায়। পুরুষদের নির্যাতন করার পর কোনো কোনো স্থান থেকে নারীদের উঠিয়ে নিয়ে যাওয়া হয় এবং কোনো কোনো পরিবারে মা-মেয়ে ও অন্যান্য নারীদের তাদের বাড়িতেই নির্যাতন করে। এ সময় যৌন নির্যাতনের চেয়ে হত্যার প্রবণতাই ছিলো বেশি।

এর কয়েকদিন পর এরা দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে। ধ্বংস-হত্যা আর নির্যাতনের মাত্রা বাড়িয়ে দেয়। নারী ধর্ষণের ভয়ঙ্কর নজির সৃষ্টি করে ইতিহাসের বুকে।

এ ধরণের স্পট রেপ প্রক্রিয়া শুরু হয় এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহের শেষ দিক থেকে। এই ধর্ষণ প্রক্রিয়া আমাদের বিজয় লাভের পূর্ব- পর্যন্ত অব্যাহত ছিলো। এসব ধর্ষণের ক্ষেত্রে নির্যাতিত নারীর সংখ্যা প্রতি বাড়িতে দু’তিন জন ছিলো।

স্পট গণধর্ষণ

যেখানেই পাকিস্তানের বর্বর সেনাবাহিনী প্রতিরোধের সম্মুখীন হয়েছে কিংবা মুক্তিযোদ্ধাদের উপস্থিতি আঁচ করতে পেরেছে বা মুক্তিযোদ্ধাদের দ্বারা আক্রান্ত হয়েছে- সেসব স্থান বা তার আশেপাশের বহু এলাকায় তারা তাদের ধ্বংসলীলা চালিয়েছে। এক একটা এলাকা ঘেরাও করেছে, শক্ত সমর্থ পুরুষদের বন্দী করেছে এবং তাঁদের সম্মুখেই এক একটা ভিটায় বা এক একটা ঘরে অনেকগুলো নারীকে জড়ো করে পুরো বাহিনী মিলে ধর্ষণ করেছে।

এ ধরনের এক একটি গণধর্ষণে আট-দশজন থেকে প্রায় একশ’ জন পাক সেনা পর্যন্ত অংশ নিয়েছে। এই ধর্ষণের তাণ্ডবতা পুরো নয় মাস ধরেই চলেছে।

নাটোরের ছাতনী গ্রামে গণহত্যা চালানোর পর পাকিস্তানিরা এরকম একটি ভয়ঙ্কর গণধর্ষণ চালায়। এটি কেবল একটি উদাহরণ। এরকম হাজার হাজার উদাহরণ ইতিহাস ঘাঁটলেই চোখে পড়বে।

সেনাঘাঁটি ও ক্যাম্পে বন্দী নারীদের ধর্ষণ

কথাসাহিত্যিক শওকত ওসমানের একটি উপন্যাস আছে। ‘নেকড়ে অরণ্য’। পাকিস্তানি ক্যাম্পে কীভাবে নির্যাতন করেছে বরাহ শাবকরা, আর সেই নির্যাতনের প্রকট দৃশ্য দেখে কী স্বাভাবিক আত্মতৃপ্তিতে মজেছিলো এ দেশীয় রাজাকাররা- তার চাবুক বর্ণনা পাওয়া যায় এই উপন্যাসে।

যুদ্ধের পুরো নয় মাস পাকিস্তানিরা বিভিন্ন বাড়িঘর, স্কুল-কলেজ, বিভিন্ন যাত্রী ছাউনী, রেলস্টেশন, বাসস্টেশনসহ সারা বাংলার বিভিন্ন জায়গা থেকে ধরে আনে নারীদের এবং তাদের বন্দী করে রাখে সেনা ক্যাম্পে। এসব কাজে রাজাকার বাহিনীর সহযোগিতা ছিল সবচেয়ে বেশি। ক্যাম্পে বন্দী করে নির্যাতনের জন্য সাধারণত রাজাকাররাই নারীদের তুলে আনতো বা বিভিন্ন জায়গায় পাকিস্তানি সৈন্যদের নিয়ে যেতো।

এসব নির্যাতন ক্যাম্পে নারীরা কখনও একদিন, একাধিক দিন, কখনও বা মাসের পর মাস ধর্ষিত হয়েছেন। শেষ দিকে পাকিস্তানিরা এই বীরাঙ্গনাদের অধিকাংশদেরই হত্যা করে।

যৌনদাসী

যুদ্ধের নয় মাস পাকিস্তানি সৈন্যরা- পাকিস্তানি পতাকার মিলিটারি জিপে এসে বাঙালি নারীদের উপর কী পাশবিক নির্যাতন করেছে, তা বোঝার জন্যে নির্যাতনের ঘটনাগুলো বিশ্লেষণ করতে হয়। সেনাঘাঁটি বা ক্যাম্পে বন্দী নির্যাতিতা নারীদের মধ্য থেকেই সাধারণত যৌনদাসী নির্বাচন করা হতো। এদের নির্যাতন করতো উর্ধ্বতন সেনা কর্মকর্তারা। ক্যাম্পের বদল হলে, এই নারীদেরও সেনারা সঙ্গে করে নিয়ে যেতো।

এরকম যৌনদাসীর শিকার হয়েছেন হবিগঞ্জের লস্করপুর চা বাগানের অনেক শ্রমিক। ডিসেম্বর মাসের শেষের দিকে এবং বিজয়ের পর অসংখ্য নারীকে পাওয়া যায় পাকিস্তানি ক্যাম্পে ও বাঙ্কারে।

পাকিস্তানি সৈন্যদের নিষ্ঠুরতা এবং মনোবিকারের ধরন-

পাকিস্তানি সৈন্যদের নির্যাতনের ধরন সকল সভ্যতা বিবর্জিত মানুষের আচরণের চেয়েও নিকৃষ্ট ছিলো। তাদের কোনো কোনো আচরণ ছিলো ভয়ঙ্কর বিকারগ্রস্ত। এই বিকারগ্রস্ততা এতোটাই বেশিমাত্রায় ছিলো যে- মনোবিজ্ঞানের ভাষায় এদের সাইকোপ্যাথ শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত করা যায়।

অসংখ্য পাকিস্তানি সৈন্য ও অফিসার একের পর এক অসহায় নারীকে সবার সামনে বিবস্ত্র করে নিষ্ঠুর যৌন নির্যাতনে রক্তাক্ত করেই ক্ষান্ত হয়নি; তারা এইসব নারীর পায়ুপথ ছিন্নভিন্ন করে তাদের সকল বর্জ্য ও যৌনাঙ্গ নারীদের মুখে ঢুকিয়ে দিয়েছে। অল্প বয়সী নারীরা যখন বীভৎস যন্ত্রণায় কাতরিয়েছে, তখন পাকিস্তানি সৈন্যরা বেয়নেটের খোঁচায় ছিন্নভিন্ন করে দিয়েছে তাদের যোনিপথ।

পাকিস্তানিদের যৌন বিকৃতি, মনোবিকার ও নিষ্ঠুরতা এতোটা ভয়ঙ্কর ছিলো যে তাদের অনেককে সাইকোপ্যাথিক পারসোনালিটি হিসেবে গণ্য করে তাদের অপরাধকে আচরণ বিজ্ঞানীদের গবেষণার বিষয় করা উচিত। তারা যুদ্ধে যতোই পরাভূত এবং পরিবার ও জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন হচ্ছিলো, ততোই তারা নিষ্ঠুর যৌন নির্যাতক, বিকারগ্রস্ত ও ধর্ষকামী হয়ে উঠছিলো। তারা নিষ্ঠুর নিপীড়নের মাধ্যমে ভুলতে চাচ্ছিলো পরাজয়ের গ্লানি। পরবর্তীতে আচরণগত বিচ্যুতির ব্যাখ্যা ও কৈফিয়ত দিতে গিয়ে জেনারেল নিয়াজি নিজেদের নির্দোষ জাহির করে বলে-

`.. ..The psychopath is one whose conduct is satisfactory to himself and to no one else.Õ (G.D.Partridge)

Maruf Rasul
মারুফ রসূল

তবে নিয়াজি যতোই শাক দিয়ে মাছ ঢাকুক- পাকিস্তানিদের চারিত্রিক ও আচরণগত বিকারের পেছনে নিষ্ঠুর অবদমনেচ্ছা, জাতিগত প্রেরণা ও অসহিষ্ণুতা অত্যন্ত শক্তভাবে কাজ করেছে। পাকিস্তানিদের এই মনোবিকৃতির ব্যাখ্যা প্রদান করা যায় এইভাবে-

…The attainment of sexual gratification throu

gh the infliction of bodily or mental pain on others by physical or verbal means.. ..In a broader, nonsexual sense, sadism refers to aû type of cruelty or extreme aggression.

[The Curse of Virtue and the Blessing of Vice, Marquis de Sade (1740-1814)]

পাকিস্তানি সৈন্যদের এ জঘন্য মনোবৃত্তির কারণে সারা বাংলাদেশ হয়ে উঠেছিলো চিৎকারের ভাগাড়, নারীদের সেখানে ভয়ানক নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছে। এতোটা ভয়াবহ, বিকৃত মানসিকতা সম্পন্ন বীভৎস নির্যাতন পৃথিবীর আর কোথাও হয়নি- সভ্যতা আর কোনো দিন এমন বীভৎসতা দেখেনি। (চলবে)

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.